শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস নিরাপদ খাদ্য বনাম পরিবেশ দূষণ

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৫২ পিএম

১৯৯৬ সালের বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়, খাদ্য কোনোভাবেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না। কিন্তু তার পরও আমরা দেখতে পাই খাদ্যকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চাপ এবং নিয়ন্ত্রণ। আবার দেখা যায়, শুধু মানুষের খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করতে গিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণ-প্রজাতির খাদ্যভা-ারকে সমূলে শেষ করে দেওয়া হয়। খাদ্য হিসেবে মানুষের ভাত উৎপাদনের জন্য ধানক্ষেতে ব্যবহার করা হয় নানা ক্ষতিকর আগাছানাশক, কীটনাশক ও রাসায়নিক সার। এভাবে মৃত্যু ঘটে শৈবাল, অণুজীব থেকে শুরু করে নানা লতাগুল্ম, মাকড়সা, শামুক, কেঁচো, ব্যাঙ ও ছোট মাছের। হয়তো এভাবে মানুষের জন্য উৎপাদিত খাবার ভাতের থালা ভরে সামনে চলে আসে কিন্তু প্রকৃতির অন্যান্য সদস্য মারা যাওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়ে পাখি, গরু, ছাগল, মুরগি ও অন্য প্রাণীরা। আজকের দুনিয়ায় খাদ্য তাই কেবল ক্ষুধা নিবারণের বিষয় নয়।

আজ ভাবতে হবে এর উৎপাদন, সরবরাহ, মজুদকরণ, বিপণন, বিনিময়, বণ্টন, প্রবেশাধিকার থেকে শুরু করে এই খাদ্য কার জন্য এবং কীভাবে এই খাদ্য সবার জন্য সমানভাবে সুরক্ষিত থাকছে তা-ও। তার মানে খাদ্যের মতো এক মৌলিক অধিকার আজ বিশ্বব্যাপী সবার জন্যই এক প্রধান মৌলিক তর্ক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় ‘অধিক খাদ্য ফলানোর’ প্রচেষ্টা থাকলেও দুনিয়া আজ স্থায়িত্বশীল খাদ্য উৎপাদনের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য হচ্ছে। এখন খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবেশ, প্রতিবেশ, বৈচিত্র্য, সংস্কৃতি এবং জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার চল শুরু হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষসহ সব প্রাণসত্তার নিরাপদ খাদ্যের কথা এখন নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ গত বছর থেকে ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব জলাভূমি দিবসে ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’ পালন শুরু করেছে। আমাদের চারধারের বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ আজ নানাভাবে দূষিত ও বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় সবার জন্য নিরাপদ খাদ্যের জোগান দেওয়া সত্যিই এক দুরূহ জটিল কাজ। কিন্তু আমাদের সবার সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য এবং ভবিষ্যতের নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই নিরাপদ খাদ্যের জোগান জরুরি। নিরাপদ খাদ্যের প্রাথমিক শর্ত হলো দূষণমুক্ত পরিবেশ।

২. এ পরিস্থিতিতে আমরা কী করতে পারি? একেবারেই একজন ভোক্তা ও ক্রেতা হিসেবে প্রথমত আমরা খাদ্যটাকে নিরাপদ দেখতে চাই। নিরাপদ মানে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক রাসায়নিকমুক্ত খাদ্য। এ অবস্থায় খাদ্য উৎস ও উৎপাদনস্থলকেই প্রথমত নিরাপদ করাটা জরুরি। তারপর থাকছে খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন, বিপণন, মজুদকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশন। জমির মাটি থেকে খাবার থালা অবধি খাদ্য নিরাপদ হওয়া জরুরি। খাবার নিরাপদ কি নাÑ এ নিয়ে নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষাটাও জরুরি। আমরা যেমন খাবারে কোনো ভেজাল চাই না, আবার ফরমালিন-কার্বাইড বা ক্ষতিকর কোনো উপাদান খাবারে মিশে থাকুক তাও চাই না। আবার খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশ এবং কোন ধরনের শস্যজাত থেকে খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে তাও পরখ করেই দেখতে চাই। প্রতিদিন দেশে কমছে কৃষিজমি এবং প্রাকৃতিক পানির উৎসস্থলগুলো। আমরা কৃষিজমি ও জলাভূমিকে বাঁচাতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে অধিক খাদ্য ফলানোর নামে খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে সংহারি বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। এরপর খাদ্য বিপণনের নানা স্তরে ভেজাল দ্রব্য তো থাকছেই। ক্ষতিকর কীটনাশক, আগাছানাশক, ছত্রাকনাশক মাটির অণুজীব থেকে শুরু করে শামুক-কেঁচো-উপকারী পতঙ্গ সব মেরে ফেলছে। দূষিত করছে সামগ্রিক পরিবেশ। মানবস্বাস্থ্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। প্রতিবছর লিচু মৌসুমে বিশেষত দিনাজপুর অঞ্চলে বিষমাখা লিচু খেয়ে মারা যাচ্ছে অবোধ শিশুরা। শস্যক্ষেতে বিষ ছিটানোর পর গ্রামবাসীর হাঁস-মুরগি সেই জমিতে প্রবেশ করে মারা পড়ছে এবং এ নিয়ে গ্রামে প্রতিবেশীর সঙ্গে নানা দরবার লেগেই আছে। জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে তার অবশেষ জমা হচ্ছে জলাশয়ে। এভাবে মরছে দেশি মাছের বৈচিত্র্য। পাশাপাশি জলজ জীব ও জলচর পাখিদের জন্যও এটি খাদ্যসংকট তৈরি করছে।

৩. চাষাবাদের জন্য জমিতে সরাসরি রাসায়নিক প্রয়োগ নয়, আরও অন্যান্য ক্ষেত্রেও খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ এবং হুমকিতে পড়ছে খাদ্য। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখতে পেয়েছে, অপরিশোধিত পোলট্রি বর্জ্য সরাসরি জমিতে ও জলাধারে ব্যবহারের কারণে শাকসবজিতে ঢুকে পড়ছে রোগজীবাণু। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের গবেষকরা গাজর, করলা, বেগুন, লাউ, শসা, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, মরিচ ও ঝিঙ্গায় সালমোনেল্লা ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেছেন, যা টাইফয়েড ও ডায়রিয়া রোগের জন্য দায়ী (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো, ৭ অক্টোবর ২০১৭)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ ২০১৪ সালে পোলট্রি মুরগির মগজে ৭৯৯ পিপিএম, মাংসে ৩৪৪ পিপিএম, চামড়ায় ৫৫৭ পিপিএম, কলিজায় ৫৭০ পিপিএম এবং হাড়ে ১৯৯০ পিপিএম ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি আবিষ্কার করে (সূত্র : ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সিভিল, স্ট্রাকচারাল, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট; আগস্ট ২০১৪)। মানবদেহে এই ভারী ধাতু ক্রোমিয়ামের সহনীয় মাত্রা হলো প্রতিদিন ২৫ পিপিএম। একই সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পুষ্টি ইউনিট মাছের জন্য তৈরি খাদ্য নিয়ে একটি গবেষণা করে দেখেছে, প্রতি কেজি মাছের খাবারে ৪৯৭১.১৫ পিপিএম এবং মুরগির খাবারে ৪,২০৫.৭০ পিপিএম ক্রোমিয়াম আছে (সূত্র : দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪)।

৪. বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর দেশের নাগরিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুমোদন করে। এই আইন বাস্তবায়নের জন্য নিরাপদ খাদ্য বিধিমালা ২০১৪ তৈরি হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদ- ও ২০ লাখ টাকার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১৮ সালে অনুমোদিত হয়েছে ‘নিরাপদ খাদ্য (স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণ) প্রবিধানমালা ২০১৮’।

৫. নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সব ধরনের পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে হবে। মাঠ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সবপর্যায়ে খাদ্যকে কীটনাশকসহ সব ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক মুক্ত রাখতে হবে। দেশে নিষিদ্ধ কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার ও বিক্রি বন্ধে প্রশাসনকে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ সালের যথাযথ বাস্তবায়ন ও প্রচার করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সুনির্দিষ্টভাবে জাতীয় বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষিকে কোনোভাবেই কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত চুক্তিবদ্ধ চাষের আওতায় নেওয়া যাবে না, কৃষিতে কৃষকের পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। নারী, আদিবাসী ও ভিন্ন ভিন্ন কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলের কৃষকের লোকায়ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে নিয়মিত খাদ্যের মান পরীক্ষা করে জনগণকে জানাতে হবে। ভেজালবিরোধী অভিযানকে শুধু শহরের বিপণিবিতানে নয়, একেবারে সরাসরি মাঠপর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন নজরদারিতে আনতে হবে।

বিদ্যালয় পর্যায় থেকে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সহজ পাঠগুলো বিনিময় করতে হবে। খাদ্য উৎপাদনের নামে রাসায়নিক ব্যবহার করে জমির মাটি ও পানি দূষিত না করার জন্য সুস্পষ্ট ধারা কৃষিজমি সুরক্ষা আইনে যুক্ত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা অধিকার আন্দোলনকে আরও জনবান্ধব এবং যুববান্ধব করে সক্রিয় করতে হবে। হাইব্রিড ও জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড শস্য নয়, দেশীয় শস্যবৈচিত্র্য সুরক্ষা করেই দেশের খাদ্যবৈচিত্র্যর উন্নয়ন ঘটাতে হবে। দুর্যোগ ও জলবায়ুগত সংকট মোকাবিলায় দেশের অঞ্চল ও শস্যফসলের জাতের বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়ে খাদ্যের বহুমাত্রিক আঞ্চলিক ব্যবহার বাড়াতে হবে। এককভাবে মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে অন্যান্য প্রাণ ও প্রজাতির খাদ্য ও পরিবেশকে বিনষ্ট করা যাবে না। গবাদি প্রাণিসম্পদের খাদ্যকেও ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ করতে হবে।

৬. দানাজাতীয় খাদ্য থেকে শুরু করে প্রাণিজ আমিষ বা শাকসবজি কী ফলমূল কোনো খাবারই আজ নিরাপদ নয়। স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিমুক্ত নয়। তাহলে এখন খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের তো একেবারে প্রাথমিক শর্তটা পূরণ করা দরকার। নিরাপদ, ঝুঁকিমুক্ত ও ভেজালমুক্ত খাদ্য উৎপাদন, ব্যবহার, বণ্টন ও গ্রহণ। আমরা তাই এ বছরের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবসে আবার স্পষ্ট করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের কথা বলছি। দূষিত পরিবেশে কোনোভাবেই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব নয়, তাই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য আমরা প্রথমেই পরিবেশ দূষণের সব ক্ষেত্র বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি। নিরাপদ স্বাস্থ্যকর বৈচিত্র্যময় খাদ্য উৎপাদনে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি। খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণ করে না, এটি শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটায়। খাদ্যের রয়েছে ভৌগোলিক, প্রতিবেশগত এবং সাংস্কৃতিক নানা ব্যঞ্জনা। খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের এসব বৈচিত্র্য ও ব্যঞ্জনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। খাদ্যের সঙ্গে জড়িত সব প্রাণ ও প্রজাতির আন্তঃনির্ভরশীল সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে। সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য একটি গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার পূর্বশর্ত। এই শর্ত পূরণে রাষ্ট্র, জনগণ, গণমাধ্যমসহ সবাই একযোগে কাজ করতে হবে। নিরাপদ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই, কোনো ধরনের জোড়াতালি দিয়েও এর কোনো চমক তৈরি করা যায় না। বিশেষত চারপাশের পরিবেশ দূষণের ভেতর কোনোভাবেই সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সম্ভব নয়। নিরাপদ খাদ্য সমাজের সবার প্রতি সবার শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ককে জাগ্রত করে এবং বিকশিত করে। আসুন আমরা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সবাই নিজেদের দায়িত্বশীলতাকে আরও প্রসারিত করি।

পাভেল পার্থ

লেখক

গবেষক ও লেখক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত