শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে গতকাল বুধবার সংসদের প্রথম অধিবেশনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে ঘিরে আবেগঘন বক্তব্য দিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রয়াত এই সাংসদকে ‘দুর্দিনের সহযোদ্ধা’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি ভাবতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি আশরাফ আমাদের ছেড়ে চলে যাবে।
গত ৩ জানুয়ারি মারা যান সৈয়দ আশরাফ। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হওয়ার পর হাল ধরেছিলেন দলের। পরে দুই দফায় দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, সে বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ আশরাফের বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর সৈয়দ আশরাফ চলে যান লন্ডনে। প্রায় দুই দশক পর দেশে ফিরে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। এর পর থেকে টানা চার বার কিশোরগঞ্জ-১ আসনে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনার অবস্থান পোক্ত হওয়ার আগে নির্বাসিত জীবনের সেই সময়েও তার সঙ্গী ছিলেন সৈয়দ আশরাফ।
এসব স্মৃতি তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ১৯৮০ সালে আমি লন্ডনে গিয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ গড়ে তোলার কাজ করি। তখন আশরাফও আমার সঙ্গে ছিল। আমাকে বড় বোনের মতো জানত। পঁচাত্তরে আমরা স্বজন হারিয়েছি, প্রত্যেকেরই খুব কষ্টের মধ্যে দিনযাপন করতে হয়েছে। সততার সঙ্গে চললে পরে কষ্ট করতে হয়।
স্মৃতিচারণে সৈয়দ আশরাফের কষ্টের সেই দিনগুলোর চিত্র ফুটে ওঠে। শেখ হাসিনা বলেন, অনেক স্মৃতি আমার মনে পড়ে। লন্ডনে এমন একটা অবস্থার মধ্যে থাকত, কখনো এমনও অবস্থা গেছে হয়তো খাবারের পয়সাও ছিল না। লন্ডনে কাজ করত আর সেই সঙ্গে রাজনীতিও করত।
আশরাফের অর্থকষ্টের কথা বোঝাতে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা, আমি যখন লন্ডনে রেহানার বাসায়, একদিন ফোন দিলে বলে আপা অনেক দিন বাড়ির রান্না খাই না। আমি বললাম চলে আসো। এতই সোজা-সরল ছিল যে বলল, আসব তো ট্রেনের ভাড়া তো নেই। আমি বললাম তুমি যে কোনোভাবে আসো আমি ব্যবস্থা করব। বড় বোনের কাছে যেভাবে আবদার করে সেভাবেই আবদার করত আমার কাছে। আমার এত বেশি কাছে ছিল যে, আপন ভাইয়ের মতো দেখতাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশরাফ অত্যন্ত সৎ, মেধাবী ছিল। রাজনৈতিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মেধাবী ছিল। সব সময়ই পড়াশুনার মধ্যে থাকত। বিশ্বের কোথায় কী হচ্ছে, তার সব খবর সে রাখত। আমিই তাকে লন্ডন থেকে এখানে নিয়ে এসে নির্বাচন করাই। প্রতিটি ক্ষেত্রে খুবই সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। জরুরি অবস্থার সময়ে দলের দুঃসময়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিল। সেই সময় সে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে। আজ যে গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি এ জন্য তার অবদান রয়েছে।
ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত সৈয়দ আশরাফের চিকিৎসায় যথাসাধ্য চেষ্টা করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মন্ত্রী হিসেবে চিকিৎসার খরচ যা দরকার তা দিতে পেরেছি। তার স্ত্রী যখন অসুস্থ ছিল তখনো খোঁজখবর রেখেছি। সব থেকে দুঃখজনক যে, স্ত্রী শীলা মারা গেল। তার কিছুদিন পরে আশরাফও মারা গেল। একটি মেয়ে লন্ডনে আছে। সে সেখানে চাকরি করে, তার প্রতি সমবেদনা জানাই। তার ভাইবোনদের প্রতিও সমবেদনা জানাই।
সৈয়দ আশরাফের ওপর আলোচনায় আরও অংশ নেন আবদুর রাজ্জাক, মোহাম্মদ নাসিম, আমির হোসেন আমু, রওশন এরশাদ, তোফায়েল আহমেদ ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
শোক প্রস্তাব
আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব আনা হয়েছে। গতকাল বুধবার শোক প্রস্তাব আনার পর সংসদে তার জীবনীর ওপর আলোচনা হয় ও তার সম্মানে সংসদের বৈঠক কিছুক্ষণ মুলতবি রাখা হয়। এরপর শুরু হয় রাষ্ট্রপতির বক্তব্য।
গতকাল এছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আবদুল বাতেন, নুরুল আলম চৌধুরী, তরিকুল ইসলাম, ড. ফজলে রাব্বী চৌধুরী, মাওলানা নুরুল ইসলাম, আশরাফুন নেছা মোশাররফ ও বোরহানউদ্দিন খান, কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেন, বরেণ্য সুরকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, উপমহাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন, নারী মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক তারামন বিবি, জাতীয় প্রতীকের নকশাকার মোহাম্মদ ইদ্রিস, প্রখ্যাত সাংবাদিক শাহরিয়ার শহীদ, ভাষাসৈনিক সৈয়দ আবদুল হান্নান, একাত্তরের বীরযোদ্ধা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার কুলদীপ সিং চাঁদপুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা সাইদুল আনাম টুটুল এবং প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেন ও সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রী মেহজাবিন চৌধুরীর মৃত্যুতেও সংসদ গভীর শোক প্রকাশ করে।
উল্লিখিত ব্যক্তিদের জীবনবৃত্তান্ত সংবলিত শোক প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেন স্পিকার। শোক প্রস্তাবের অনুলিপি সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
এছাড়াও ইন্দোনেশিয়ায় বিমান দুর্ঘটনা ও সুনামিতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় দাবানলে, আফগানিস্তানে তালেবান হামলা এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে সংসদ গভীর শোক প্রকাশ, সব বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করে।
