অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে এআইআইবির প্রতিবেদন

বছরে দুই লাখ কোটি টাকা দরকার বাংলাদেশের

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:৫৮ পিএম

মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ কিংবা সরকার ঘোষিত ‘ভিশন-২০২১’ বাস্তবায়ন করতে অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশকে প্রতি বছর দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে হবে বলে জানিয়েছে চীনভিত্তিক বহুদেশীয় ব্যাংক এশীয় অবকাঠামো ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। টাকার অংকে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় দুই লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ে চলতি অর্থবছরের বাজেটে যে অর্থ বরাদ্দ রেখেছে, এই অংক তার চেয়েও প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

গতকাল ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স’ শিরোনামে প্রকাশিত তাদের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে আগামী তিন বছর এই হারে বিনিয়োগ করে যেতে হবে বাংলাদেশকে। অর্থাৎ, ২০২১ সাল পর্যন্ত অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ দরকার ছয় লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।

চলতি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছে। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রয়েছে এক লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, গত ১ জুলাই থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরে সরকার সারা দেশে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে খরচ করতে এক লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

এশিয়ার দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করা এআইআইবি’র প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য বাংলাদেশ। বর্তমানে ব্যাংকটির সদস্য সংখ্যা ৯৩ দেশ। ব্যাংকটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ বাড়বে। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে ধীরগতি নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার আশঙ্কা প্রকট বলে মনে করছে সংস্থাটি।

পদ্মা বহুমুখী সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরসহ চলমান ৯টি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এ বছর বাংলাদেশ এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেবে। উন্নয়ন খাতে বাংলাদেশ বছরে দুই হাজার ৬০ কোটি ডলার বরাদ্দ দেবে। সরকার পরিবহন, জ্বালানি, পানি সরবরাহ ও আবাসন খাতে বেশি গুরুত্ব দেবে।

বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হওয়ায় অর্থের অভাবে উন্নয়ন কাজ থমকে যেতে পারে বলে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে এআইআইবি’র প্রতিবেদনে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ব্যয় অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। এর কারণ অনুসন্ধানে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে বহুজাতিক ব্যাংকটি বলেছে, উন্নয়ন পরিকল্পনার বেশিরভাগই ২০১৯ সালে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। তার অনেকগুলোই বাস্তবায়ন না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ জন্য নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধিই বড় কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইআইবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত পণ্যের বেশিরভাগই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এসব পণ্য আমদানিতে বেশি টাকা ব্যয় হচ্ছে। আবার সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির কারণে মুদ্রাস্ফীতির চাপও রয়েছে। এ কারণে আগামী তিন বছরে টাকার আরও অবমূল্যায়ন হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আমদানির চেয়ে রপ্তানির পরিমাণ কম। এ অবস্থার মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আরও বেশি কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়ছে। ফলে ডলার, পাউন্ড, ইউরোসহ অন্য বিদেশি মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান দুর্বল হয়ে গেছে।

এআইআইবি’র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁচামালের ব্যয় বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন খরচের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ইস্পাত ও পাথরের মতো কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় দেশটিতে নির্মাণ খাতের বাজারও অস্থিতিশীল। সিমেন্ট ও বিলেটে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও এসব পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামালও আমদানি করতে হয়।

আশঙ্কার সঙ্গে আশার কথাও জানিয়েছে এআইআইবি। সংস্থাটি বলেছে, সব বাধা ডিঙানোর সামর্থ্য রয়েছে বাংলাদেশের। এআইআইবির পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির ভাইস প্রেসিডেন্ট জোয়াচিম ভন আমসবার্গ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বর্ধনশীল। উন্নয়নের বর্তমান ধারা বজায় রেখে অবকাঠামো খাতের ঘাটতি মোকাবিলার সময় এখনই। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে এআইআইবি পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।

এআইআইবির প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জ্যাং পিং থিয়া বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ছে। নির্মাণ ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উন্নতি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত