মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পুরনো দপ্তরপ্রধানদের চান না নতুন মন্ত্রীরা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৪৪ এএম

বিভিন্ন দপ্তরপ্রধানদের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না নতুন মন্ত্রীদের। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও দপ্তরপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক মন্ত্রী তার অধীন দপ্তরপ্রধান বদলাতে চান। বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথাও বলেছেন। দপ্তর হারানোর ভয়ে অনেক কর্মকর্তাও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত ৭ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা গঠন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর দুই দিন পর থেকে দপ্তরে বসা শুরু করেন তারা। দপ্তরে বসার পর থেকেই মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থা বা দপ্তরপ্র্রধানরা ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানিয়ে নতুন মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। এরই মধ্যে বেশিরভাগ মন্ত্রী তার অধীন দপ্তর-অধিদপ্তর পরিদর্শন শেষ করেছেন। অনেক মন্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে সংগ্রহ করেছেন রুলস অব বিজনেস বা এলোকেশন অব বিজনেস। এসব পড়ে নিজের কাজ ও অধীনস্থ দপ্তর সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। তবে কাজ শুরু করতে গিয়েই অনেক মন্ত্রী হোঁচট খাচ্ছেন। তাই তারা চাইছেন আগের মন্ত্রীর পছন্দের দপ্তরপ্রধানকে সরিয়ে দিতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বেশিরভাগ মন্ত্রীই চান না আগের মন্ত্রীর দপ্তরপ্রধানকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে। তারা মনে করছেন, আগের মন্ত্রীর সঙ্গে সখ্য না থাকলে এসব কর্মকর্তা দীর্ঘদিন দপ্তরপ্রধান থাকতে পারতেন না। এসব কর্মকর্তা এখনো পূর্ববর্তী মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে বর্তমান মন্ত্রীদের ধারণা। মূলত এ কারণেই অনেকে বর্তমান দপ্তরপ্রধানকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছেন। আবার অনেক মন্ত্রী মনে করছেন, বর্তমান দপ্তরপ্রধান অদক্ষ। তাকে সরিয়ে নতুন দক্ষ দপ্তরপ্রধান নিতে চান তারা।

এদিকে অনেক অধিদপ্তরে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান। এসব নিয়োগে হস্তক্ষেপ করার জন্যও মন্ত্রীরা দপ্তরপ্রধান বদলাতে চান। বর্তমানে বেশিরভাগ দপ্তরপ্রধানই ১৯৮৪ বা ’৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা। তারা চাকরি জীবনের শেষ সময়ে এসে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকেই বিদায় নিতে চান। কারণ দপ্তর থেকে বিদায় না নিতে পারলে তাদের ওএসডি হিসেবে বিদায় নিতে হবে। একই সংকটে পড়েছেন প্রশাসন ক্যাডারের বাইরে অন্য ক্যাডার কর্মকর্তারাও। সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহমদ। বিমানকে সামনে থেকে নেতৃত্বদানকারী মোসাদ্দিকের ওপর সন্তুষ্ট নন নতুন বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। এরই মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক সম্পর্কে তিনি তার বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এ মাসেই বিমান পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হবে। এরপরই সরিয়ে দেওয়া হবে বর্তমান বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব মো. মহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ আরও কয়েকজন পরিচালক পদে পরিবর্তন আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বোর্ড পুনর্গঠনের পর ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ আরও কয়েকজন পরিচালক নিয়োগ করা হবে।

৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর চালের বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সীকে সঙ্গে নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করার পরও অস্থিরতা ছিল বেশ কয়েক দিন। পাইকারিতে চালের দর কমলেও তার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়তে সময় লেগেছে। বিব্রতকর এই অবস্থা যাতে আর না হয় সেজন্য খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আরিফুর রহমান অপুকে পদ থেকে সরিয়ে দিতে চান নতুন খাদ্যমন্ত্রী। এই প্রক্রিয়ায় ‘ইন্ধন দিচ্ছেন’ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অন্য একটি সংস্থাপ্রধান। খাদ্য অধিদপ্তরের ডিজিকে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে জনবল নিয়োগের বিষয়টিও রয়েছে। গত বছর ১১ জুলাই খাদ্য অধিদপ্তর ২৪ ধরনের (ক্যাটাগরি) ১ হাজার ১৬৬ পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এসব পদে চাকরি পেতে ১৩ লাখ ৭৮ হাজার আবেদন পড়েছে। অনিয়ম যাতে না হয় সেজন্য ডিজি প্রার্থী বাছাই করার দায়িত্ব ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম-এমআইএসকে দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের এক অংশ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এ নিয়োগ সম্পন্ন করতে চায়। গত কয়েক বছর খাদ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে যেসব নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে তার সবকটিতেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক অভিযোগ নিয়ে হওয়া মামলার বিচার চলছে। ডিজি পরিবর্তনসহ এসব অনিয়মের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি খাদ্য সচিব শাহাবুদ্দিন আহমদ।

বিভিন্ন দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে যেসব সামগ্রী প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শীত নিবারণে দরিদ্রদের মধ্যে প্রতিবছর যে কম্বল দরকার, সংগ্রহে রয়েছে তার পাঁচগুণেরও বেশি। বেশি কমিশনের আশায় সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কম্বল কিনে গুদাম ভরে রেখেছেন। বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। অতিরিক্ত কেনাকাটার ওই দায় বর্তাতে পারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু সৈয়দ মোহাম্মদ হাশিমের ওপর।

শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শিবনাথ রায়কে সরকারি কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরে পাঠানো হতে পারে। গত ৩ জানুয়ারি তিনি শ্রম অধিদপ্তরে যোগদান করলেও তাকে কলকারখানা অধিদপ্তরে পাঠানোর আভাস দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

অধীনস্থ দপ্তর-পরিদপ্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। ২০০৯ সাল থেকে কৃষি মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন মতিয়া চৌধুরী। আস্থার লোকদের দিয়েই তিনি দপ্তর চালিয়েছেন। বর্তমান কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক নিজে কৃষিবিদ হওয়ায় তিনি তার পছন্দ অনুযায়ী দপ্তর সাজাতে চান। সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ড. ফরিদউদ্দিনকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ২০১৬ সাল থেকে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক থাকায় ড. মো. মনজুরুল আলমকে এ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. শাজাহান কবীরকেও সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। তিনি ২০১৭ সাল থেকে ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে রয়েছেন। একই ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছেন বাংলাদেশ সুপারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. আমজাদ হোসেন। বরেন্দ্র বহুমুখী কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক পদে ২০১৫ সাল থেকে রয়েছেন মো. আবদুর রশিদ। এক পদে এত দীর্ঘ সময় থাকায় তাকেও সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. আকরাম হোসেন চৌধুরীও ঝুঁকিতে রয়েছেন। পরিবর্তন আসতে পারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে। এছাড়া মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, হার্টিকালচার এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত