ডিম বৃত্তান্ত

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:০৯ এএম

আগে পরীক্ষার দিন ছোটদের ডিম খেতে দেওয়া হতো না। বলা হতো ডিম খেলে পরীক্ষায় গোল্লা পাবে। নানা কুসংস্কার থাকা সত্ত্বেও হাজার বছর ধরে মানুষ ডিম খেয়ে আসছে। দুনিয়ার সব জাতিই কমবেশি ডিমনির্ভর। পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর ডিম পাওয়া যায়। তবে সব থেকে জনপ্রিয় হচ্ছে মুরগির ডিম। পূর্ব ভারতের ইতিহাসে খ্রিস্টের জন্মের ৩ হাজার ২০০ বছর আগেই বনমোরগকে পোষ মানানোর কথা জানা যায়। মিসর আর চীনের নথিপত্র থেকে জানা যায় খ্রিস্টপূর্ব ১ হাজার ৪০০ বছর আগে থেকেই মানুষ পোষা মুরগির ডিমে  অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। আর ইউরোপের গৃহস্থালিতে মোরগ-মুরগি পালনের ইতিহাসও খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ বছরের পুরনো। লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ

ডিমের পুষ্টিগুণ

ডিম খেতে পছন্দ করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। সব বয়সের মানুষ ডিম খেতে খুব পছন্দ করে। তবে কিছু মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় যারা নাকি ডিমের গন্ধ পছন্দ করে না। কেউ পছন্দ করুক আর নাই করুক তাতে কিন্তু ডিমের পুষ্টিগুণ কমে যায় না। ডিমে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি-২, ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন বি-৫, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই, বায়োটিন, কোলিন, ফলিক এসিড, আয়োডিন, আয়রন, ফসফরাস, প্রোটিন, সেলেনিয়ামসহ আরও অনেক পুষ্টি উপাদান।

প্রোটিন : মাঝারি সাইজের একটি ডিমে রয়েছে ৫.৫৩ গ্রাম প্রোটিন। ডিমের সাদা অংশ এবং কুসুম দুটোতেই পাওয়া যায় এই প্রোটিন। যা প্রতিদিনের আমিষের চাহিদার অনেকটাই পূরণ করে।

চর্বি: বড় সাইজের একটি ডিমে রয়েছে ৫ গ্রাম পরিমাণে চর্বি। তবে এর বেশির ভাগই হচ্ছে আনস্যাচুরেটেড, যেটা জমাট বাঁধে না। যা শরীরের জন্য উপকারী।

ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড : ডিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড। যা কিনা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় সহায়তা করে। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড সাধারণত পাওয়া যায় মাছের মধ্যে। যারা মাছ খেতে পারেন না তারা ডিম খেলে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডের চাহিদা অনেকটাই পূরণ হয়।

কোলেস্টেরল : মাঝারি সাইজের একটি ডিমে রয়েছে ১৬৪ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল। ডিমে কোলেস্টেরল থাকলেও তা রক্তের কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে না। বরং রক্তের ভালো কোলেস্টেরল (এইচ.ডি.এল) বৃদ্ধি করে।

ডিম খাওয়ার উপকারিতা

পেশি মজবুত হয়: ডিমের মধ্যে রয়েছে প্রোটিন। এই প্রোটিনে নয়টি জরুরি অ্যামাইনো এসিড রয়েছে। এটি পেশি গঠন, মজবুত ও পুনর্গঠনে সাহায্য করে।

মস্তিষ্ক ভালো রাখে : ডিমে রয়েছে ভিটামিন ও মিনারেল। যা কিনা মস্তিষ্কের সেল শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।

শক্তি উৎপাদন করে : ডিমে থাকা প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল শরীরে শক্তি উৎপাদন করতে সাহায্য করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় : ডিমে থাকা ভিটামিন এ, ভিটামিন বি-১২, সেলেনিয়াম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।

হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় : প্রতিদিন একটি ডিম খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যেতে পারে অনেকটাই।

গর্ভাবস্থায় দরকারি : ডিমের কিছু পুষ্টি উপাদান গর্ভাবস্থায় খুব দরকারি। বিশেষ করে জন্মগত ‘স্পাইনাল বিফিডা’ রোগের ঝুঁকি কমায়।

দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে : ডিমে থাকা  লুটেইন ও জিয়েক্সাথিন দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। বয়স বাড়লে চোখে নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধ করে। তাছাড়া ডিমের অন্যান্য ভিটামিনও ভালো দৃষ্টিশক্তির জন্য সহায়ক।

ওজন কমাতে : ডিম খেলে দীর্ঘ সময় ক্ষুধা লাগে না। সেই সঙ্গে এনার্জিও পাওয়া যায়। যেহেতু ক্ষুধা লাগে না তাই বাড়তি খাবার খাওয়া কম হয়, ওজন কমে।

ত্বক ভালো রাখে : সুন্দর ত্বকের জন্য চাই সুষম খাদ্যাভ্যাস, সঠিক পুষ্টি। ডিমে থাকা বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেল ত্বক সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

শিশুর জন্য প্রতিদিন একটি ডিম

শিশুরা সমাজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। জাতির ভবিষ্যৎ। গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে একটি ডিম খেলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। তাই বাড়ন্ত বয়সের শিশুদের জন্য ডিম খুবই উপকারী খাবার। ডিমে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।

অপুষ্টির শিকার শিশুরা খর্বাকৃতির হতে পারে। এসব শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম হয়ে থাকে। ৬ বা ৯ মাস পর থেকে শিশু যদি একটা করে ডিম খায়, তাহলে খর্বাকৃতি কমাতে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শিশুর জন্মের পর থেকে ১ হাজার দিন পর্যন্ত এটা খুবই দরকারি।

খাওয়া যায় বিভিন্ন ভাবে

প্রোটিনের ভালো উৎস ডিম। খুব সহজলভ্য আর খুব সহজেই খাওয়ার জন্য একে তৈরি করা যায়। বিভিন্ন ভাবে রান্না করা যায় ডিমকে। যেমন, ভাজা, পোচ, সিদ্ধ, আধা সিদ্ধ। তাছাড়া কেক, প্যানকেক, হালুয়া, স্যান্ডউইচ, সালাদ, চপ, পুডিং, বিরিয়ানি, নুডলস, পিঠা ইত্যাদিতেও ব্যবহার করা হয় ডিম।

ডিম কি ফ্রিজে রাখবেন?

দোকানে যখন থাকে তখন তো ডিম স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই থাকে। কিন্তু বাসায় আনার পরে কি সেটা ফ্রিজে রাখতে হয়? এ নিয়ে আমেরিকার এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্ট জানায়, স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া খোসা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু ফ্রিজে রাখলে খোসা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করা ব্যাকটেরিয়ার জন্য জটিল হয়ে পড়ে। তাই ফ্রিজে ডিম বেশিদিন ভালো থাকে।

ডিমে ডায়েট

আমরা অনেক রকম অনেক কিছু দিয়ে ডায়েট করে থাকি। অনেক রকমের এক্সারসাইজও করি। কিন্তু তারপরও দেখা যায় ওজন ঠিকমতো কমছে না।

তবে মজার কথা হচ্ছে ডিম দিয়েও ডায়েট করা যায়। এই ডায়েট প্ল্যান অনেকটা অন্য ডায়েট প্ল্যানের কাছাকাছি। এর মূল সূত্র হলো বেশি প্রোটিন ও কম কার্বোহাইড্রেট। ডিম ছাড়াও এই ডায়েটে খাওয়া যাবে পালং শাক, ব্রোকলিসহ অন্যান্য শাকসবজি। ফল খাওয়া যাবে দিনে এক থেকে দুইটা। যেসব খাবারে কার্বোহাইড্রেট রয়েছে সেসব খাবার যেমন, ভাত, পাস্তা, রুটি থেকে দূরে থাকতে হবে।

নাশতা : দুটো ডিম ও কম কার্বোহাইড্রেট যুক্ত সবজি।

দুপুর : প্রোটিনযুক্ত খাবার ও সালাদ

রাত : ডিম এবং কম কার্বোহাইড্রেট-যুক্ত সবজি।

এই রকমের আরও অনেক ডায়েট প্ল্যান রয়েছে। তবে এসব ডায়েট কার্যকর কি না, সেটা নিয়েও অনেক মতপার্থক্য থাকতে পারে। যে কোনো ডায়েট প্ল্যান তখনই কার্যকর হবে, যখন কিনা সেটা ঠিকমতো পালন করা হবে। যেহেতু এই ডায়েটে রয়েছে বেশি প্রোটিন ও কম কার্বোহাইড্রেট তাই এটা ওজন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ প্রোটিন সম্পন্ন খাবার পেট ভরা রাখে এবং ওজন কমায়।

যদি ডিমের ডায়েট করে ওজন কমে যায় তবে দীর্ঘদিন ধরে একই ডায়েট করার দরকার নেই। কারণ এখানে কার্বোহাইড্রেট খাবারকে নিরুৎসাহী করা হয়েছে। অনেকের শরীরের জন্য সেটা ভালো নাও হতে পারে।

কোনটি ভালো- ফার্মের ডিম নাকি দেশি?

অনেকেই মনে করেন, ফার্মের ডিমে পুষ্টিগুণ কম থাকে, তাই দেশি ডিমই তাদের। আবার অনেকেই ফার্মের ডিমকে পুষ্টিগুণে ভরপুর মনে করেন। কোনটি ঠিক? এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল  বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এ বি এম আবদুল্লাহ জানান, বাস্তবে ঘটনাটি একেবারেই অন্যরকম। তিনি জানান, সব ডিমের পুষ্টিগুণ আসলে একই, কোনো তফাত নেই। তফাত শুধু আকারে। দেশি মুরগির ডিম একটু ছোট আর ফার্মের মুরগির ডিম একটু বড়। 

image

লাল নাকি সাদা?

অনেকে মনে করেন, লাল ডিম ও সাদা ডিমের পুষ্টিগুণ ভিন্ন। লাল ডিমে পুষ্টিগুণ বেশি থাকে। কিন্তু আসলে ডিম লাল হবে নাকি সাদা, তা নির্ভর করে মুরগির পিগমেন্ট উৎপাদনক্ষমতার ওপর। প্রকৃতপক্ষে সব রঙের ডিমের পুষ্টি উপাদান একই।

কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ

যদিও ডিম পুষ্টিগুণসম্পন্ন, তবে তাই বলে একাধিক ডিম খাওয়া নিরাপদ নয়। একাধিক ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্করা সপ্তাহে ছয়টির বেশি ডিম খেলে তাদের হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ফিজিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সানজিদা পারভীন সিম্মি জানান, কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ তা নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, ওজন, প্রতিদিনের খাওয়ার অভ্যাস, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা আছে কি না তার ওপর। কেউ যদি প্রতিদিন প্রচুর প্রোটিন ও চর্বি গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে ডিম ভালো নাও হতে পারে। কিন্তু যদি ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য যেমন : কম চর্বিযুক্ত খাবার, সবজি, শস্যদানা, চর্বিহীন মাংস গ্রহণ করেন তাহলে দিনে একটি ডিম এবং সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১০টি ডিম খাওয়া যাবে।

অনেকেই দেখা যায় নাশতায় শুধু একটি ডিম খান, যা কিনা ক্ষতিকর। কারণ শরীরের চাহিদা শুধু একটি ডিমের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব না। তা ছাড়া ডিমে থাকে না কোনো ফাইবার বা আঁশ। এটা শরীরের জন্য খুবই দরকারি।

কুসুম ভালো না খারাপ?

ডিমের কুসুমে থাকে উচ্চমাত্রার কোলস্টেরল। এ বিষয়ে চিকিৎসক ডা. সানজিদা পারভীন সিম্মি জানান, ডিমের কুসুম খেতে কোনো নিষেধ নেই। তবে যাদের হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে তাদের কুসুম খেতে নিষেধ করা হয়।

image

হাড় মজবুত করে

অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধ করে

দাঁতের জন্যও ভালো

রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে

ডিমের কুসুমে রয়েছে কোলাইন। এটি মস্তিষ্ক ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে

ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখে

রক্তচাপ ঠিক রাখতে সাহায্য করে

এগুলো ছাড়াও ডিমের কুসুমের রয়েছে আরও বিভিন্ন উপকারিতা।

কাঁচা ডিম খাওয়া যায়?

কাঁচা ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ ডিমে থাকে সালমোনেলা নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। কাঁচা ডিম খেলে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই রান্না করা ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। ডিমের খোসা ভাঙা থাকলে সেই ডিম আর খাওয়া উচিত না। কারণ তাতে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত