জন্ম থেকেই নেই দুটি হাত, এমনকি নেই একটি পা। তবুও থেমে থাকেনি যশোরের অদম্য কিশোরী তামান্না নূর। একটিমাত্র পা সঙ্গী করেই স্বপ্ন জয়ের চেষ্টা তার। একমাত্র অবলম্বন ওই পা দিয়ে লিখেই গতকাল শনিবার থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিয়েছে এই শারীরিক প্রতিবন্ধী কিশোরী। এর আগে পা দিয়ে লিখেই প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছিল সে।
আগের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তামান্না এবারও ভালো ফলাফল করবে বলে আশা করছে তার পিতা-মাতা, শিক্ষক ও সহপাঠীরা। সে ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের আলিপুর গ্রামের রওশন আলী ও খাদিজা পারভীন শিল্পীর মেয়ে। বাঁকড়া ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রের একটি কক্ষে ছোট্ট চৌকির ওপর বসে এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে অংশ নেয় তামান্না। এদিন সকালে কেন্দ্রে এসে আসন খুঁজে পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় তামান্না ও তার বাবাকে। বাবা রওশন আলী অন্যের সহায়তায় হুইল চেয়ারে বসিয়ে তামান্নাকে নিয়ে প্রথমে তিন তলায় যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে খুঁজে পাননি তামান্নার আসনটি। পরে তাকে আবার দ্বিতীয় তলায় আনা হলে ২০৯ নম্বর কক্ষে বসতে দেওয়া হয়। কিন্তু আগে থেকে জানানো সত্ত্বেও তার বসার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা করেননি কেন্দ্রটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। পরে ছোট্ট একটি চৌকি নিয়ে এসে তামান্নার বসার ব্যবস্থা করা হয়।
রওশন আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কেন্দ্র সচিবের কাছে আগেই অনুরোধ করেছিলাম বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের যেন নিচতলায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু সেটা হয়নি। এখন হুইল চেয়ারে করে মেয়েকে নিয়ে দোতলায় উঠতে ও নামতে অনেক সমস্যা হবে পরীক্ষার এই ক’দিন।’
জানতে চাইলে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাধব চন্দ্র রুদ্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি জানা ছিল না। অবশ্যই তাকে সহায়তা করা হবে।’
২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর যশোরের ফাতেমা হাসপাতালে জন্ম হয় রওশন-শিল্পী দম্পতির প্রথম সন্তান তামান্নার। দুটি হাত ও একটি পা না থাকলেও ঘরে আসা প্রথম সন্তানকে নিয়ে হতাশ না হয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন মা-বাবা। তাকে পা দিয়ে লিখতে শেখান মা। পাঁচ বছর বয়সে ভর্তি করে দেওয়া হয় বাড়ির পাশে ‘আজমাইন এডাস’ স্কুলে। একটিমাত্র পা দিয়েই শুরু হয় তামান্নার সংগ্রাম। পা দিয়ে লেখা, বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানো, আঙুলের ফাঁকে চিরুনি ধরা, চামচ দিয়ে খাওয়া ও চুল আঁচড়ানোসহ প্রাত্যহিক অনেক কাজ সহজেই আয়ত্ত করে তামান্না। এমনকি ধীরে ধীরে নিজের হুইল চেয়ারটিও এক পা দিয়ে চালানোর দক্ষতা অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় সে। কেজি থেকে পঞ্চম শ্রেণির ফলাফলে মেধা তালিকায় থাকার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের নিজস্ব বৃত্তি পরীক্ষায়ও প্রতিবার বৃত্তি পেয়েছে সে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে প্রাথমিক সমাপনী এবং ২০১৬ সালে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছিল তামান্না।
