বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দাবিনামা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪০ পিএম

ভাষা আন্দোলনের মাস, শোকের মাস ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষা বা বই নিয়ে কোনো কথা না লিখে লিখছি সেভ দ্য রোড নিয়ে। কারণ একটাই আমরা নিরাপদ চার পথ চাই। আমরা কোনোভাবেই পথে অপমৃত্যু-ধর্ষণের পক্ষে না; আহতও হওয়ার পক্ষে না। আমাদের সচেতনতার অভাব আর মন্ত্রী-আমলাদের নীতির অভাবের কারণে, যখন-তখন নিরাপত্তাহীন পথে অনিশ্চিত মৃত্যুপথ কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ, আহত হচ্ছেন অগণিত মানুষ। আপনারা জানেন, সারা দেশে সেভ দ্য রোড চারটি পথকে নিরাপদ করার জন্য নিবেদিত থেকে কাজ করে যাচ্ছে। যুক্ত রয়েছেন নবীন ও প্রবীণ শত-সহস্র সমাজকর্মী; যারা রাজনীতি বা ধর্ম-মতের ঊর্ধ্বে থেকে ক্রমেই সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য নিরাপদ পথের প্রয়োজনে নিবেদিত কাজ করে যাচ্ছেন। তবু বারবার সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা হারাচ্ছি ছাত্র-যুব-জনতা-আবালবৃদ্ধবনিতাকে।

আমরা প্রায় প্রতিদিনই আমাদের স্বজন-প্রিয়জনকে হারাচ্ছি। হারাচ্ছি এবং হারিয়েছি ছাত্র রাজীব, হাসান, সাবিনা, ইতি, তিন্নি, নূরজাহানের মতো অসংখ্য প্রিয়জনকে। সেভ দ্য রোডের এই প্রতিবেদন লেখার পূর্ব মুহূর্তের সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে ট্রাকচাপায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে দুই ভাইবোন। এর আগে আলোচিত ঘটনার একটি ছিল ট্রাক উল্টে ১৩ জন নিহত। শ্রমিক শ্রেণির এই ১৩ জন নিহত মানুষের মতো অবিরত মৃত্যু-মিছিলে যুক্ত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। গত ১০ বছর সেভ দ্য রোড সম্পূর্ণ অলাভজনক, স্বেচ্ছাসেবী, গবেষণা ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

আপনারা জানেন, নায়ক হিসেবে একসময় আলোচনায় ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বাহন দুর্ঘটনায় তার স্ত্রীকে হারানোর পর একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামে। সর্বশেষ তিনি বলেছেন, ‘২০১৮ সালে সড়কে ঝরেছে সাড়ে চার হাজার প্রাণ এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৮২৫ জন।’ কিন্তু তার দেওয়া তথ্য পূর্ণাঙ্গ নয়। দৈনিক প্রথম আলো, যুগান্তর, ইত্তেফাক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা নিউজ, বিডিনিউজসহ দেশের অধিকাংশ জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ২০১৮ সালের তথ্যানুযায়ী ৫ হাজার ১১ জন। এ তথ্য অবশ্য সেভ দ্য রোডের গবেষণা সেল থেকে তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেভ দ্য রোডের তথ্যানুযায়ী আহত হয়েছে ১০ হাজার ৭৫৫ জন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বলতে চাই, সেভ দ্য রোডের সাত দফা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সেভ দ্য রোডের সাত দফায় বলা হয়েছেÑ ১. মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহতদের স্মরণে ১১ জুলাইকে ‘নিরাপদ পথ দিবস’ ঘোষণা করতে হবে। ২. ফুটপাত দখলমুক্ত করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধা দিতে হবে। ৩. সড়কপথে ধর্ষণ-হয়রানি রোধে ফিটনেসবিহীন বাহন নিষিদ্ধ এবং কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া চালক-সহযোগী নিয়োগ ও হেলপার দ্বারা পরিবহন চালানো বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৪. স্থল-নৌ-রেল ও আকাশপথ দুর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ ও আহতদের ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ সরকারিভাবে দিতে হবে। ৫. ‘ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স রুল’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সত্যিকারের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ‘ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৬. পথ দুর্ঘটনার তদন্ত ও সাজা ত্বরান্বিতকরণের মধ্য দিয়ে সতর্কতা তৈরি করতে হবে এবং ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশ, নৌপুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা-সহমর্মিতা-সচেতনতার পাশাপাশি সব পথের চালক-শ্রমিক ও যাত্রীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সব পরিবহনের চালকের লাইসেন্স করতে হবে। ৭. ইউলুপ বৃদ্ধি, পথ-সেতুসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যাতে ভাঙা পথ, ভাঙা সেতু আর ভাঙা কালভার্টের কারণে নতুন কোনো প্রাণ দিতে না হয়।

‘সেভ দ্য রোডের অঙ্গীকার পথ দুর্ঘটনা থাকবে না আর।’ সেøাগানকে লালন করে বলতে চাইÑ এই দেশকে নিরাপদ, পথকে নিরাপদ করতে কেবল জনসচেতনতা আর প্রশাসনিক আন্তরিকতা-সততা প্রয়োজন। তা তৈরি হলেই আমরা চার পথ নিরাপদ পাব। সেভ দ্য রোডের তথ্যানুযায়ী রেলপথে ২১০টি দুর্ঘটনায় ২২৪ নিহত হন এবং ৪৪৮ জন আহত হন। অন্যদিকে নৌপথে ৮৭টি দুর্ঘটনায় ৯৬ জন নিহত এবং ৩৩৪ জন আহত হন; আকাশপথে পাঁচটি দুর্ঘটনায় ৫৫ জন নিহত এবং ৩২ জন আহত হন। সড়ক, রেল, নৌ এবং আকাশপথে সম্মিলিতভাবে ৫ হাজার ২৬টি দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ১১ জন নিহত এবং ১০ হাজার ৭৫৫ জন আহত হয়েছেন। গবেষণা মতে, নিয়ম ভেঙে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তাঘাটের নির্মাণত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, লেভেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ থেকে যানবাহন উঠে আসা, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা দখলে থাকা, ওভারলোড এবং ছোট যানবাহন বৃদ্ধি; সর্বোপরি পথে পথে প্রশাসনের সীমাহীন দুর্নীতি-দুর্ভোগ গড়ে তোলার চেষ্টাও রয়েছে। এমতাবস্থায় সবার সচেতনতা, অংশগ্রহণ, নিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটির সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের প্রতি তাদের দৃষ্টি পড়–ক, চার পথ নিরাপদ হোক, সবাই নিরাপদ হোক, দেশ নিরাপদ হোক।

শান্তা ফারজানা

লেখক : মহাসচিব, সেভ দ্য রোড

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত