ঈদের আগের দিনের বিকেল। রাজশাহী রুটে ট্রেন চালাচ্ছিলেন মনিরুল ইসলাম (৪০)। হঠাৎ করেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেল সব। ইঞ্জিনের ভেতর থেকে শুধু মানুষের মাথা গুঁড়ো হওয়ার শব্দ শুনতে পেলেন। তার ভাষায়, শব্দগুলো ছোট বোমা বিস্ফোরণের মতো। ‘এটি আমার চোখে প্রথম মৃত্যু দেখা। সেবারের ঈদের কোনো আনন্দই ওই দৃশ্য ভোলাতে পারেনি’, কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসে মনিরুলের। এরপর রেলওয়ের চালক সংকটের ফলে একটানা খাটুনি, জনগণের অসতর্কতায় দুর্ঘটনা ও মানসিক চাপের কথা তুলে ধরেন তিনি।
অতিরিক্ত সময় খাটানোর ক্ষতিকারক দিকগুলো তুলে ধরেন অন্য চালকরাও। একই সঙ্গে তুলে ধরেন দুর্ঘটনায় শুধু হতাহতের পরিবারই নয়, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে চালকদেরও। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপ হয় ১৪ বছর ধরে লোকোমাস্টারের দায়িত্বে থাকা নওগাঁর মনিরুল ইসলামের সঙ্গে। কথার শুরুতেই তুলে ধরেন দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, ‘ট্রেন চালানো যে কতটা মানসিক চাপের, সেটা আমরাই বুঝি। একজন মানুষের ওপর হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তা আর জীবন নির্ভর করে। মাঝে মাঝে মনে হয় ছেড়ে দেই। কিন্তু জীবিকার দায়ে পারি না।’
দুর্ঘটনার বর্ণনা দেন এভাবে, ‘২০০৮ সালের দিকে হবে। একটা বাচ্চা রেললাইনের পাশে বসে খেলছিল। হঠাৎ কী মনে করে বাচ্চাটা ট্রেনের সামনে চলে এলো। অনেক হুইসেল বাজালাম, কিন্তু তার মৃত্যু ঠেকানো গেল না। ওই বাচ্চাটা মারা যাওয়ার পর অনেক রাত আমি ঘুমাতে পারিনি।’ আলাপে উঠে আসে আত্মহত্যার বিষয়ও। মনিরুল বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২৫-এরও বেশি মানুষের আত্মহত্যা দেখেছি। কেউ হুট করে সামনে চলে আসে। কেউ এসে পাশ থেকে লাফ দেয়। কেউ আবার আগে থেকেই শুয়ে থাকে।’ এ ক্ষেত্রে কী করেন? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘কী করব। শুধু ছোট বোম ব্লাস্ট (বোমা বিস্ফোরণ) হওয়ার মতো মানুষ ছিন্নভিন্ন হওয়ার শব্দ শুনি। ওইটুকুই বুঝতে পারি। কিন্তু বুঝলেও উপায় নাই। একটু অন্যমনষ্ক হলে ট্রেনে থাকা হাজারো মানুষের জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।’ রাতে ট্রেন চালানোর সময় ঘুম বা ঝিমুনি আসলে কী করেন? উত্তরে বলেন, ‘আমার অ্যাসিট্যান্ট (সহকারী) থাকে। তার সঙ্গে গল্প করি। ইচ্ছা করলেই আমরা বিশ্রাম নিতে পারি না।’
লোকোমাস্টার আবদুর রশিদ সরকার (৫৩) জানান, লোকোমাস্টার (পূর্ণাঙ্গ ট্রেনচালক) হিসেবে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা ৩৬ বছর। বগুড়ার শাহ সুলতান কলেজে পড়ার সময় সহকারী লোকোমাস্টার পদে চাকরি পান। আলাপের শুরুতেই বলেন তার দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা। দুঃখজনক এসব ঘটনার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় লাশ দেখলে ভয়ে কাঁদতাম। চাকরি শুরুর পর ট্রেনে কাটা লাশের ছিন্নভিন্ন অংশ দেখে মনে হয়েছিল, এই চাকরি করব না। কিন্তু পেট চালানোর দায়ে সব সয়ে গেছে।’
রশিদের জীবনে আত্মহত্যা দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বলছিলেন, ‘একবার এক নারীকে দেখলাম বাচ্চা নিয়ে রেললাইনে শুয়ে ছিল। আত্মহত্যা। খুব খারাপ লেগেছিল আমার। আমার ঘরেও তো সন্তান আছে।’ বড় ট্রেন দুর্ঘটনারও সাক্ষী রশিদ। তারই বিবরণ শোনালেন, ‘এএলএম (সহকারী লোকোমাস্টার) থাকাকালীন একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল জয়পুরহাটে। গভীর রাত; একটা বালুর ট্রাক ট্রেনের সামনে চলে আসছিল। হুইসেল দিয়েছিলাম, গাড়ি থেকে মাথা বের করে চিৎকার করেছি। কিন্তু ঠেকাতে পারিনি। ট্রেন ট্রাকের ওপরে উঠে গিয়েছিল। ইঞ্জিনের বাইরে এসে দেখলাম ট্রেনটা কাত হয়ে পড়া।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন, ‘কথাগুলো বলতে গিয়ে শরীরের লোম শিউরে উঠছে। ট্রেন থেকে নেমে দেখি কারও ছিন্নছিন্ন শরীর পড়ে আছে, কেউ ঝুলে আছে ট্রেনের জানালায়। কারো মাংস আলাদা হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে। ওই ঘটনার পর অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। এক বছর সময় লেগেছিল নিজেকে স্বাভাবিক করতে।’ দুর্ঘটনায় হতাহতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পরে জানতে পারি ওই ঘটনায় অন্তত ১৩ জন মারা গেছে। আহত হয়েছিল শতাধিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে ট্রেনের ছাদে দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা অহরহ। ট্রেন চালাচ্ছি। হঠাৎ করেই শব্দ হয়। পরের স্টেশনে থামানোর পর দেখি কারো মাথা পিষে গেছে ওভারব্রিজের সঙ্গে লেগে, কেউ অসতর্কতাবশত পড়ে গেছে। আসলে জনগণেরও সতর্ক হওয়ার বিষয় থাকে।’ এসব দুর্ঘটনার দায়ভার আসলে কার? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের ট্রেন লাইনে কোরিয়া, জাপানি, জার্মান, ইন্ডিয়া, আমেরিকা, হাঙ্গেরিসহ নানা দেশের ইঞ্জিন আছে। তাদের ইঞ্জিন ভালো, লাইনও ভালো। কিন্তু আমাদের লাইনেরও সমস্যা, ইঞ্জিনও অনেক পুরাতন। পুরাতন ইঞ্জিনকেই আমরা ঘষে-মেজে মেরামত করে চালাই। ট্রেন অনুযায়ী চালক কম।’
চালক সংকট কাটানো হয় কীভাবে? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত ডিউটি করি। এমন দিন গেছে যে, একনাগাড়ে ৯৬ ঘণ্টা ধরে ট্রেন চালাতে হয়েছে।’ ট্রেন চালনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য যানবাহনের চেয়ে ট্রেন চালানো অনেক কঠিন। যে লাইনে আমি ট্রেন চালাব তার সিগন্যাল, লাইট, চাকার পাটাতনের প্রতিটা ইঞ্জিন সম্পর্কে ধারণা রাখতে হয়। রাতের অন্ধকারে যখন গাড়ি যাবে, তখন লাইনের কোথায় উঁচু-নিচু, কোথায় চিকন, কোথায় ব্রিজ সবকিছু খেয়াল রাখতে হয়।’
ট্রেন চালনার সূত্রে চলে এলো নির্দেশনা, সতর্কতা, পদক্ষেপ আর বাস্তবায়নের বিষয়টি। ট্রেনচালকদের প্রতি যেসব নির্দেশনা আছে তা সবাই মেনে চলে কি নাÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে চালকরা জানান, ব্রিটিশ আমল থেকে এখন পর্যন্ত এই আইনটা বলবৎ আছে যে, ট্রেন লাইনের দুই পাশে ১০ গজের মধ্যে কোনো মানুষ থাকা যাবে না। অথচ লোকজন রেললাইনের ওপরে বসে থাকে, ছাগল-ভেড়া বেঁধে রাখে। এমনকি বসে বাজার, আছে বসতিও। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? এ বিষয়ে চালকদের মন্তব্য, সতর্কতা ও আধুনিকায়নই পারে চিত্র পাল্টাতে। জনগণকে সতর্ক করতে সরকার ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ট্রেনচালকরা।
