ঐতিহ্য বিশ্বাস ও রাজনীতির কুম্ভমেলা

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:১৩ পিএম

কুম্ভমেলায় ভারতের দিগ্দিগন্ত থেকে যেমন আসেন লাখ লাখ সাধু সন্ন্যাসী, তেমনি আসেন অগণিত ধর্মপ্রাণ গৃহস্থ নর-নারী। এ সময় আকাশ বাতাস অনুরণিত হয়ে ওঠে ভক্তকণ্ঠে ভগবানের জয়ধ্বনিতে। কুম্ভমেলার জন্য নির্ধারিত চারটি স্থানের মধ্যে এবারের মেলাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে গঙ্গা, যমুনা আর সরস্বতী নদীর ত্রিবেণীসঙ্গমে। ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন ভেদ নেই এখানে, নেই প্রাদেশিকতার গ-  , আছে সাম্যের এক অপূর্ব মিলন এই অমৃতকুম্ভের প্রয়াগে। কুম্ভমেলাকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শান্তিপূর্ণ জমায়েত হিসেবে সম্প্রতি ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো। ধারণা করা হচ্ছে, জনসমাগমে অতীতের সব রেকর্ডকেই ছাড়িয়ে যাবে এবারের কুম্ভমেলা। যদিও এবারের মেলাকে ঘিরে শুধু পারলৌকিক শান্তি প্রত্যাশাই নয়, জমে যেতে পারে রাজনীতির খেলাও। লিখেছেন পরাগ মাঝি

তিনগুণ বরাদ্দে এবারের মেলা

এলাহাবাদের প্রয়াগে গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী এই তিন নদীর মিলনস্থলে এবার কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হিন্দু পুরাণ মতে, এই ত্রিবেণীসঙ্গমে পুণ্যস্নানের মাহাত্ম্য অনেক। কুম্ভমেলার জন্য নির্ধারিত চারটি জায়গার মধ্যে প্রয়াগেই একমাত্র কল্পব্যাস করা যায়। কারণ হিন্দু পুরাণমতে, ত্রিবেণী সঙ্গমকেই পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল ধরা হয়। বিশ^সৃষ্টির সময় ব্রহ্মা নাকি এই ত্রিবেণী সঙ্গমেই যজ্ঞ করেন। সব মিলিয়ে  ৪৮ দিন ধরে চলবে এই মেলা। এবারের মেলায় রেকর্ড ৪ হাজার ২০০ কোটি রুপি খরচ করছে উত্তরপ্রদেশ সরকার। এর আগে ২০১৩ সালে মহাকুম্ভের জন্য সর্বোচ্চ খরচ করা হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ কোটি  টাকা। এর মানে এবার প্রায় তিন গুণ বেশি অর্থ খরচ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এর বাইরেও কয়েকটি দপ্তর নিজেদের মতো করে অর্থ বরাদ্দ করেছে।

টাকার পরিমাণের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মেলার জায়গাও। এর আগে সমস্ত মেলা হতো ১৬০০ একর জায়গাজুড়ে। এবার হচ্ছে ৩২০০ একর জায়গা নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, জনসমাগমের দিক থেকেও অন্যবারগুলোকে হার মানাবে এবারের মেলা। ২০১৩ সালে সর্বশেষ প্রয়াগরাজ কুম্ভমেলায় পুণ্যস্নান করেছিলেন ১০ কোটিরও বেশি তীর্থযাত্রী। এবারের কুম্ভমেলায় জনসমাগম অতীত সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ধারণা করা হচ্ছে, এবার ১২ থেকে ১৫ কোটি মানুষ ত্রিবেণী সঙ্গমে সমবেত হবেন। কুম্ভমেলা ছাড়া গোটা বিশ্বের আর কোথাও একটি মাত্র বিশ্বাসকে পাথেয় করে এত বেশি সংখ্যায় জনসমাগম হয় না।

