সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভূমি রেকর্ড ডিজিটাল করার জরুরি উদ্যোগ

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৩৬ পিএম

ভূমি ব্যবস্থাপনার বিপুল যজ্ঞের জরুরি একটি বিষয় ভূমির রেকর্ড কিংবা কোন জমি কার নামে নিবন্ধিত আছে, তার নথিপত্র। ভূমি বা জমি কেনাবেচা থেকে শুরু করে তা হস্তান্তর এবং নতুন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে যেমন এটা জরুরি, তেমনি কোনো জমিতে নতুন দালানকোঠা বা অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রথমেই জমির রেকর্ডপত্র হালনাগাদ আছে কি না, সেসব যাচাই-বাছাই একটি প্রাথমিক শর্ত। এ জন্য দেশের ভূমি অফিসগুলোতে এ-সংক্রান্ত কাজে প্রতিদিনই অগণিত মানুষের ভিড় লেগে থাকে।

‘অবশেষে ডিজিটাল হচ্ছে ভূমি ব্যবস্থাপনা’ শিরোনামে মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেল, এরই মধ্যে সারা দেশের ৩ কোটি ১০ লাখ ‘সিএস’ ও ‘এসএ’ খতিয়ান স্ক্যান করে অনলাইনে নথিবদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে বাকি ১ কোটি ৫৮ লাখ খতিয়ান অনলাইনে নথিবদ্ধ করার কাজও চলতি মাসেই শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে জমির মালিক নির্দিষ্ট ফি জমাদানের বিনিময়ে অনলাইন থেকেই জমির খতিয়ান প্রিন্ট করতে পারবেন। ফলে তাকে আর আগের মতো খতিয়ানের ‘নকল তোলা’ বা ‘সত্যায়িত কপি’র জন্য ভূমি অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। পাশাপাশি ‘নামজারি’র ক্ষেত্রে সময় কমিয়ে এনে আবেদনের চার সপ্তাহের মধ্যে তা সম্পন্ন করার বিধান চালু হচ্ছে। অনলাইনে এসব সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই সেবা না পেলে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রাখাটা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সরাসরি অভিযোগ জানানোর জন্য টেলিফোন ‘হটলাইন’ চালু করা হলে অধীনস্থ প্রশাসনের জবাবদিহিতা বাড়বে।

ব্রিটিশ আমলে দেশে প্রথম ভূমি জরিপ হয়েছিল প্রায় অর্ধশতক ধরে। ‘ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে’ বা ‘সিএস’ রেকর্ড নামে পরিচিত সেই জরিপ ১৯৪০ সাল নাগাদ শেষ হয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা জমিদারি প্রথা বাতিলের পর ১৯৫৫ সালে জমিদারদের অধীন প্রজা বা ব্যক্তিমালিকদের নামে মালিকানা স্বত্ব এবং খাসজমির তালিকা প্রস্তুত করতে নতুন জরিপ করা হয়। পাকিস্তান আমলের এই জরিপ ‘স্টেট অ্যাকুইজিশন’ বা ‘এসএ’ রেকর্ড নামে পরিচিত। সর্বশেষ দেশব্যাপী ভূমি জরিপ হয় স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশকে। ‘বাংলাদেশ রিভিশনাল সার্ভে’ নামে এই জরিপ ‘আরএস’ রেকর্ড নামে পরিচিত।

ভূমি রেকর্ড ডিজিটাল করার পাশাপাশি ভূমি জরিপ ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আধুনিকায়ন করাটা জরুরি। দেশে এখন ভূমি ব্যবস্থাপনায় তিনটি প্রশাসন কাজ করে থাকে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর’ জরিপ চালায় এবং স্বত্বলিপি বা রেকর্ড প্রণয়ন করে। মাঠপর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার থেকে শুরু করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেকর্ড হালনাগাদ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভূমি রাজস্ব আদায় করেন। আর মাঠপর্যায়ে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন সাব-রেজিস্ট্রাররা করেন ভূমি নিবন্ধনের কাজ। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ ভূমি প্রশাসন সংস্কার’ প্রকল্পের এক প্রস্তাবে ভূমি রেকর্ডের এ ত্রিমুখী উৎসকে বড় ধরনের ত্রুটি বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন ভূমির শ্রেণীকরণের প্রশ্নটিকে। ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল করার উদ্যোগের মধ্যে দেশে ভূমির শ্রেণি বিদ্যমান ৩০০ থেকে কমিয়ে মাত্র ১০টিতে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কৃষিজমি, নদী-জলাশয় এবং শিকস্তি-পয়স্তি ও প্লাবনভূমি, বনভূমিসহ প্রাকৃতিক এবং সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জমির শ্রেণীকরণে বিশেষ সচেতনতা ও দূরদর্শিতার প্রয়োজন আছে। তা না হলে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের কবলে পড়ে দেশের সীমিত ভূমির অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকে যাবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এই ইতিবাচক উদ্যোগের আশু বাস্তবায়নের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এর সার্বক্ষণিক তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অন্যতম শীর্ষ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ভূমি খাতের ছোটবড় নানা দুর্নীতির যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে যেমন দেশের মানুষের আস্থা ফিরে আসবে, তেমনি নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় ভূমি খাতে নতুন দিনের সূচনা হবে বলে আশা করা যায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত