আমরা দুটি শব্দ ব্যবহার করি, শব্দ দুটির মধ্যকার পার্থক্য না বুঝে। শব্দ দুটি হলো- জলবায়ু আর আবহাওয়া। জলবায়ু হলো গত তিন দশকের গড় অবস্থা। আমরা গত তিন দশকের আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য নিলে দেখতে পাব তার মধ্যে কিছু নিয়ম আছে। যেমন আষাঢ়-শ্রাবণে প্রচুর বৃষ্টি হয়, পৌষ-মাঘে প্রচন্ড শীত পড়ে। এগুলোকে কেন্দ্র করে অনেক ধরনের প্রচলিত জ্ঞান, প্রবাদ-প্রবচন চালু আছে। যেমন একটি খনার বচন উনো বর্ষায় দুনো শীত। অর্থাৎ যে বছর বৃষ্টি কম হবে সে বছর শীত বেশি পড়বে। এ বছর বৃষ্টি কম হয়েছে। তাহলে তো শীত বেশি পড়বে। কই শীত তো তেমন পড়ল না।
মাঘ মাস। কথায় আছে বাঘের শীত মাঘে পড়ে। অর্থাৎ মাঘে প্রচন্ড শীত পড়ে। কিন্তু কই এবার তো তেমন শীত আমরা পড়তে দেখছি না। কিন্তু এর আগে একটা গড় হিসাবে নির্দিষ্ট কতকগুলো ধারণা পাওয়া যেত। যেমন পহেলা বৈশাখে কালবৈশাখী ঝড় হবে। সেটা দোসরা বৈশাখেও হতে পারে। এ সময় মাছ উজানে চলে যাবে। আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে কদম ফুল ফুটবে। দোলনচাঁপা ফুটবে। আর আবহাওয়া শব্দটি হলো তাৎক্ষণিক। আজকে এই মুহূর্তে কী রকম অবস্থা। অর্থাৎ রোদ উঠেছে, বৃষ্টি পড়ছে এ রকম। বৈশ্বিক আবহাওয়া এবং জলবায়ুতে যে নিয়মতান্ত্রিকতা ছিল তা ভেঙে পড়তে শুরু করছে। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিকভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধি। বিশ্ব ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে আবহাওয়ার উপাদানগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। যেমন গত বছর চৈত্র মাসে প্রচন্ড বৃষ্টি হয়েছে। অথচ আষাঢ় মাসে তেমন একটা বৃষ্টি হয়নি। আবার আমরা দেখতাম বৃষ্টি প্রথমে আস্তে শুরু হচ্ছে। এরপর বৃষ্টির ঝাপটা বাড়তে থাকল। আবার আধঘণ্টা পর বৃষ্টির ঝাপটা বা গভীরতা কমে আসল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি বৃষ্টি কমার আশায়। বৃষ্টি আস্তে আস্তে কমে আসল। আবার কিছুক্ষণ পড়ে আবার জোরে বৃষ্টি পড়া শুরু করল। এভাবে তিন দিন/চার দিন, কখনো সাত দিন, এমনকি টানা ২০ দিন বৃষ্টি চলল। মাঝে মাঝে সূর্যের লুকোচুরি দেখা গেল। কিন্তু এখন এমনটি আর হচ্ছে না।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে আবহাওয়ায়। আবহাওয়ার যে অনুমান করার ক্ষমতা ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় এখন আষাঢ় মাসের পরিবর্তে চৈত্র মাসে কদম ফুল ফোটে। এবার আমি ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে দোলনচাঁপা বিক্রি হতে দেখেছি। বন্যার সময় বদলে যাচ্ছে। খরার সময় বদলে যাচ্ছে। আগে যেমন একটানা শীত পড়ত সেটা আর এখন হয় না। কুয়াশার প্রকোপ বাড়ছে। ঘন কুয়াশা পড়ছে। বজ্রপাত বাড়ছে। বিশ্বের হিসাবে গত বছর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়েছে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে। সরকার অবশ্য বজ্রপাত ঠেকাতে তালগাছ লাগিয়েছে। সেই তালগাছ যদি এক বছরের মধ্যে বিশ বছরের আকার-আয়তন ধারণ করত তাহলে কাজ হতো। তাই গাছ বড় না হওয়া পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। সুমদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। পানির উচ্চতা বাড়ায় লবণাক্ততা ক্রমান্বয়ে ভেতরে ঢুকছে। বর্ষাকালে উজানের পানির চাপে লবণাক্ততা কিছুটা কমে। কিন্তু শুকনো মৌসুমে লবণাক্ততা ভেতরে প্রবেশ করে। কুষ্টিয়া বা গোপালগঞ্জের নদীর পানি মুখে নিলে একটু লবণ লাগে। সাতক্ষীরার পানি এত লবণাক্ত যে, ওই পানি খাওয়া তো দূরের কথা, গোসলই করা যায় না।
বিশ্বজুড়ে সুমদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বরফ গলা। উত্তর মেরুতে বরফ গলাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা উত্তর মেরুতে কোনো ল্যান্ড বা ভূমি নেই। সুতরাং এর ফলে নতুন কোনো পানি উৎপাদিত হয় না। কিন্তু অ্যান্টারটিকা মহাদেশে যে বরফ আছে তা গললে বিপদ। এখন সেই বরফ গলে সুমদ্রের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সঙ্গে সূর্যের তাপ সমুদ্রের পানির উচ্চতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় বাড়ছে, জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচটি বড় ঘূর্ণিঝড় হওয়ার পর তাদের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত ঘাবড়ে গিয়েছিল। আমাদের মাঘ মাসে অস্ট্রেলিয়ায় গরম পড়ে। কিন্তু এবার অস্ট্রেলিয়ায় তাদের রেকর্ড সর্র্বোচ্চ গরম পড়েছে। অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় বন্যা হচ্ছে। ডিসেম্বরে কাতারে বন্যা হয়েছে, সৌদি আরবে প্রায়ই বন্যা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডে বন্যা হয়েছে। আবার অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসে গত চার-পাঁচ বছর বৃষ্টি হয়নি। দক্ষিণ সুদান বা আফ্রিকার কয়েকটি জায়গায় পাঁচ-ছয় বছর বৃষ্টি হয়নি।
আবহাওয়ার এই অদ্ভুত পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া। আমাদের কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশ আগে চাল রপ্তানি করত, গত বছর তাকে চাল আমদানি করতে হয়েছে। এর কারণ হলো প্রাক বর্ষায় সুনামগঞ্জে প্রচুর বন্যা হওয়ায় ধানের প্রচন্ড ক্ষতি হয়েছে। আবার বর্ষার শেষে বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জে অতিবৃষ্টির কারণে ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। তাই সরকার বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানিকারক দেশ আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। ফসলের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। সাধারণত আম পাকার কথা মে মাসে। কিন্তু গত বছর আম পেকেছে জুন মাসের শেষে। ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষিরা ২ থেকে ৫ টাকা দরে আম বিক্রি করেছে। এতে হয়তো বা আমরা ঢাকা শহরে ২০-৩০ টাকা কেজিতে আম খেয়ে তৃপ্তি লাভ করেছি, কিন্তু যারা আমচাষি বা আমবাগানের মালিক অর্থাৎ যাদের উপার্জন আম চাষের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাথায় হাত বসেছে।
এই যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে তার মূল কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়া। এর আরও মূল কারণ হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রো অক্সাইড ইত্যাদি গ্যাস বৃদ্ধি পাওয়া। বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়া সবচেয়ে ক্ষতির কারণ। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ, যানবাহন থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। মানুষ আরাম আয়েশ চায়। আমাদের এয়ারকন্ডিশন চাই, ফ্রিজ চাই, গাড়ি চাই। এগুলো চালাতে গেলে বিদ্যুৎ প্রয়োজন। আর বিদ্যুতের জন্য তেল বা কয়লা পোড়ানো চাই। এর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বিপুল মাত্রায় নির্গত হচ্ছে। তাই এখন বিকল্প জ্বালানি উৎস প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে এখন ঝুঁকতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, পানি থেকে বিদ্যুৎ, বাতাস থেকে বিদ্যুৎ, ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।
পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা বাংলাদেশের তেমন নেই। তবে ভারতের ত্রিপুরা, আসাম বা মিজোরাম এবং নেপাল ও ভুটান থেকে নদীর উজানের পানি আসে। তাই বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মিলে পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিতে পারে। বাংলাদেশ অবশ্য গ্রিনহাউস গ্যাস তেমন একটা নির্গমন করে না। তাই এই বিষয়ে বাংলাদেশের তেমন একটা মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এর প্রভাবে বাংলাদেশে ভূমিধস বাড়ছে, বাড়ছে নদীর ভাঙন। পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়ছে, রোগবালাই বাড়ছে। ডেঙ্গুজ্বর হচ্ছে, চিকুনগুনিয়া হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।
অবশ্য বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে এগিয়ে ছিল। আমি এখানে অতীত শব্দটি ব্যবহার করতে চাই। কেননা বাংলাদেশ ২০০৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তনে দলিল তৈরি করেছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক দেশ এই ব্যাপারে এগিয়ে গেছে কিন্তু আমরা পিছিয়ে গেছি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ জরুরি।
এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ হ্রাস করার জন্য বৈশ্বিকভাবে অর্থায়ন চলছে। বাংলাদেশকে এই অর্থ সংগ্রহে আরও তৎপর হতে হবে। আশার কথা হলো, সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছিল। এখন অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় একে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন সরকার এই বিষয়ে আরও উদ্যোগী ও তৎপর হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তারা অবশ্য তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে।
বিশ্বে যারা কার্বন উৎপাদন করে, তারা সবই শিল্পোন্নত দেশ। এই ব্যাপারে বাংলাদেশের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু এর সবচেয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া যেসব দেশগুলোতে পড়বে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তাই বাংলাদেশের সকল কর্মকা-, সকল প্রকল্প এই সংক্রান্ত হওয়া উচিত। এরই মধ্যে পদ্মা সেতুর পিলার জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করে স্থাপন করা হচ্ছে। এ রকম উদ্যোগ সব ক্ষেত্রেই অব্যাহত রাখতে হবে।
লেখক
সাবেক উপাচার্য, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ
