মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নদী সুরক্ষায় শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ চাই

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:০৪ পিএম

হিমালয়ের পাদদেশে বৃহৎ তিন নদী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার মিলিত অববাহিকায় অবস্থিত বাংলাদেশ।  ৪৫০টিরও বেশি নদ-নদী, অগণিত খাল-বিল, হাওর-বাওড়, জলাভূমি নিয়ে নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। বদ্বীপ-অববাহিকার এই বিশেষ ভূগোলেই আবহমান কাল ধরে গড়ে উঠেছে আমাদের দেশ, দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতি। শিল্প ও নগরসভ্যতার আধুনিক এই কালে এসে আমরা নানাভাবে প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতার সম্পর্কে জড়িয়ে গেলেও আমাদের

সংস্কৃতির ভিত্তিমূল রয়েছে নদীমাতৃক ভূগোলেই। প্রবলভাবে শিল্পায়িত বর্তমান সভ্যতায় বর্তমান ও ভবিষ্যতের ‘ভৌগোলিক রাজনীতি’ ও ‘পরিবেশ-রাজনীতি’কে মাথায় রাখলে আমরা বাংলাদেশের এই বিশেষ ভূগোলের তাৎপর্য বুঝতে পারব। দেশের ধমনিশিরায় রক্তপ্রবাহের মতো এই বিশেষ ভূগোলের কেন্দ্রে রয়েছে আমাদের নদ-নদীগুলো।

দেশের নদ-নদীগুলোকে অবৈধ দখল ও দূষণমুক্ত করার বিষয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন তাই এখন খুবই জরুরি।  বিভিন্ন সময়ে নদীতীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদীদূষণকারী কলকারখানা বন্ধে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তার কঠোর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।  উচ্ছেদের পর পুনর্দখল যেমন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে, তেমনি নজরদারির অভাব এবং নানা আইনি ফাঁকফোকর গলে নদী-জলাশয়ের পরিবেশ-প্রতিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডও সারা দেশে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। তবে, ঢাকায় বুড়িগঙ্গাতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে চলমান অভিযান এবং চট্টগ্রামে কর্ণফুলীর মোহনায় উচ্ছেদ অভিযান শুরুর খবরে নদীরক্ষা নিয়ে ইতিবাচক উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর তুরাগ নদ নিয়ে উচ্চ আদালতের চলমান রায়ে এই নদকে ‘আইনি সত্তা’ বা ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা। পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর হয়তো এর সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বোঝা যাবে।

একটি একক শক্তিশালী কর্র্তৃপক্ষের অভাব এবং সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা না থাকা দেশের নদনদী রক্ষায় অন্যতম প্রধান অন্তরায়। ১৯৫৮ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ-‘বিআইডব্লিউটিএ’ মূলত নৌপরিবহনের কাজ নির্বিঘ্নে রাখতে নৌপথ নাব্য রাখা ও নৌবন্দর পরিচালনার কাজ করে থাকে। এ জন্য নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণের এখতিয়ারও বিআইডব্লিউটিএর।  এদিকে, সম্প্রতি ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১৩’ অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’।  কিন্তু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন এই কমিশন মূলত নদীরক্ষায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে সমন্বয় এবং সরকারকে নদীরক্ষার বিষয়ে নানা সুপারিশ করার মতো একটি পরামর্শক সংস্থা হয়ে রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

এদিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশের উচ্চ আদালতে নদীর সীমানা নিয়ে বিরোধ, নদীদূষণ, নদী দখল, নদী ভরাটসহ নানা বিষয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মামলা ঝুলে আছে। সাম্প্রতিক এক রায়ের পর্যবেক্ষণে উচ্চ আদালতের এক বিচারক বলেছেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এসব বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখলে এই বিপুল সংখ্যক মামলা হয়তো আদালতেই আসত না। অন্যদিকে, নানা সময়ে দেশের আদালতগুলোতে নদীর সুরক্ষা নিয়ে অনেক যুগান্তকারী রায় ঘোষণা সত্ত্বেও সেসবের বাস্তবায়ন ঝুলে গেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়।  ফলাফল হিসেবে নদী-জলাশয় দখল-দূষণের মচ্ছব অব্যাহত রয়েছে দেশজুড়ে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, সম্প্রতি সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করা বন্যা, নদীভাঙন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যানিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে বহু আলোচিত ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’-এর কথা।  বিচ্ছিন্নভাবে নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান কিংবা নানা স্থানীয় উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নদী-জলাশয়ের দখল-দূষণ বন্ধ করাটা বাস্তবে খুবই কঠিন।  ফলে এই বদ্বীপ পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় রেখে একটি একক শক্তিশালী কর্র্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে দেশের নদ-নদী-জলাশয় সুরক্ষায় সুপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনা ও তার কঠোর বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত