গত মঙ্গলবার রাত ১২টা। কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা পয়েন্টে দুই যুবক অপেক্ষমাণ। এসময় এক যুবক সেখানে আসেন। এ প্রতিবেদকের সামনেই তারা ইয়াবার মূল্য নিয়ে দরকষাকষি করেন। পরে ওই যুবক ১৫০ টাকা দরে ৪টি ইয়াবা বড়ি নিয়ে চলে যান। ঠিক ১৫ মিনিট পর একই স্থানে আরও কয়েকজনকে ইয়াবা বিক্রি করতে দেখা যায়। তারা বলেন, ‘যখন চাইবেন, তখনই বড়ি পেয়ে যাবেন। প্রয়োজনে হোটেলেও পৌঁছে দেওয়া হবে।’ মিয়ানমার বাজার ধরে রাখতে কৌশলে ইয়াবার রং বদল করেছে। লাল রঙের পাশাপাশি এখন মিলছে সাদা, কালো ও হলুদ রঙের ইয়াবাও। তবে এগুলোর দাম একটু বেশি। কক্সবাজার ও টেকনাফে এখন হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা। এমনকি এ ব্যবসা এখন সামাজিকভাবেও ছড়িয়ে পড়ছে। কয়েকটি পরিবার এই কারবারকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। গত তিন মাসে শুধু কক্সবাজার ও টেকনাফে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ১০ লাখ পিস ইয়াবা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চোরাকারবারিদের আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নেওয়ার পরও মিয়ানমার সীমান্তে ইয়াবা পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। নতুন নতুন ইয়াবা কারবারি গজিয়ে উঠছে। তালিকাভুক্ত কারবারিদের সাঙ্গপাঙ্গরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্সদের সঙ্গে আঁতাত করে নিয়ে আসছে ইয়াবার চালান। এর একটি অংশ চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ৩৮টি পয়েন্ট দিয়ে এসব ইয়াবা আসছে।
এ প্রসঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) টেকনাফ ২নং ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আছাদুজ্জামান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইয়াবাসহ সব মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো হচ্ছে। আগের চেয়ে আরও কঠোর অভিযান চলছে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে কয়েকগুণ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারকারীদের সহায়তা করার অভিযোগের সত্যতা পেলে তাকে সাধারণের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শাস্তি পেতে হবে।’ সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, ইয়াবা পাচার ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, র্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। আগের চেয়ে ইয়াবা পাচার কমে এসেছে। এর সঙ্গে কোনো সদস্য বা সোর্স জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আত্মসমর্পণের উদ্যোগটি ভালো। ইয়াবা পৃষ্ঠপোষকরা আত্মসমর্পণ করলে এর প্রভাব সহযোগীদের ওপর পড়বে। তখন ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসা কমে আসবে বলে আশা করি।’সংশ্লিষ্টরা জানায়, গত বছরের ৩ মে র্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশ দেন। এরপর গত ১৬ মে থেকে পুলিশ ও র্যাব সারা দেশে বিশেষ অভিযানে নামে। এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাদকের পৃষ্ঠপোষক ও কারবারিদের তালিকা চূড়ান্ত করে। ওই তালিকায় কক্সবাজার ও টেকনাফেই বেশি মাদক কারবারির সংখ্যা। এ ছাড়া বিশেষ অভিযানেও এ দুই অঞ্চলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। একের পর এক অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক কারবারি নিহত হলে কয়েক দিন ইয়াবা পাচার কিছুটা কমে আসে। কিন্তু গত তিন মাস ধরে কক্সবাজার ও টেকনাফে পাচারের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে গেছে।
সম্প্রতি কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফসহ কয়েকটি স্থানে সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকাশ্যে ইয়াবা কেনাবেচা হচ্ছে। এ কাজে ক্ষুদ্র কারবারিরাই বেশি সক্রিয়। কয়েকজন ক্ষুদ্র ইয়াবা কারবারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই কারবারের সঙ্গে পুলিশ সোর্সরা বেশি জড়িত। আমরা টেকনাফ ও উখিয়া থেকে ইয়াবাগুলো নিয়ে আসি। এরপর কক্সবাজার শহরে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা হয়। আর বড় চালানগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’ তারা আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহযোগিতা করে বলেই মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান বাংলাদেশে আসছে। এমনকি এই ব্যবসা এখন সামাজিক রূপ নিয়েছে। অনেকে এটিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, একদিকে অভিযান অন্যদিকে মাদক পৃষ্ঠপোষকদের আত্মসমর্পণের সুযোগে নির্দিষ্ট পয়েন্ট দিয়ে আসছে ইয়াবার চালান। ওইসব পয়েন্টে বিজিবি, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের নজরদারি থাকলেও তা চলছে। বিশেষ করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, নাফ নদের খুরের মুখ, ঘোলারপাড়া, দক্ষিণপাড়া, মাঝেরপাড়া সৈকত, সাবরাং কচুবনিয়া, হারিয়াখালী, কাটাবনিয়া, খুরের মুখ, আলীরডেইল, মুণ্ডারডেইল, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেষখালীয়া পাড়া সৈকত, নোয়াখালী পাড়া, কুনকার পাড়া, বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর, শীলখালী, মাথাভাঙ্গা, বড়ডেইল, উখিয়ার ইনানী, হিমছড়ি, দরিয়ানগর পয়েন্ট দিয়ে আসছে ইয়াবার চালান। এ ছাড়া নাফ নদে ইয়াবা খালাসের পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া, জেটিঘাট, জালিয়াপাড়া, নোয়াপাড়া, সাবরাং; টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া, কায়ুকখালী পাড়া ঘাট, নাইট্যং পাড়া ঘাট, বরইতলী, কেরুনতলী, হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা, জাদিমুড়া, আলীখালী, দমদমিয়া, চৌধুরীপাড়া, হ্নীলা, মৌলভীবাজার; হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাংখালী, কাঞ্জরপাড়া, লম্বাবিল, উনচিপ্রাং; উখিয়ার থাইংখালী, পালংখালী, বালুখালী, ঘুমধুম, রেজুপাড়া, তমব্রু, আছাড়তলী ও ঢালারমুখ।
পুলিশের সোর্স টেকনাফের নাজিরপাড়া এলাকার কবির হোসেন (ছদ্মনাম) জানান, মূলত ওইসব পয়েন্টে মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ করে কারবারিরা ইয়াবার চালান নিয়ে আসছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করছি। থানা থেকে যে অর্থ দেয় তা দিয়ে সংসার চলে না। এ কারণে এলাকার কিছু মাদক কারবারির সঙ্গে ইয়াবা কেনাবেচা করি। ইয়াবা পাচারের সঙ্গে কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পুলিশ সোর্স জড়িত। তার মধ্যে সাবরাংয়ের করিম উদ্দিন, আলী হোসেন; টেকনাফ সদরের রহিম, নূর আলম; কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলীর সালাউদ্দিন, পারভেজ ও আবুল কালামসহ অনেকে জড়িত। এলাকায় নতুন নতুন ইয়াবা কারবারি গজিয়ে উঠছে।’
কবির হোসেন আরও জানান, ‘বাংলাদেশে মাদকবিরোধী কঠোর অভিযান চলায় মিয়ানমার বেশ সতর্ক হয়ে গেছে। তারা এখন কৌশল পাল্টিয়েছে। লাল রঙের ইয়াবার পরিবর্তে তারা সাদা, কালো ও হলুদ রঙের ইয়াবা তৈরি করছে। মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে ৪৫টি কারখানায় এসব ইয়াবা তৈরি হচ্ছে। এমনকি ওই কারখানাগুলোতে বাংলাদেশের অনেকেও কাজ করছে। ’টেকনাফ মৌলভীপাড়া এলাকার ফয়েজ আহমদ জানিয়েছেন, একসময় টেকনাফে নাফ নদের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ছোট ছোট নৌকায় রাতের আঁধারে অনুপ্রবেশ করত রোহিঙ্গারা। তখন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা তাদের হাতে-ব্যাগে করে ব্যবহার্য জিনিসপত্রের সঙ্গে নিয়ে আসত ইয়াবা। ওই সময়ে ইয়াবার এত বেশি পরিচিতি বা প্রসার না ঘটায় এবং সীমান্তরক্ষীদের ম্যানেজ করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে এপারে নিয়ে আসাতেই পাচারকারিরা তল্লাশির আওতামুক্ত থাকত। ফলে তাদের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ইয়াবা বিনা বাধায় বাংলাদেশে ঢুকে পড়ত। পরে সেগুলো দেশের পাইকারি ও খুচরা কারবারিদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
র্যাব-৭ কক্সবাজার কার্যালয়ের কোম্পানি অধিনায়ক মেজর মেহেদী হাসান জানান, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ইয়াবা চালান আটক হয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারি শহরের বিসিক এলাকা ও বিমানবন্দর এলাকা থেকে ৪৯ হাজার ৭৮০ পিস ইয়াবাসহ ৩ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়। পরে ২৫ জানুয়ারি টেকনাফের জালিয়াপাড়া এলাকা থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকা মূল্যের ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি।
