আগের দুই রাতে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু না হতেই গ্যালারি ফাঁকা হতে শুরু করেছিল। শীতের রাত। ১০টাতেও খুব গভীর লাগে। কিন্তু গতকাল জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে এবি ডি ভিলিয়ার্স ও অ্যালেক্স হেলস যে ব্যাটিং-সুধা পান করাচ্ছিলেন তাতে উপভোগের পেয়ালাও উপচে পড়তে লাগল। আসন থেকে নেমে শেষে বেষ্টনীর খুব কাছে গিয়ে দুই বিস্ফোরক ভিন গ্রহের ব্যাটসম্যানকে যেন আবিষ্কার করতে চায় শত শত জোড়া চোখ, আরও কাছ থেকে। কীভাবে ঢাকা ডায়নামাইটসের মতো শিরোপাপ্রত্যাশী ও সাবেক চ্যাম্পিয়ন দলের বিশাল সংগ্রহটাকে এমন মামুলি বানিয়ে ফেলেন ওরা!
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্সের বিদেশি শীর্ষ চার ব্যাটসম্যান এখন বিপিএলের সন্ত্রাস। যে কারও জন্য হুমকি। ঢাকা ডায়নামাইটসের দেওয়া ১৮৭ রানের টার্গেটও গেল রাতে দ্বিতীয় ম্যাচে রংপুর জয় করেছে ১০ বল হাতে রেখে। ৮ উইকেটের মহাদাপুটে জয়ের দুই নায়ক বিপিএলে প্রথম সেঞ্চুরি করে ঠিক ১০০ রানে অপরাজিত এবি ডি ভিলিয়ার্স ও ৮৫ রানে অপরাজিত অ্যালেক্স হেলস। আর এমন সুস্পষ্ট ব্যবধানের বিশাল জয়ে ঢাকাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে রংপুর যেন এবারের আসরের প্রথম দেখায় হারের নির্মম শোধ তুলল!
শিরোপাপ্রত্যাশী মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার রংপুর ১০ ম্যাচে ১২ পয়েন্ট নিয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ও চিটাগং ভাইকিংসের সমান্তরালে এখন। আর আসরের প্রথম চার ম্যাচ দাপটে জেতা সাকিব আল হাসানের ঢাকা টানা তিন ম্যাচে হারল। ৯ ম্যাচে ১০ পয়েন্ট নিয়ে তিন দলের পর তারা। উল্টো রথে চলছে এখন সাবেক চ্যাম্পিয়ন ঢাকা। এবার তাদের হারালেন স্রেফ ওই দুই ব্যাটসম্যান। তৃতীয় উইকেটে টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের রেকর্ড ১৮৪ রান ডি ভিলিয়ার্স ও হেলসের। ৫ রানে ক্রিস গেইল (১) ও ইনফর্ম রাইলি রুশোকে (০) হারানোর পর তারা ম্যাচ জিতেও অবিচ্ছিন্ন। মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডি ভিলিয়ার্স ব্যাটকে কুঠার বানিয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৫০ বলে ৬ ছক্কা ও ৮ চারে তার ওই ১০০। আর হেলসের ৮৫ এসেছে ৫৩ বলে। ৩টি ছক্কা ও ৮টি চারে।
ডি ভিলিয়ার্সের খেলার সৌন্দর্য অন্য জায়গায়। উইকেটকে কথা শোনান তিনি। সবদিকে খেলেন সব বোলারের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে। ক্যারিয়ারের চতুর্থ টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরিটা করার পথে যেমন করলেন। তাতে সাকিবের মতো বোলারকেও বারবার হতাশায় ডুবতে হয়েছে। কখনো নিজের জন্য। কখনো দলের অন্য কারও জন্য। কাউকে ক্ষমা করেন না ভিলিয়ার্স, হেলসরা।
ক্রমোন্নতির ধারায় আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন হেলস। গেল রাতে ডি ভিলিয়ার্স যখন আগুন ছড়াচ্ছেন, তখন অনেকটা সহচরের ভূমিকায় তিনি। রংপুরের সমর্থকরা নিশ্চিতভাবে শঙ্কায় ভুগছিল ফিফটি পারসেন্ট আশা হারিয়ে। এবারের আসরের সর্বোচ্চ সংগ্রাহক আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান রুশো ও নিস্প্রভ গেইল দ্বিতীয় ওভারেই আন্দ্রে রাসেলের শিকার। সেখান থেকে কখনো ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ার কোনো সুযোগ না দিয়েই বীরের মতো ডি ভিলিয়ার্সদের জয়োৎসব।
ওই আন্দ্রে রাসেলেরই ক্যাচটা ফরহাদ রেজা নিয়েছিলেন দারুণভাবে। বাতাসে ভেসে। নজরকাড়া সেই ক্যাচের পর ঢাকার রানের চাকা ধীর হয়েছিল। যার প্রভাব শেষে পড়েছে মোট সংগ্রহে। দুশো হয়নি। ২৪ বলে ফিফটি করে ফেলেন ডি ভিলিয়ার্স। ইংলিশম্যান হেলসের টানা তৃতীয় ম্যাচে পঞ্চাশ পেরিয়েছেন। এবারের ফিফটি ৩৩ বলে। ১৮তম ওভারে এসে ৫০ বলেই সেঞ্চুরিটা দক্ষিণ আফ্রিকান ডি ভিলিয়ার্সের। আরও কিছু রানের দরকার হলে হেলসের টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটাও হতো নিশ্চিত। কিন্তু সে সুযোগ ছিল না। বাউন্ডারি মেরে খেলে শেষ করেছেন।
সবার চোখ ছানাবড়া করে দেওয়া ডি ভিলিয়ার্স অবশ্য ম্যাচশেষে সংবাদ সম্মেলনে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের মাত্র চতুর্থ সেঞ্চুরিটাকে পাত্তাই দিলেন না! এটার তার কাছে কতটা বিশেষ প্রশ্নে পাল্টা প্রশ্ন, ‘সত্যি বলব না মিথ্যে করে?’ ‘সত্যি’। জানান, ‘দলকে জেতানোই তার কাছে সবচেয়ে বড়। সেঞ্চুরির গুরুত্ব একফোটাও নেই।’
এমন অবলীলায় যে মানুষ প্রতিপক্ষকে নিয়ে খেলেন তাকে অবশ্য চুক্তির ৬ ম্যাচ পর আর পাবে না রংপুর। মানে আর দুই ম্যাচ। দ্বিতীয়বার ভাববেন রংপুর শেষ চারে তো চলেই গেল। না। ডি ভিলিয়ার্সের অকপট ও জোরালো উচ্চারণ, ‘পরিবারকে সময় দিতেই তো আমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়েছি। পরিবারকে সামনে রেখেই শিডিউল করি। ক্রিকেটের চেয়ে, সবকিছুর চেয়ে আমার কাছে পরিবার বড়।’
অবশ্য তার আশা এখনো ম্লান গেইলের কাছে। ‘লিজেন্ড ও। আশা করছি শিগগিরই সেঞ্চুরি করে ফেলবে।’ এই তিনের সঙ্গে গেইলের ব্যাট কথা বললে আর কিছু লাগে কি রংপুরের!
ঢাকা ডায়নামাইটস : ১৮৬/৬, ২০ ওভার (রনি তালুকদার ৫২, পোলার্ড ৩৭*, নারিন ২৮, সাকিব ২৫, জাজাই ১৭, রাসেল ১৪; ফরহাদ রেজা ২/৩২, শহিদুল ১/২৬, মাশরাফী ১/৩০, শফিউল ১/৩৫, নাজমুল ১/৩৫)।
রংপুর রাইডার্স : ১৮৯/২, ১৮.২ ওভার (ডি ভিলিয়ার্স ১০০*, হেলস ৮৫*, গেইল ১, রুশো ০; রাসেল ২/৩০, সাকিব ০/৪১, রুবেল ০/৪২, নারিন ০/৪৫)
ফল : রংপুর রাইডার্স ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচসেরা : এবি ডি ভিলিয়ার্স।
