বখাটেরা বেপরোয়া, নারীদের হেনস্থা করছে পুলিশও

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০৪:২০ এএম

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বখাটেরা। রাস্তার মোড়ে কিংবা বাসস্টপেজে একটু সুযোগ পেলেই অশালীন অঙ্গভঙ্গি, কটূক্তিসহ অনেক ক্ষেত্রে পথরোধ করে অশালীন প্রস্তাব দিচ্ছে তারা। খোদ রাজধানীতেই এমন চিত্র বেশি চোখে পড়ছে। বখাটের তালিকায় ধনীর দুলাল থেকে শুরু করে রয়েছে বাসের হেলপারও। তাদের কাছে যেন অনেকটাই জিম্মি হয়ে পড়েছে রাস্তায় চলাচলরত কর্মজীবী কিংবা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া মেয়েরা। এমনকি রাস্তায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কেউ কেউ গভীর রাতে কোনো নারীকে একা পেলে হেনস্থা করার মতো দৃষ্টান্তও রয়েছে। বখাটেদের উৎপাত মুখ বুজে সহ্য করেই ভোর কিংবা রাতে রাস্তায় চলাচল করছেন নারীরা। তবে দিন দিন তাদের উৎপাত বেড়েই চলেছে বলে জানিয়েছেন একাধিক নারী।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমগ্র দেশেই নারীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। নারীকে যথাযথ সম্মান করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন পুরুষ অপ্রয়োজনে গভীর রাতে বাইরে বের হলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু একজন নারী প্রয়োজনে গভীর রাতে বের হলেও অনেক সময় হয়রানির শিকার হয়।’

কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গত বুধবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর মহাখালীর আমতলী এলাকায় বখাটেদের খপ্পরে পড়েন বেসরকারি টেলিভিশন ‘চ্যানেল ২৪’-এর নিরাপত্তাকর্মী লাইজু বেগম। হেঁটে যাওয়ার সময় বখাটে আলমগীর ও তার সহযোগী পেছন থেকে লাইজুর ওড়না টেনে ধরে এবং খারাপ প্রস্তাব দেয়। এর প্রতিবাদ করায় তাকে শারীরিকভাবে আঘাত ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়। আঘাতে তার মুখে সৃষ্ট ক্ষতে আটটি সেলাই পড়েছে। এ সময় সেখান দিয়ে যাওয়া সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার তাপস কুমার দাস তাকে রক্ষা করেন। লাইজু বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি অফিসে যাওয়ার সময় দুজন লোক আমাকে খারাপ প্রস্তাব দেয়। আমি খুব বিনয়ের সঙ্গে বলি, ভাই আমি ওই ধরনের মেয়ে নই, অফিসে যাচ্ছি। এ কথা বলার পর আমাকে গালমন্দ করে মারপিট শুরু করে ও রাস্তার পাশেরই এক গলিতে নিতে টানাহেঁচড়া শুরু করে। এ সময় সাদা পোশাকে পুলিশের লোক এসে আমাকে উদ্ধার করে।’

গত বছরের ২২ অক্টোবর রাত ২টার দিকে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী এক তরুণী হেনস্থার শিকার হন। গভীর রাতে কেন রাস্তায় বের হয়েছেন প্রশ্ন করে তার পরিবার নিয়েও আপত্তিকর কথা বলেন পুলিশ সদস্যরা। ওই তরুণীর সঙ্গে পুলিশের বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালও হয়। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ একটি তদন্ত কমিটি করে। প্রাথমিকভাবে দুই পুলিশ সদস্যকে শনাক্ত করে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

ঢাকার বিভিন্ন কর্মজীবী হোস্টেলে থাকা নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের নানা অভিজ্ঞতার কথা। বেশিরভাগই জানান, রাস্তায় চলার সময় নানা কটূক্তি অনেকটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে তাদের। পরিবারপরিজন ছেড়ে জীবনের তাগিদে শহরে থাকায় বখাটেদের প্রতিবাদ করতেও ভয় পান তারা। নীলক্ষেত কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে থাকা এক নারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাস্তায় চলাচল অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। অফিস শেষে রাতে হোস্টেলে ফেরার পথে বখাটেরা পাশ থেকে বাজে কথা বলে। তবে হোস্টেলের ভেতরে বা কাছাকাছি কেউ বিরক্ত করার সাহস পায় না।’

তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠন বলছে, নারী শ্রমিকরা মাঝেমধ্যেই হয়রানির শিকার হন। তবে ধর্ষণের মতো বড় ধরনের অঘটন না ঘটলে তা চেপে যান অধিকাংশ নারীই। তারা অফিসে পুরুষ বসের কাছেও হয়রানির শিকার হন। আর প্রতিবাদ করলে হারাতে হয় চাকরি। মিরপুরের একটি পোশাক কারখানার নারী শ্রমিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অফিস শেষে বাসায় যাওয়ার পথে একা পেলেই বখাটেরা বাজে কথা বলে। খারাপ প্রস্তাবও দেয়। প্রতিবাদ করলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। পেটের জন্য কাজ করি। তাই কোনো ঝামেলা করতে চাই না।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গার্মেন্টসের নারীশ্রমিকরা কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফেরার সময় বেশি হয়রানির শিকার হয়। তবে তারা এগুলো চেপে যায়। বড় ধরনের অঘটন ঘটলেই বিষয়টি প্রকাশ পায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত সপ্তাহে এক নারীশ্রমিক তার অফিসের সুপারভাইজরের দ্বারা যৌন হেনস্থার শিকার হন। এর প্রতিবাদ করায় তাকে চাকরি হারাতে হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত