রাজধানীর ফাঁকা রাস্তায় বিশেষ করে রাতে বেপরোয়া গতিতে চলে মালবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস। ফলে রাজধানীর সড়কগুলো পথচারীদের জন্য মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ। এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই ঘটছে রাত ১১টার পর থেকে রাস্তা ফাঁকা হতে শুরু করলে। এ সময় সড়কে পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ না
থাকায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় সড়কজুড়ে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং সড়কে পুলিশের চাঁদাবাজি।
বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি হাজি মো. তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে পণ্য পরিবহন রয়েছে সাড়ে তিন লাখের ওপর। কিন্তু সেই অনুযায়ী দক্ষ ড্রাইভার তৈরি হচ্ছে না। মূলত সামাজিক মর্যাদা না থাকায় কেউ ড্রাইভার হতে আগ্রহ দেখায় না।’ বেপরোয়া গতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সড়কে মালবাহী ট্রাক দেখলেই পুলিশ আটক করে। টাকা নিতে চায়। এজন্য অনেক সময় টাকা না দিতে ড্রাইভাররা উল্টোপাল্টা গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে।’
চাঁদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করে ট্রাফিক উত্তরের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার প্রবীর কুমার রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার জানামতে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতে পরিবহনে পুলিশের চাঁদাবাজির ঘটনা নেই। বেপরোয়া গাড়ি চালানো আর সচেতনতার অভাবেই ঘটছে দুর্ঘটনা।’
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর এক জরিপে উঠে এসেছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে সড়কে ৩ হাজার ১০৩টি দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৩৯ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং আহত হয়েছে ৭ হাজার ৪২৫ জন।
এর আগে গত শুক্রবার বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ২০১৮ সালে সড়কে ৫ হাজার ৫১৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে ৭ হাজার ২২১ জন। আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৪৬৬ জন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর কারওয়ানবাজার মোড়ে বেপরোয়া গতিতে চলছে মালবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস। ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এ সড়কের ক্রসিংয়ে একজন ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্বে রয়েছেন। তবে তিনি নিষ্ক্রিয়। ফলে যানবাহনেরও নেই কোনো শৃঙ্খলা। সড়কের সিএনজি, প্রাইভেট কার ও মোটরবাইকের চলাচল সব থেকে বেশি। তবে ভারী যানবাহনের তীব্র গতির সামনে ভয়ে ভয়ে চলছে ছোট যানবাহনগুলো।
কারওয়ানবাজার ক্রসিংয়ে ট্রাফিকের দায়িত্বে থাকা আশরাফুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাত গভীর হতে থাকলে ফাঁকা হতে শুরু করে রাস্তা। এ সময় কোনো সিগন্যালই মানে না যানবাহনগুলো। ফলে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।’
ভোর ৬টার দিকে ফার্মগেট মোড়েও একই দৃশ্য দেখা যায়। তীব্র গতিতে চলছে ভারী যানবাহন। নিয়ম মানছে না কেউই। মাঝে মধ্যেই মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ সময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাইট শিফটের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরতে বাসের জন্য অপেক্ষারত রিপন হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সপ্তাহে দুদিন নাইটে কাজ করে খুব ভোরে মিরপুরে বাসায় যাই। এ সময় রাস্তার মালবাহী ট্রাক আর বাস বেপরোয়া গতিতে চলে। মানুষের জীবনের কোনো মায়া নেই তাদের কাছে।’
এদিকে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের পরিবহনের একমাত্র প্রবেশদ্বার গাবতলী-মিরপুর সড়ক। সার্বক্ষণিক এ সড়কে ভারী যান চলাচল করে। গাবতলীর পাশেই টেকনিক্যাল মোড়ে গতকাল ভোর সাড়ে ৬টা দিকে দেখা যায় বিশৃঙ্খলভাবে চলছে যানবাহন। দূরপাল্লার বাস আর মালবাহী ট্রাক চলছে বেপরোয়া গতিতে। একজন ট্রাফিক পুলিশকে দেখা যায় মোটরবাইকে বিশৃঙ্খলভাবে তিন রাস্তার মাঝে এপাশ-ওপাশ করছে।
বিশৃঙ্খল সড়কে হঠাৎ বেড়ে গেছে দুর্ঘটনা। গত সোমবার এক দিনেই তিন জেলায় ট্রাকচাপায় সাতজন নিহত হয়। এর মধ্যে ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দুজন, কেরানীগঞ্জে স্কুলফেরত দুই ভাইবোন, মাদারীপুর ও রাজবাড়ীতে ট্রাকচাপায় দুজন নিহত হয়।
রবিবার রাত আড়াইটার দিকে সড়ক দুর্ঘটনায় বুলবুল নামে একজন নিহত হন। খিলক্ষেত ৩০০ ফিট রাস্তায় দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে থাকা একটি সিএনজি থেকে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও দুজন।
ঢাকা মেডিকেল সূত্রে জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের বেশিরভাগই আসে রাত ১০টার পর থেকে ভোররাত পর্যন্ত। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মো. আলাউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় আহতরা বেশিরভাগই রাতে আসে যাদের অনেকের হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যু হয়। রাত ১০টার পর থেকে সারা রাতই সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতরা আসতে থাকে।’
নিরাপদ সড়ক নিয়ে আন্দোলনকারী নিসচার সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধির জন্য দায়ী অশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা, জনগণের অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইন ও তার যথারীতি প্রয়োগ না থাকা।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক দক্ষিণের সহকারী কমিশনার (এসি নিউমার্কেট) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দুই শিফটে ডিউটি করি। রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে সীমিত আকারে ট্রাফিক পুলিশ থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘২৪ ঘণ্টা একইভাবে ডিউটি দেওয়া সম্ভব হয় না।’
