ক্ষীরশাপাতি আমের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ পেয়েছে বাংলাদেশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোরে ক্ষীরশাপাতি নামে পরিচিত হলেও সাতক্ষীরা ও যশোর এলাকায় এটি ‘হিমসাগর’ হিসেবে পরিচিত। এ আমের জিআই সনদ আজ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করবেন শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। ফলে ক্ষীরশাপাতি এখন থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বত্ব হিসেবে সংরক্ষিত হবে।
এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) নিবন্ধক মো. সানোয়ার হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ঐতিহ্যবাহী পণ্য আছে, যা ওইসব জেলার মাটির গুণাগুণ, পরিবেশ-জলবায়ু, চাষাবাদ পদ্ধতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। এসব পণ্যের জিআই সনদের মাধ্যমে স্বত্ব সংরক্ষণ করে আমরা দেশ-বিদেশে ব্র্যান্ডিং করার উদ্যোগ নিয়েছি। তারই অংশ হিসেবে ক্ষীরশাপাতি আমের সনদ পাওয়া গেছে।’
তিনি বলেন, ‘ঢাকায় যত আম বিক্রি হয়, সবই রাজশাহীর আম হিসেবে বিক্রি হয়। কিন্তু ক্ষীরশাপাতিসহ আরও বিভিন্ন জাতের আম রয়েছে, যেগুলো অন্য এলাকায়ও উৎপাদিত হয়। ‘রাজশাহীর আম’ নামে সব বিক্রি হওয়ায় একদিকে ক্রেতারা ঠকছেন, অন্যদিকে উৎপাদকও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। জিআই সনদের কারণে এই আমকে এখন আর রাজশাহীর আম হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচয় দেওয়া যাবে না। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি পাবে।’
ভারত এ আমের জিআই সনদ নিতে পারবে কি না এমন প্রশ্নে সানোয়ার হোসেন বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঘেঁষা ভারতের মালদহে এ আম চাষ হয়। তাই চাইলে তারাও জিআই করে মালদহের আম হিসেবে পরিচিতি দিতে পারবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুল জলিল বলেন, ‘ক্ষীরশাপাতি আমের জিআই এখন বাংলাদেশের। এর প্রয়োজনীয় সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। রবিবার এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ আমের জিআই সনদ শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন হস্তান্তর করবেন। অনুষ্ঠানে শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বত্ব সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ক্ষীরশাপাতি আমের জিআই সনদ নেওয়ার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া ও আশ্বিনা আমকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র।
বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া সুস্বাদু ক্ষীরশাপাতি আম দেশের চাহিদা মিটিয়ে গত তিন বছর ধরে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আর এ কারণে আমচাষি, বাগান মালিক, ব্যবসায়ীসংগঠনগুলো ক্ষীরশাপাতি আমকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির দাবি করছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জিআই নিবন্ধিত হলে এ আমে আলাদা ট্যাগ বা স্টিকার ব্যবহার করা যাবে। প্রাকৃতিক উপায়ে আম উৎপাদন করে সব গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে বাজারজাত করতে হবে। বিশেষ জাতের আম আলাদাভাবে চিহ্নিত হওয়ায় বাজারে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়া যাবে। রপ্তানিতেও বেশি দাম মিলবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৬ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে প্রায় ২০ লাখ আমগাছ রয়েছে। জেলায় ২৫০ জাতের আমের চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় জাত ক্ষীরশাপাতি। ১৯৫৫ সালের প্রাচীন লোক সংস্কৃতি ‘আলকাপ’ গানের কথায় ২০০ জাতের আমের মধ্যে ক্ষীরশাপাতি আমের নামও রয়েছে।
