রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ক্রিসেন্টের জালিয়াতির প্রমাণ দুদকের হাতে

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৪:৩৯ এএম

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের নামে ১৭৪৩ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও জনতা ব্যাংকের ২০ কর্মকর্তা জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে শিগগির মামলা করবে কমিশন।

দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপ জনতা ব্যাংক থেকে ৫টি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭৪৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব টাকা তারা দুবাই, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাচার (মানি লন্ডারিং) করেছে।

এদিকে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ৯১৯ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে গত ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর চকবাজার থানায় পৃথক তিনটি মামলা করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। তারা এরই মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ কাদেরকে গ্রেপ্তার করেছে। ঋণ জালিয়াতিতে তার অন্যতম সহযোগী ও জাজ মাল্টি মিডিয়ার মালিক আবদুল আজিজসহ অপর আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য খুঁজছে। তাদের যেখানে পাওয়া যাবে সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করা হবে।

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শহীদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্রিসেন্ট গ্রুপ দুবাই, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হয়েছে। ওই দিনই বিকালে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এম এ কাদেরকে শুল্ক গোয়েন্দার প্রধান কার্যালয়ে ডাকা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। রিমান্ড আবেদন শুনানির অপেক্ষায় আছে। শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক বলেন, ‘টাকা পাচারে কাদেরের অন্যতম সহযোগী ছিলেন তারই আপন ভাই রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের এমডি ও জাজ মাল্টি মিডিয়ার মালিক আবদুল আজিজ। আমরা আজিজসহ আসামিদের যেখানে পাব সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করব। ক্রিসেন্টের জালিয়াতিতে জড়িতদের গ্রেপ্তারে তিনি সবার কাছে সহযোগিতা চান। 

ঋণ জালিয়াতির ব্যাপারে জনতা ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপের কাছে সুদে আসলে তাদের পাওনা (গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) তিন হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এসব ঋণ জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকটির ইমামগঞ্জ শাখা থেকে নেওয়া হয়। ঋণের পুরোটাই খেলাপি করে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে জনতা ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ নিলামে বিক্রিরও প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এরই মধ্যে নিলাম ডাকা হয়েছে।

জনতা ব্যাংক ইমামগঞ্জ শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক জানান, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণের বিষয়টি পুরোটাই দেখছে প্রধান কার্যালয় ও লোকাল অফিস। এ বিষয়ে জানতে চাইলে লোকাল অফিসের মহাব্যবস্থাপক মোবারক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থঋণ আদালতে খেলাপি ঋণের বিষয়ে মামলা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ঋণ আদায়ের সমস্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়েছি। এখন আদালতে গিয়েছি। আদালত এ বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা  নেবে।’ 

দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপ জনতা ব্যাংক থেকে ৫টি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭৪৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এসব টাকা তারা দুবাই, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাচার (মানিলন্ডারিং) করেছে। এসব প্রক্রিয়ায় ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও জনতা ব্যাংকের ২০ কর্মকর্তা জড়িত থাকার বিষয়ে দুদক কমিশনার ড. মোজাম্মেল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধানে আমরা অনেকগুলো খাতে জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছি। এখন কমিশন মামলা করেবে। মামলার পর সেগুলো তদন্ত হবে। তদন্ত ও বিশদ অনুসন্ধানকালে ঋণ জালিয়াতি ও সম্পদ পাচারের আরও প্রমাণ পাওয়া গেলে সেগুলোও চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ক্রিসেন্ট গ্রুপের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান। তাই এখনই চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না তারা কত টাকা জালিয়াতি ও পাচার করেছে।’ 

চকবাজার থানায় শুল্ক গোয়েন্দার করা মামলায় এম এ কাদেরসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়। এজাহারে বলা হয়েছে, ক্রিসেন্ট গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস, ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ এবং রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের নামে ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পাচার করা হয়েছে। এম এ কাদের ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের চেয়ারম্যান। ক্রিসেন্ট লেদার ৪২২ কোটি ৪৬ লাখ, রিমেক্স ফুটওয়্যার ৪৮১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ ১৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ওই টাকা বিদেশে পাচার করেছে।

তিন মামলায় অপর আসামিরা হলেন ক্রিসেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতানা বেগম মনি, রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ ও এমডি লিটুল জাহান (মিরা), জনতা ব্যাংক লিমিটেডের ডিএমডি (সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন জিএম) জাকারিয়া হোসেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ডিএমডি (তৎকালীন জিএম জনতা ব্যাংক লিমিটেড) ফখরুল আলম, জনতা ব্যাংকের জিএম মো. রেজাউল করিম, ডিজিএম কাজী রইস উদ্দিন আহমেদ ও এ কে এম আসাদুজ্জামান, এজিএম মো. ইকবাল, (সাময়িক বরখাস্ত) মো. আতাউর রহমান সরকার, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (সাময়িক বারখাস্ত) মো. খায়রুল আমিন, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (সাময়িক বরখাস্ত) মো. মগরেব আলী, প্রিন্সিপাল অফিসার (সাময়িক বরখাস্ত) মুহাম্মদ রুহুল আমিন, সিনিয়র অফিসার (সাময়িক বরখাস্ত) মো. সাইদুজ্জাহান, মো. মনিরুজ্জামান ও মো. আবদুল্লাহ আল মামুন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত