উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যাত্রা শুরু হয়েছিল। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আশা ছিল, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রদানে যুগোপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা ব্যয় উচ্চ হলেও, উচ্চশিক্ষার মান এবং শিক্ষাসহায়ক কার্যক্রম ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে না বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার জন্য আলাদা আইন থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে সেই আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নেই। এমনকি আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধানও নেই আইনে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার নামে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি।
গতকাল দেশ রূপান্তর-এ প্রকাশিত ‘আইন লঙ্ঘনকারীদের প্রতি নমনীয় সরকার’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে দেখা গেল, নিবন্ধিত ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২১টিতে উপাচার্য নেই, ৭০টিতে উপ-উপাচার্য নেই এবং ৫৯টিতে কোষাধ্যক্ষ নেই। শিক্ষাসহায়ক কার্যক্রম এবং উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার নিয়ম থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা মানছে না। এখন পর্যন্ত মাত্র ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। আইন অমান্য করে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে রয়ে গেছে ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উচ্চ হারে ভর্তি ফি, বেতন ও নানা রকম ফি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের নামেই। কিন্তু নিজেদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিলে দীর্ঘদিন ধরেই আইন অমান্য করে চলছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবন্ধিত কোনো ‘সিএ ফার্ম’ বা বহির্নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের যাচাইসাপেক্ষে প্রতিবছর ‘আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন’ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে জমা দেওয়ার বিধান মানছে না অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে ২৫টি, ২০১৭ সালে ২৩টি এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে মঞ্জুরি কমিশন বলছে, হিসাব জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই হিসাব নিরীক্ষার যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেনি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুসারে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কেই উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, ডিন, বিভাগীয় প্রধান, রেজিস্ট্রারসহ ট্রাস্টি বোর্ডের মনোনীত তিনজন ও ইইউজিসির একজন সদস্য নিয়ে দুই বছরের জন্য সিন্ডিকেট পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষের মতো শীর্ষপদই খালি থাকায় এবং এই ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সদিচ্ছা না থাকায় সেখানে সিন্ডিকেট নেই। ফলে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের অর্থ আত্মসাতেরও কোনা সাজা হয় না।
একদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিন্ডিকেট নীতিমালা না মানায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভ্যন্তরীণ কোনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান না থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হাতে আইন প্রয়োগের কোনো ক্ষমতা নেই। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিজ ক্ষমতাবলে অপরাধ অনুসারে সাজা দেওয়ার ক্ষমতা রাখলেও বরাবরই তারা নমনীয় আচরণ করে যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতার ভারসাম্যের টানপোড়েনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সম্ভাবনাময় এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। আর নানাভাবে লাভবান হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন সাড়ে তিন লাখের বেশি। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার মান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে এবং আইন অমান্যকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। আইনের ফাঁকফোকরে পড়ে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে এমন অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নতুন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মণি বৃহস্পতিবার বলেছেন, মানসম্মত শিক্ষাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার এই ভয়াবহ চিত্র শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের বাস্তবতারই পরিচায়ক। দেশের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে অবশ্যই শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে।