১৫ জানুয়ারি মকর স্নানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের কুম্ভমেলা। ২১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে পৌষ পূর্ণিমার শাহি স্নান, ৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে মৌনী অমাবস্যার শাহি স্নান, ১০ ফেব্রুয়ারি বসন্ত পঞ্চমী উপলক্ষে বিশেষ আচার, ১৯ ফেব্রুয়ারি মাঘী পূর্ণিমার শাহি স্নান এবং ৪ মার্চ মহা শিবরাত্রির মাধ্যমে শেষ হবে মেলা।

image

বাহুবলির সেট ডিজাইনার

কুম্ভমেলায় এবারে অন্যতম আকর্ষণ মিউজিয়াম। ১৫ একর জমি জুড়ে তৈরি হচ্ছে সেটি। যার পুরোটা জুড়ে থাকবে ভারতীয় সংস্কৃতি। বাহুবলি সিনেমার সেট ডিজাইনারের হাতেই দেওয়া হয়েছে মিউজিয়ামের নকশা তৈরির দায়িত্ব। প্রচারের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক ব্যালে টিম। যারা অভিনব কায়দায় গঙ্গাবক্ষে মিউজিয়ামসহ কুম্ভমেলার প্রচার করবেন।

মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বার তৈরি হবে অজন্তা গুহার আদলে। গোটা মিউজিয়াম ঘুরে দেখতে সময় লাগবে ঘড়ির কাঁটা ধরে তিন ঘণ্টা।

এবার গোটা দেশজুড়ে আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর শিল্পীদের মেলায় যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানে রামলীলা ও কৃষ্ণলীলা দেখানো হবে, সঙ্গে থাকবে গঙ্গাবক্ষে আন্তর্জাতিক শিল্পীদের ব্যালে নাচ।

সাধারণ তীর্থযাত্রী ও মেলার দর্শনার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে ৩২ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি অস্থায়ী তাঁবু নগরী। তৈরি করা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার শৌচাগারও। নিরাপত্তা রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে মোতায়েন করা হয়েছে ৩০ হাজার পুলিশ ও প্যারা মিলিটারি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার বিশেষ ট্রেন আসছে মেলায় আগত অতিথিদের নিয়ে।

রাজনীতির গন্ধ

সমালোচকরা এবারের কুম্ভমেলাকে ঘিরে রাজনীতির গন্ধ পাচ্ছেন। এবারের কুম্ভমেলাটি মহাকুম্ভ না হলেও সম্ভবত এটি সর্বকালের সর্ববৃহৎ কুম্ভমেলা হতে চলেছে। এর কারণ ভারতের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার এই মেলাকে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। আর তাই বাজেট এবং জনসমাগমের স্থানের দিক দিয়ে অতীত সব রেকর্ডকেই ছাড়িয়ে গেছে এবারের মেলা। মেলায় ছাড়াও পুরো প্রয়াগরাজ (এলাহাবাদ) শহরই ছেয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিলবোর্ডে। তীর্থযাত্রার প্রতিটি ধাপেই এবার বিশেষ কায়দা করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে নরেন্দ্র মোদি ও তার সরকারের।

নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১২ বছরে একবার মহাকুম্ভ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আর দুটি কুম্ভের মধ্যবর্তী বছরে পালিত হয় অর্ধকুম্ভ। সে হিসেবে এবারের মেলাটি অর্ধকুম্ভ। কিন্তু উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ আগের নিয়ম পাল্টে দিয়েছেন। এবারের অর্ধকুম্ভটিই পালিত হচ্ছে পূর্ণকুম্ভ হিসেবে। ২০১৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি ২০১৯ সালের অর্ধকুম্ভকে তিনি পূর্ণকুম্ভ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। মূলত সাধারণ নির্বাচনের আগে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ঘটনোর জন্যই এমন মহাপরিকল্পনা করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেকে।

অতীত দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও দুর্ঘটনা

কুম্ভমেলাকে ঘিরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং দুর্ঘটনার ইতিহাস বেশ পুরনো। একবার প্রয়াগের কুম্ভমেলায় বৈষ্ণব নাগা সাধুর দল যোগী ও সন্ন্যাসীদের ওপর আক্রমণ করে। প্রবল দাঙ্গায় রক্তারক্তি কা- ঘটে যায়। যোগী সম্প্রদায়ের অন্যতম যোগীবর গম্ভীরনাথ আপন ছাউনিতে ছিলেন ধ্যানমগ্ন। মারমুখী নাগারা ঢুকে পড়ে তার ছাউনিতে। সম্বিত ফিরে আসে যোগীবরের। ঠিক সেই সময় নাকি যোগবলে ঘটে যায় এক অলৌকিক কা-। কারণ মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজিত নাগারা শান্ত আর ধীরস্থির হয়ে বেরিয়ে আসেন গম্ভীরনাথের ছাউনি থেকে। ঠিক কী ঘটেছিল সে সময়, তা এখনো অজানা সাধারণ মানুষের।

এছাড়া অতীতে সর্ব প্রথম কোনো সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা আগে কুম্ভস্নান করবে তা নির্ধারিত হতো তরবারি দিয়ে। তখন মহানির্বাণী, নিরঞ্জনী, জুনা, অটল, আনন্দ, আহ্বান এবং অগ্নিদামকÑ এই সাত আখড়ার সন্ন্যাসীরা পরস্পরের সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতেন। যারা জয়ী হতো তারাই আগে স্নান করত। এই রক্তারক্তির ব্যাপারটায় প্রথম হস্তক্ষেপ করে ইংরেজ সরকার। বিভিন্ন আখড়ার স্নানের ক্রম নির্ধারণ করে দিয়েছিল ইংরেজরা। সে অনুযায়ী, কুম্ভপর্বে আখড়ার সন্ন্যাসীদের স্নানের ব্যবস্থা করা হয় সবার আগে। বিভিন্ন আখড়ার স্নানের পরে বৈরাগী, উদাসীন এবং নির্মল সম্প্রদায়ের সাধু-সন্ন্যাসীরা, তারপর মুখ্য স্নান করে সাধারণ পুণ্যার্থী ও তীর্থযাত্রীরা।

এর আগে কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে বহু দুর্ঘটনা এবং হতাহতের রেকর্ড পাওয়া যায়। এই মেলায় দুর্ঘটনা হয় মূলত দু’ভাবে। প্রথমত পদপিষ্ট হওয়া, দ্বিতীয়ত আগুন লাগা। পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর প্রথম বড় ঘটনা ঘটে ১৯৫৪ সালে। সেবার মৌনী অমাবস্যার দিন কুম্ভে পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছিলেন ৮০০ মানুষ, আর আহত হয়েছিলেন প্রায় ২ হাজার। সে সময় নদীতে পড়ে তলিয়েও গিয়েছিলেন অজানা সংখ্যক তীর্থযাত্রী।

২০১০ সালে বিড়লা ঘাট বিব্রজর কাছে গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন পাঁচ তীর্থযাত্রী। ২০১৩ সালে কুম্ভের সময় এলাহাবাদ স্টেশনে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ৩৬ জন মারা যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, স্টেশনে তখন কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। এমন সময় একটি ফুট ওভারব্রিজ ভেঙে পড়ে।

যেভাবে নির্ধারিত হয় কুম্ভমেলা

image

প্রতি ছয় বছর অন্তর হরিদ্বার ও এলাহাবাদে অর্ধকুম্ভ মেলা বসে। প্রতি বারো বছর অন্তর প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী ও নাসিকে পূর্ণকুম্ভ আয়োজিত হয়। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি তিন বছর পরপর চার জায়গার কোথাও না কোথাও কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়। বারোটি পূর্ণকুম্ভ বা পরিপূর্ণ কুম্ভমেলা অর্থাৎ প্রতি ১৪৪ বছর অন্তর প্রয়াগে আয়োজিত হয় মহাকুম্ভ। এই মহাকুম্ভ বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়।

এছাড়া বৃহস্পতি গ্রহ ও সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত হয় কোথায় কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হবে। এভাবে যখন বৃহস্পতি ও সূর্য সিংহরাশিতে অবস্থান করে তখন নাসিকে ত্রিম্বকেশ^রে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হবে। সূর্য মেষরাশিতে অবস্থান করলে কুম্ভমেলা হবে হরিদ্বারে। বৃহস্পতি বৃষরাশিতে ও সূর্য কুম্ভরাশিতে অবস্থান করলে মেলা হবে প্রয়াগে। আবার সূর্য বৃশ্চিকরাশিতে অবস্থান করলে উজ্জয়নীতে মেলার আয়োজন করা হয়।

এলাহাবাদের মেলাটি হয় গঙ্গা, যমুনা ও অন্তঃসলিলা সরস্বতীর সংযোগ স্থানে। আর হরিদ্বারে প্রবাহিত হচ্ছে গঙ্গা। শুধু তাই না, আরও আছে উজ্জয়িনীতে শিপ্রা এবং নাসিকে গোদাবরী। এই গোদাবরী নদীর তীরে নাসিকে পুণ্যস্নান হয় দুই জায়গায়। বৈষ্ণবরা গোসল করেন নাসিকের রামকু-তে আর অন্য দিকে শৈবরা গোসল বা স্নান করেন নাসিক থেকে ৩০ কিমি দূরে ত্রিম্বকেশ্বর নামক এক জায়গায়। ১৮৩৮ সালের দিকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক মনোমালিন্য হয় আর এর ফলে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত