এটিএম বুথের প্রহরী খুন ঘাতক চাকরিদাতাই!

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০৪:২৭ এএম

রাজধানীতে এটিএম বুথের প্রহরী শামীম (২৪) হত্যা মামলার প্রধান আসামি নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ‘এলিট সিকিউরিটি ফোর্স লিমিটেড’-এর জোন কমান্ডার ফারুক-উল-ইসলাম; তার বিলাসী জীবনযাপনের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। মাসে সাকল্যে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা বেতন পেলেও তার ব্যবহৃত নোয়া ২০১৫ মডেলের সাদা রঙের প্রাইভেটকারটির মূল্যই ৩৫ লাখ টাকা। ফারুকের বারিধারার দুটি বাসায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তল্লাশিতে মাদকদ্রব্য ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গেছে। গত সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বারিধারায় যমুনা ব্যাংকের এটিএম বুথের ভেতর থেকে শামীমের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে ভাটারা থানার পুলিশ। পরে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বুথের টাকা খোয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। শামীমের বাবা একই প্রতিষ্ঠানের প্রহরী নজরুল ইসলাম এ ঘটনায় ভাটারা থানায় চারজনের নামে একটি হত্যা মামলা করেন। ফারুক ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন এলিট সিকিউরিটির জোন কমান্ডার মো. শাহিন,সহকারী জোন কমান্ডার নজরুল ইসলাম ও রহিম। ঘটনার দিনই ওই তিনজন পুলিশের হাতে আটক হন। পরদিন ফারুককে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।

ভাটারা থানার ওসি কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার আসামিদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।’ ফারুকের বাসায় তল্লাশি ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়টি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দেখছে। তাদের সঙ্গে কথা বলেন।’

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শামীম হত্যার দিনই ফারুকের বারিধারার দুটি বাসায় অভিযান চালিয়ে চায়নিজ কুড়াল, মদ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। ফারুককে এখন ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার এসআই মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফারুকের দুই বাসাতেই অভিযান চালিয়েছে ডিবি পুলিশ। উদ্ধার হওয়া সব জিনিস তাদের কাছে রয়েছে। তার জব্দ হওয়া গাড়িটাও ডিবির কাছে রয়েছে।’

এলিট সিকিউরিটি ফোর্সের সাবেক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফারুক ২০১০ সালে চার হাজার টাকা বেতনে প্রহরী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেন। ২০১২ সালে জোন কমান্ডার হন তিনি। এরপর অল্প দিনের ব্যবধানেই প্রচুর টাকার মালিক হন ফারুক। তার আয়ের প্রধান উৎস নতুন প্রহরী নিয়োগে কমিশন। এ ছাড়া বেশি বেতনে ভালো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রহরীদের কাছ থেকে নিয়মিত উৎকোচ নিয়ে থাকেন তিনি। অনেক সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাহিদার তুলনায় কম প্রহরী নিয়োগ দিলেও তিনি এলিট সিকিউরিটির কাছ থেকে বেশি টাকা তুলে নেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির আরও কয়েকজন কর্মকর্তাও জড়িত রয়েছেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির আরেক কর্মকর্তা বলেন, ছয় মাস আগে উত্তরা এলাকায় এলিট সিকিউরিটির কর্মীরা এক্সপেরিয়েন্স টেক্সটাইল লিমিটেডের ক্যাশইন ট্রানজিট করার সময় চার কোটি টাকা ছিনতাই হয়। এ ঘটনায় পুলিশি তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির এক গাড়িচালকের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। পরে তার কাছ থেকে দুই কোটি টাকা উদ্ধার হলেও বাকি টাকার হদিস পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন জড়িত থাকলেও তারা রেহাই পেয়ে যায়।

প্রতিষ্ঠানটির আরেক কর্মকর্তা জানান, ফারুকের মাদকের ব্যবসাও ছিল। তার বাসায় তল্লাশি চালিয়ে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে ফারুক এলিট সিকিউরিটির প্রহরীদের কাছে মাদক বিক্রি করতেন কি না সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তারা। প্রহরী নিয়োগে নিজের এলাকা কুড়িগ্রাম থেকে নিয়ে আসা লোকদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন খেতেন ফারুক। নিহত শামীমকেও এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছিলেন তিনি। তার বাবা নজরুল ইসলাম ও ছোট ভাইকেও চাকরি দেন ফারুক। তবে বনিবনা না হওয়ায় মাঝেমধ্যেই শামীমের সঙ্গে তার ঝামেলা লাগত। হত্যার আগের রাতেও শামীমকে শাসায় ওই এলাকার নাইট লাইনম্যান। শামীম এটিএম বুথের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগও করেন ওই লাইনম্যান।

এদিকে এলিট সিকিউরিটি কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফারুক ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা বেতন পেতেন। তার বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহাঙ্গীর আকতার চৌধুরী জানান, তার ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি কর্র্তৃপক্ষ জানত না। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফারুকের এমন বিলাসী জীবন সম্পর্কে আমাদের জানা ছিল না। আমরা এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সহায়তা করছি। আমাদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। সে যদি খুনের সঙ্গে জড়িত থাকে তবে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে।’

ছয় মাস আগে চার কোটি টাকা ‘ছিনতাইয়ে’ প্রতিষ্ঠানের এক গাড়িচালকের সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘২০ হাজার কর্মীর মধ্যে দু-একজন খারাপ হতে পারে। তবে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

মহানগর ডিবি পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) মো. মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই আমরা ফারুকের বাসায় অভিযান চালিয়েছি।’ তবে তদন্তাধীন বলে উদ্ধার করা মালামালের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত