সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বুড়িগঙ্গায় ৪৪৪ স্থাপনা উচ্ছেদ

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৪২ এএম

ঢাকার বুড়িগঙ্গার দুই তীর ঘেঁষে গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কঠোর অভিযানে নেমেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এ উচ্ছেদ অভিযানে পার পাচ্ছে না সাংসদের গুদাম, সরকারি ভবন ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা। ১১ দিনব্যাপী উচ্ছেদের প্রথম তিন দিনেই (গত মঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত) দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তৈলঘাট থেকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার খোলামুড়া পর্যন্ত সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে বহুতল ভবনও রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযানে ঢাকা-৭ আসনের সাংসদ হাজী সেলিমের মদিনা গ্রুপের সিমেন্টের গুদামও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় ছোট-বড় ৪৪৪টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হবে আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার দুই তীরে পর্যায়ক্রমে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে এ অভিযান চলবে।

উচ্ছেদ অভিযানে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। বিআইডব্লিউটিএ স্থাপিত সীমানা পিলারের বাইরের স্থাপনার মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই। তবে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন আবাসিক ভবনের ভাড়াটিয়ারা। এক দিনের ঘোষণায় উচ্ছেদের ফলে দিশেহারা তারা। অনেকেই ভাঙা ভবনের ভেতরে ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছে।

বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমোডর মোজাম্মেল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উচ্ছেদকৃত জায়গায় ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ পার্ক নির্মাণ করা হবে। অবৈধ স্থাপনা রাজনৈতিক বা সরকারিÑ এটি বিবেচ্য বিষয় নয়। নদী বাঁচাতে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত নদীর দুই তীরে ৬০৯টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবই ভাঙা হবে। এসব স্থাপনার মধ্যে ৫৬টি বহুতল ভবনও রয়েছে।’

গতকাল রবিবার উচ্ছেদকৃত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গার দুই তীরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়েছে। স্থানীয় অনেকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও নদী দখলমুক্ত করায় বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে।

গতকাল কেরানীগঞ্জের খোলামুড়া খেয়াঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গার তীরের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে কামরাঙ্গীরচর খোলামুড়া খেয়াঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বহুতল দুটি ভবনের আংশিক ভাঙা হয়েছে। এর সামনের চার থেকে পাঁচটি ভবন সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ অংশেই উচ্ছেদ বেশি হয়েছে। এখানে সাততলা একটি ভবনের প্রথম দুই তলার এক পাশে অনেকটাই ভেঙে ফেলা হয়েছে। তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, ওই ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে বেশ কয়েকটি পরিবার। নদীর দিকের ভাঙা দেয়াল কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছেন ভাড়াটিয়ারা।

ভবনের তৃতীয় তলার ভাড়াটিয়া মায়া হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভবন ভাঙার বিষয়ে আমরা কিছুই জানতাম না। গত মঙ্গলবার সকালে পুলিশ এসে আমাদের বাসা থেকে বের করে দেয়। এরপরই ভবনটি ভাঙা শুরু করে। আমরা মালামালও সরানোর সময় পাইনি।’

এ বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়ির যে অংশটি নদীর জায়গাতে পড়েছে, সে অংশ দু-একদিনের মধ্যেই অপসারণ করা হবে। ভাড়াটিয়াদের সরে যেতে বলা হয়েছে।’

এ ভবনের পাশেই সাততলা রওশন এশাক টাওয়ারের কিছু অংশ ভাঙা দেখা গেছে। এ বাড়ির ভাড়াটিয়ারা ইতোমধ্যে বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বাড়ির মালিক রওশন আরা বলেন, ‘বাড়ির জমিটি বছর তিনেক আগে ক্রয় করা। গত বছর মার্চে ভবনের কাজ শেষ হয়েছে। এ ভবনটি নদীর জায়গাতে পড়েনি। ভুল করে ভেঙে ফেলেছে।’

খোলামুড়া খেয়াঘাটের মিষ্টির দোকান, বেকারির দোকানসহ বেশ কয়েকটি দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে ভাতের হোটেল মালিক শান্তা বেগম বলেন, ‘সোমবার নদীতে মাইকিং করায় অনেকেই শোনেনি। তা ছাড়া বাড়ির মালিকরাও কিছু জানায়নি। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছে ভাড়াটিয়ারা। একটি মিষ্টির দোকানের সকল মিষ্টি নষ্ট হয়ে গেছে।’

খোলামুড়া খেয়াঘাট থেকে কামরাঙ্গীরচর বেড়িবাঁধের দিকে যেতে আধা কিলোমিটার দূরেই নদীর তীরে সাংসদ হাজী সেলিমের মদিনা গ্রুপের সিমেন্টের গুদাম। স্থাপনাটি প্রায় দুই বিঘা জমি নিয়ে করা হয়েছিল। গত ১২ বছর ধরে এখানেই নদীর জায়গা দখল করে চলছে ব্যবসা। অভিযানে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে গেছে গুদামটি।

খোলা আকাশের নিচে শত শত সিমেন্টের বস্তা পড়ে ছিল। বস্তাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছিলেন মদিনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হেলালউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এটা মদিনা গ্রুপের নিজস্ব ক্রয়কৃত সম্পত্তি। গত ১২ বছর ধরে আমরা এখানে আছি। আমরা উচ্ছেদের লিখিত কোনো নোটিস পাইনি। সম্পূর্ণ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে গুদামটি ধ্বংস করা হয়েছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত সংসদ নির্বাচনের আগেই উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছে। এবারও তিন দিন আগে মাইকিং করা হয়েছে। এসব স্থাপনার মালিকদের ধারণা ছিল, অন্যান্যবারের মতন এবারও পার পেয়ে যাবেন।’

কামরাঙ্গীরচর বেড়িবাঁধের পাশে যে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে তা সরিয়ে নিতে মাইকিং করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী। এখানে বসতবাড়ি কম। বেশিরভাগই কারখানা। বাঁধের পাশের চা দোকানি আয়নাল হোসেন বলেন, ‘অবৈধ স্থাপনা সরাতে নদী দিয়ে মাইকিং করা হয়েছে। বাঁধের পাশে নদীর জায়গা নির্ধারণে লাল রঙের পিলার বসানো হয়েছে বছর সাতেক আগেই।’

ওই বাঁধের পাশেই ‘মধুমতি’ ব্র্যান্ডের জুতার কারখানা। কারখানার মালিক শিল্পপতি মফিজউদ্দিন সাংসদ হাজী সেলিমের ঘনিষ্ঠ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। উচ্ছেদের কারণে রবিবার দুপুরে কারখানাটি খালি করতে দেখা গেছে। সেখানকার নিরাপত্তা প্রহরী আবু হানিফ বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযানের কারণে আমরা মালামাল সরিয়ে নিচ্ছি। কোন পর্যন্ত ভাঙা হবে, তা জানা নেই আমাদের।’

বাঁধের পাশ দিয়ে আরও কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, ‘এশা প্লাস্টিক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কারখানা। সেখানকার কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মাসুদ রানা বলেন, ‘আমরা নিজেদের ক্রয়কৃত সম্পত্তিতে প্রতিষ্ঠান করেছি। সরকারের দেওয়া পিলারের ভেতরেই আছি। তবে এমনও শুনতে পাচ্ছি, পিলার থেকে ৪০ ফুট ভেতরেও ভাঙা হবে। এ বিষয়ে আমরা স্পষ্ট কিছু জানতে পারছি না।’

বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবার বুড়িগঙ্গার তীরে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পর আবার দখল করা হয়। এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ব্যবস্থা নিয়েই এবারের উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

উচ্ছেদ অভিযানের প্রথম দিন গত মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তৈলঘাট এলাকা থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার খোলামুড়া পর্যন্ত সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রথম দিনে ১৬৪টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। দ্বিতীয় দিন বুধবারে ১৫০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। তৃতীয় দিনে উচ্ছেদ করা হয় ১৩০টি স্থাপনা।

অভিযানের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন, যেকোনো মূল্যে নদীকে উদ্ধার করতে হবে। নদীর পারে ছোট বা বড় এমনকি ২০ তলা ভবন থাকলেও তা ভেঙে ফেলার নির্দেশনা রয়েছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত