মাইকে বেজে চলেছে কালজয়ী গান ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’। পাশেই শত শত মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে অপেক্ষা করছেন সেই গানের সুরস্রষ্টাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে জনসম্মুখ থেকে আড়াল হয়ে গেলেন গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।
গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমাগার থেকে বুলবুলের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। সেখানে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। এরপর বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধা জানান বরেণ্য এই শিল্পীকে। শুরুতেই রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। শ্রদ্ধা জানাতে যান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক এম সানাউল হক ও আবদুল হান্নান। এরপর একে একে শ্রদ্ধা জানান তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল-আলম হানিফ, অসীম কুমার উকিল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার প্রমুখ। শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ‘তিনি আজন্ম লড়াকু এক যোদ্ধা। সুরের জাদুতে মানুষের কতটা কাছে বসবাস করতেন, সেটা তো সবাই জানেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার বীরত্ব আমরা চিরদিন মনে রাখব। তিনি বেঁচে থাকবেন কালজয়ী গানের মাধ্যমে।’
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘আমাদের দেশাত্মবোধক গানের অন্যতম স্রষ্টা তিনি। তার গান মানুষকে, দেশকে ভালোবাসতে শেখায়। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কাছে বাংলাদেশের অনেক ঋণ।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘বুলবুল গানের মানুষ। তার চেয়ে বড় পরিচয় সে মুক্তিযোদ্ধা। দেশের টানে যুদ্ধ করেছে। আবার দেশের গান গেয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে বুলবুল বেঁচে থাকবে।’
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণেই কথা হয় সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আজন্ম হৃদয়ে বাংলাদেশকে লালন করেছে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। দেশের জন্য যেমন যুদ্ধ করেছে, তেমনি ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে, যারই পরিপ্রেক্ষিতে বুলবুলের ছোট ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর সরকার তার নিরাপত্তার জন্য পুলিশ দিয়েছে। পুলিশি পাহারায় থাকতে থাকতে বুলবুল হয়তো নিজেকে পরাধীন ভাবত। আমরা যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি, আমাদের সবার জীবনই তো হুমকির মধ্যে। যেখানে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়, সেখানে আমরা কেউ নিরাপদ নই। তবুও বুলবুল সত্য বলে গেছে, সত্য বলার জন্য কোনোদিন পিছপা হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সে আজন্ম হৃদয়ে বাংলাদেশকে ধারণ করা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন বীরযোদ্ধাকে হারাল। সেই সঙ্গে একজন সুরের জাদুকরকে হারাল।’
সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো বুঝবে না, কাকে হারাল। কিন্তু বারবার বুলবুলকে মনে রেখেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।’
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ, ম. হামিদ, আজাদ আবুল কালাম, সংগীতশিল্পী মনির খান, এন্ড্রু কিশোর, কুমার বিশ্বজিৎ, শফিক তুহিন, অভিনেত্রী তানভীন সুইটি, নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরীসহ অনেকেই শহীদ মিনারে ছুটে এসেছিলেন।
এন্ড্রু কিশোর বলেন, ‘বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে আলোর মশাল নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। দেশকে ভালোবেসেছেন, গানের মানুষদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, গীতিকার-সুরকারদের নানা বিষয় নিয়ে তিনি সোচ্চার থেকেছেন। যেখানে অন্যায় দেখেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। আবার গানের মাধ্যমে দেশপ্রেমকে ছড়িয়ে দিয়েছেন।’
কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল গান লিখেছেন, সুর করেছেন, কণ্ঠ দিয়েছেন। বিদেশে অনেকবার তার সৃষ্ট গান গেয়েছি। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, এই গানের কথা লিখেছেন কে? এটা গানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুরকার, শিল্পীর নাম জানতে চায়। কিন্তু আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের গানের কথার মধ্যে বিশেষ কিছু আছে, যার জন্য সবাই জানতে চান এই গানের কথা কে লিখেছেন? প্রখ্যাত শিল্পী সলিল চৌধুরী তার গানের প্রশংসা করেছেন।’
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয় বরেণ্য এই শিল্পীকে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, শিশু একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, অভিনয় শিল্পী সংঘসহ বিভিন্ন সংগঠন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এরপর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বুলবুলের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জানাজা। দুপুর ২টায় মরদেহ পৌঁছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি)। সেখানে হয় দ্বিতীয় জানাজা। চলচ্চিত্র অঙ্গনের লোকজন সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এই শিল্পীকে। এ সময় চিত্রনায়ক আলমগীর, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, চিত্রনায়ক রিয়াজ, শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। এফডিসি থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।
সুরকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল গত মঙ্গলবার ভোররাতে রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসায় হার্ট অ্যাটাক করেন। পরে আয়েশা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
