শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নতুনদের বুকে টেনে নিন

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:১৩ পিএম

এরই মধ্যে দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং কোনো কোনো জায়গায় ক্লাসও আরম্ভ হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী অনেক স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন করে। প্রথম যখন কোনো শিক্ষার্থী এমন একটা বড় জায়গায় নিজের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে তখন স্বভাবতই তার মধ্যে অন্যরকম একটা আবেগ ও উত্তেজনা কাজ করে। এখানে এসে তাকে পরবর্তী জীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেও একজন শিক্ষার্থীকে নানামুখী পরীক্ষা এবং প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভয়ংকরভাবে ‘র‌্যাগিং’ বা নতুনদের বরণ করার নামে ‘নাজেহাল’ করার প্রথা চালু আছে। অনেকে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জঘন্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকেন। দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে ‘র‌্যাগিং’ অবশ্যই একটি ভয়ংকর অপরাধ। এটি একপ্রকার মানসিক নির্যাতন যা করে কেউ কেউ ‘পৈশাচিক’ তৃপ্তি পেয়ে থাকে। একজন নবীন শিক্ষার্থী যখন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেই এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় তখন স্বভাবতই তার ওপর মানসিক চাপ পড়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তার মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণার জন্ম হতে পারে।

র‌্যাগিং বন্ধ করার জন্য কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের পদক্ষেপে এই অপরাধ আগের তুলনায় কমে এসেছে। তবে সবার আগে আমাদের সচেতন হতে হবে। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, নতুন যে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করল সে আমাদেরই ভাই কিংবা বোন। বাড়িতে আমরা যেমন নিজেদের ভাই-বোনকে আগলে রাখি এখানেও তাদের সেভাবে আগলে রাখতে হবে। আজ যদি আমি অন্যের ভাই-বোনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করি তাহলে আগামীতে যখন আমার নিজের পরিবারের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করবে, তখন তার সঙ্গেও অন্য কেউ খারাপ আচরণ করবে না তার নিশ্চয়তা কি! একজন শিক্ষার্থী অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেও নিঃসঙ্গ বোধ করতে পারে। কারণ একেবারে অপরিচিত এক পরিবেশে এসে হঠাৎ করেই সবাই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে না। বন্ধু-বান্ধবহীন নিঃসঙ্গ অবস্থায় সে যেন নিজেকে একা না ভাবে সে জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই পর্যাপ্ত পরিমাণ আবাসনের ব্যবস্থা নেই। হলে সিটের ব্যবস্থা করতে গিয়েই নবীন শিক্ষার্থীর সংকটের শুরু হয়। বেশিরভাগ ‘র‌্যাগিং’-এর ঘটনাও এই হলে থাকাকে কেন্দ্র করে ঘটে থাকে। সব শিক্ষার্থী বৈধভাবে হলে থাকার সুযোগ পেলে এমনিতেই এই সমস্যা অনেকটা কমে যেত। দ্বিতীয় আরেকটি কারণেও র‌্যাগিংয়ের শিকার হয় নবীনরা। সেটি আবাসিক হল বা ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় রত ‘বড় ভাই’ বা ‘বড় বোন’দের নবীন শিক্ষার্থীদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা। র‌্যাগিং করে ভয় দেখিয়ে এভাবে নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তারা দলে টানতে চায়।

আমি যখন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি তখন আমার নিজেরই অনেক সমস্যা ছিল। আমার মধ্যে এক ধরনের জড়তা কাজ করত। কারও সাথে তেমন মিশতে পারতাম না, ভালোভাবে কথা বলতে পারতাম না। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নবীনদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে; নিজের দক্ষতা বাড়াতে হলে এসব সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তবে এমন সংগঠন থেকেও দূরে থাকা কর্তব্য যাতে করে নিজের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সুতরাং এ বিষয়েও সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। স্কুল-কলেজের শিক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা ক্লাসে শিক্ষকদের লেকচার ঠিকমতো বুঝতে পারে না। ফলে তারা মনোযোগ হারিয়ে ফেলে এবং যার ফলে রেজাল্ট খারাপ হয়ে যায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ক্লাসে মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষককে প্রশ্ন করে বিষয়টা বুঝে নিতে হবে। তাছাড়া বিভাগের বড় ভাই-বোনদের কাছ থেকেও এ ব্যাপারে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। যেসব ছোট ভাই-বোন আপনাদের কাছে পরামর্শের জন্য আসবে তাদের সুন্দর পরামর্শের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ বাতলে দেবেন। এতে করে আপনাদের প্রতি নতুনদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বহুগুণ বেড়ে যাবে নিঃসন্দেহে।

নতুন শিক্ষার্থীদের বন্ধু হিসেবে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। শিক্ষকদেরও উচিত হবে নতুন শিক্ষর্থীদের জন্য সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা। একটি সুস্থ ও সুন্দর জাতি গঠন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সুতরাং তাদের সেভাবেই গড়ে তোলা কর্তব্য। নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা সকল শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর জন্য একান্ত প্রয়োজন।

আরাফাত শাহীন

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত