শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রধানমন্ত্রীর গোপন পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রীর হাতে

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:৩২ এএম

নতুন মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরে পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ সরকার। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসা-বিনিয়োগ সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন, ব্যাংকঋণ পাওয়া সহজ করে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দেউলিয়া আইন প্রয়োগ ও কর কর্মকর্তাদের ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ কমানোর ওপর জোর দেবে সরকার। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়নে বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা কমানো হবে। জিডিপির অনুপাতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ দ্বিগুণ করার লক্ষ্যও নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া তরুণদের উদ্যোগী করে তুলতে বিনা জামানতে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে। গড় আয়ু বাড়ায় ভবিষ্যতে বৃদ্ধ পুরুষদের জন্যও নানা কর্মসূচি নিয়ে কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে হাঁটবে বাংলাদেশ।

একই সঙ্গে ভারত, নেপাল, ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেবে সরকার। আলোচিত তিস্তা চুক্তি সই করা, গঙ্গা ব্যারাজ, যৌথ নদী ব্যবস্থাপনায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করবে। উপ-আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে খুলনা থেকে কলকাতা পর্যন্ত বুলেট ট্রেন চালু, বাগেরহাটে খানজাহান আলী বিমানবন্দর স্থাপন ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে ভারত, নেপাল ও ভুটানকে ব্যবহার করতে দেওয়া নিয়ে দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা জোরদার করবে সরকার। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় নৌ-যোগাযোগ স্থাপন হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমাতে সিঙ্গাপুরের বদলে ভারতের বন্দর ব্যবহারের বিষয়টিও বর্তমান সরকার গুরুত্ব দেবে।    

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে পুনঃনিয়োগ পাওয়া ড. মসিউর রহমান ‘সামষ্টিক অর্থনীতির কৌশল এবং কতিপয় কাঠামোগত/খাতওয়ারি বিষয়’ শিরোনামে ২০ পৃষ্ঠার এক গোপন প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে। রাজস্ব খাতে সংস্কার, ব্যাংক খাতের অনিয়ম বন্ধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক বৈষম্য রোধ, পুঁজিবাজারের বিকাশ, উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ দেশের টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয়ের সমস্যা, সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে তৈরি বিস্তারিত এ প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবহিত বলে উল্লেখ করেছেন মসিউর।

গতকাল শনিবার এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মসিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী কোনো পরামর্শ চাইলে তা আমাকে দিতে হয়। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও আমার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, কথাবার্তা হয়। আমাদের মূল লক্ষ্যই হলো টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়ে গত ২২ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে মসিউর রহমান সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, ‘যদিও সমাধান কী হবে, কবে হবে তা স্পষ্ট নয়।’ এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০১০ সালে যৌথ ইশতেহারে এবং ২০১১ সালে সহযোগিতায় সমঝোতা স্মারকে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য খাতে উন্নয়নের লক্ষ্যে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। তার আলোকে পরিবহন, ট্রানজিট ও রেল চলাচল খাতে অগ্রগতি হলেও যৌথ নদী ব্যবস্থাপনায় হয়নি। ‘গঙ্গা বাঁধ (ব্যারাজ) সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে অতি ধীরগতিতে আলোচনা চলছে। যৌথ নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গে জলবিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব; এ খাতেও সম্ভাবনার তুলনায় অর্জন অতিসামান্য। ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আলাদা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে; ভারত নীতিগতভাবে সম্মত, কিন্তু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেনি’Ñ যোগ করেছেন মসিউর।  

খুলনা থেকে বেনাপোল হয়ে কলকাতা পর্যন্ত বুলেট ট্রেন চালু করতে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব দিয়ে মসিউর রহমান বলেছেন, মোংলা বন্দর কার্যকর করতে বাগেরহাটে খানজাহান আলী বিমানবন্দর স্থাপন করতে হবে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরের আঞ্চলিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে ২০১৯ সালেই প্রাথমিক আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে থাকা রেল যোগাযোগ ভুটান ও নেপাল পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে ত্রিপক্ষীয় পর্যালোচনা শুরু করতে বলেছেন তিনি। সমুদ্রপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন সিঙ্গাপুর নৌবন্দর ব্যবহার করছে। সিঙ্গাপুরের বদলে ভারতের বন্দর ব্যবহার করলে পরিবহন খরচ কমবে উল্লেখ করে এ বিষয়ে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন মসিউর রহমান।

২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হবে আশা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০১৭-১৮ সালে জাতীয় আয় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ (প্রায় ৮ শতাংশ)। ২০২৫ সালের ভেতর প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের জন্য বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে অব্যাহত রাখতে হবে।’

উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধির জন্য এডিপি বরাদ্দ জিডিপির অনুপাতে এখনকার চেয়ে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করেছেন মসিউর। বলেছেন, গত কয়েক বছর জাতীয় আয়ের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ থাকছে। এটিকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। উন্নয়নের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘অতিমাত্রায় বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি সাসটেইনেবল (টেকসই) নয়।’

প্রতিবেদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ড. মসিউর। বিনিয়োগ বাড়াতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান বেজা, বিডা, বেপজা ও পিপিপি কার্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল। এসব কাউন্সিলের সঙ্গে নির্বাহী প্রধানদের দূরত্ব কমানোর ওপর জোর দিয়ে মসিউর ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে আগামী বাজেট ঘোষণার আগেই প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন।

নতুন ভ্যাট (মূসক) আইন প্রয়োগের আগে যেন ভোক্তার ওপর বারবার কর আরোপ না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার প্রস্তাব করে মসিউর রহমান বলেছেন, ‘মূসকের একটি উল্লেখযোগ্য দিক পৌনঃপুনিকতা বা ক্যাসক্যাডিং পরিহার। পৌনঃপুনিকতা থাকলে মোট করের আপাতন বেশি হয়ে যায়। ভোক্তা অযথা বেশি দাম দেয়।’

কর কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করে মসিউর রহমান বলেছেন, ‘কর কর্মকর্তা বিভাগীয় হিসাবের ওপর নির্ভর করে; অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারভিত্তিক কর চাপায় এবং করদাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়, যা স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করে।’ এ পরিস্থিতিতে কর কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধের সঙ্গে ক্ষমতা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা।

ব্যাংক জালিয়াতদের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো দরকার। ব্যাংকে যেসব অপরাধ ঘটেছেÑ ভুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে দোষীরা আইনের আওতায় শাস্তি পাবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত-সাপেক্ষে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দেউলিয়া আইন প্রয়োগ করার সুপারিশও করেছেন তিনি।

শেয়ারবাজার নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে ধারণার অভাবে ছোট বিনিয়োগকারীরা লোকসান দেয়, হতাশায় ভোগে। পুঁজিবাজার সম্পর্কে কোনো দ্রুত বা আকস্মিক পদক্ষেপ না নিয়ে পর্যায়ক্রমে ত্রুটি দূর করে, নতুন ও বিচিত্র শেয়ার আনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। প্রতিবেদনে সেবা খাতের বড় একটি অংশ “কর্মসংস্থানের শেষ ভরসা’’ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ অংশের সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মসিউর।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী গ্রামকে শহরে পরিণত করতে পরীক্ষামূলকভাবে অল্প কয়েকটি পুরনো জেলায় নগর উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদ নিয়োগের প্রস্তাব করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্র থেকে আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠান এবং চট্টগ্রাম ও খুলনার নগর উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কারিগরি সহায়তা দিতে পারে। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে এসব উদ্যোগ আন্তরিকতার সঙ্গে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু কথার কথা বললে হবে না। সংস্কার ও পরিকল্পনা কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত