বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে যেসব মা-বাবার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে, তাদের সন্তানদের ৪০ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা শেষ করার পরপরই চাকরি পাচ্ছেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা যেসব চাকরিপ্রার্থীর মা-বাবার আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, তাদের মাত্র ২১ দশমিক ৯ শতাংশ পড়াশোনা শেষে চাকরি পান। অর্থাৎ শিক্ষিত মা-বাবার সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়া শেষে যে হারে চাকরি পান, সমান পড়াশোনা করা অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত মা-বাবার সন্তানরা চাকরি পান তার অর্ধেক। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে স্নাতক সম্পন্ন করা এক হাজার ৫৭৪ জন ছাত্র-ছাত্রীর ওপর এই গবেষণা চালিয়েছে বিআইডিএস।
দেশে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ২০১৭ সালে ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশে ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের এই হার বেশি হওয়া ব্যক্তি ও পরিবার তো বটেই, রাষ্ট্রের জন্যও বিরাট অপচয়। সরকার দাবি করে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-১৫) এক কোটি ৪০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তারপরেও কী করে এত বেকার বাড়ছে তা বোধগম্য নয়।
দেশে কর্মসংস্থানের বিষয়টি ঘিরে নানা ধরনের অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়। এ অসন্তোষ কত তীব্র তা আমরা কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনে দেখেছি। এই ছাত্র আন্দোলনটি মূলত সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে সংঘটিত হয়েছিল। সাধারণভাবে কোটা না থাকলেও বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও নানা ধরনের অনিয়ম ও বৈষম্য আছে। এ ক্ষেত্রে রেফারেন্স বা যোগাযোগ বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া হয় এমন অভিযোগ রয়েছে। কোনো ব্যক্তির শিক্ষার ক্ষেত্রে মা-বাবার শিক্ষা সন্তানের জীবনে প্রভাব ফেলে। মা-বাবা শিক্ষিত হওয়ায় সন্তান একাডেমিক ফলাফল ভালো করবে এটাই স্বাভাবিক। একজন শিক্ষিত মা-বাবা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা এবং যোগাযোগ সন্তানের জন্য তৈরি করতে পারে তা অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত মা-বাবার পক্ষে খুব একটা সম্ভব হয় না। কিন্তু মা-বাবার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যেসব সন্তান উচ্চশিক্ষার গন্ডি পেরোচ্ছেন তারা যদি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন তাহলে তা হতাশাজনক।
দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও এখনো জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষার আওতার বাইরে রয়েছে। সমাজের সব অংশের মেধাবীরা উচ্চশিক্ষার আওতায় আসুক এটি সাধারণ চাওয়া। কিন্তু চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্য এ চাওয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানদের উচ্চশিক্ষার দ্বার যেমন উন্মুক্ত রাখা উচিত, তেমনি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারটিকেও নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে উন্মুক্ত ও সহযোগী মানসিকতা নিয়ে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও যথাসম্ভব সমতার পরিবেশ সৃষ্টি করে সুযোগবঞ্চিতদের চাকরির জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এখানে প্রাধান্য পাবে মেধা।
মেধাভিত্তিক নিয়োগই জনপ্রত্যাশায় রয়েছে। বিশেষ করে সীমিত কর্মসংস্থানের প্রেক্ষাপটে মেধাভিত্তিক নিয়োগের বিকল্প নেই। একজনের কোনো ধরনের পারিবারিক পশ্চাদপদতা তার কর্মসংস্থানে নিয়োগের ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে তা কাক্সিক্ষত নয়। পাশাপাশি সরকারকে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটাতে হবে যাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়। চাকরিক্ষেত্রে পারিবারিক পরিপ্রেক্ষিত নয়, দক্ষ ও মেধাবীদের সুযোগ দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
