মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

স্বজনপ্রীতি ও টাকা লোপাটে ব্যস্ত শিক্ষার হানজালা!

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:২৪ এএম

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজের অনিয়ম-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে পদের প্রভাব খাটিয়ে পেনশন ও আনুতোষিক ভাতা আটকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন অবসরপ্রাপ্ত ১৩ প্রকৌশলী। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

শিক্ষা প্রকৌশলের অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালে হানজালা প্রধান প্রকৌশলীর পদে যোগদানের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পরিবারসহ নিকটজনের প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) একটি ভবন নির্মাণের বরাদ্দ থেকে সাত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একাধিক অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জবি থেকে সাত কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছয়তলা অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণের মূল দরপত্রে প্রতি তলায় ‘শিডিউল আইটেম’ মোজাইক দেওয়ার কথা থাকলেও তার বদলে কম দামের টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম দরপত্রে মোজাইকসহ ছয়তলা ভবন নির্মাণের জন্য প্রতি তলার ব্যয় ধরা হয়েছিল পাঁচ কোটি দুই লাখ টাকা। সে হিসাবে ছয়তলার জন্য ব্যয় হওয়ার কথা ৩০ কোটি ১২ লাখ টাকা। কিন্তু প্রধান প্রকৌশলী হানজালার হস্তক্ষেপে দর নির্ধারিত হয় ৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকায়, যা প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে সাত কোটি টাকা বেশি। ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর এক চিঠিতে পরে ওই প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন দ্য বিল্ডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরেও হানজালার হস্তক্ষেপে সেখানে টাইলস বসানো হয়েছে।

মোজাইকের বদলে টাইলস বসানোর পরও বর্ধিত ব্যয়ের সংশোধিত প্রাক্কলনে অনুমোদন দিতে ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ইইডির প্রধান প্রকৌশলী হানজালার পক্ষে এক নির্বাহী প্রকৌশলী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে চিঠি লেখেন। এই বেআইনি অনুমোদনের জন্য বিভিন্নভাবে তাকে চাপপ্রয়োগ করা হয়েছে বলেও গত ১৭ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন।

পরিচিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানই পায় কাজ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও মেরামতসহ বিভিন্ন কাজ যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগেরই মালিক প্রধান প্রকৌশলী হানজালার বড় ভাই, ছোট ভাই, ছোট ভাইয়ের শ্যালক, ছোট ভাইয়ের বন্ধু, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী, খালাতো ভাই এমনকি নিজের বন্ধু।

২০১৭ সালের জুন মাসে ঢাকা মহানগর এলাকার ১০৮টি কাজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ কাজই ছিল মেরামত ও সংস্কার সংক্রান্ত। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব ভবন সংস্কার ও মেরামতের জন্য চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিটিতে বরাদ্দ থাকার কথা তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু বেশিরভাগ কাজেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০ লাখ টাকার বেশি। এটা ইইডির ইতিহাসে বিরল।

দুই বছর আগে আজিমপুরের গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের একটি ভবন নির্মাণকাজ পেয়েছিল হানজালার ছোটভাই ঠিকাদার আবদুল হাইয়ের বন্ধুর প্রতিষ্ঠান মেসার্স শামস এন্টারপ্রাইজ। ইডেন কলেজ সম্প্রসারণ বাবদ দুই কোটি ১৭ লাখ ৫ হাজার ৫১৩ টাকা ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের চারতলা হোস্টেল ভবনের টয়লেট ব্লকসমূহের স্যুয়ারেজ মেরামত ও সংস্কার বাবদ ১৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৪ টাকার কার্যাদেশ পায় মেসার্স ফিরোজা এন্টারপ্রাইজ। এই প্রতিষ্ঠানটি হানজালার ছোট আবদুল হাইয়ের স্ত্রীর বলে ইইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনের বৈদ্যুতিক বিতরণ লাইনের মেরামত বাবদ ১০ লাখ ৮৯ হাজার ৯২৭ টাকার কাজ বন্ধুর প্রতিষ্ঠান মেসার্স শামস এন্টারপ্রাইজের নামে নিয়ে আবদুল হাই নিজেই তা করেছেন। অন্যদিকে ঢাকা জোনের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মির্জা নজরুল ইসলামের আপন ভাই মির্জা আমিনুল ইসলাম পেয়েছেন চারটি মেরামত ও সংস্কার কাজ।

দরপত্রের প্রভাব খাটিয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ হানজালা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবগুলো কাজই নিয়মমাফিক হচ্ছে। কোনো অনিয়ম হয়নি।’ বেশিরভাগ কাজ নিকটজনদের পাওয়ার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ভাই-ভাতিজা কি তাহলে ব্যবসা করবে না?’

এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে অসত্য দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমার পদে থেকে কোনো অনিয়ম হয়নি। কিন্তু একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। সমাজে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছে।’

১৩ প্রকৌশলীর পেনশন আটকা

হানজালার বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে পেনশন ও আনুতোষিক ভাতা আটকে দেওয়ার অভিযোগে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত ১৩ প্রকৌশলী চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের সভাপতি বরাবর দুটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

পেনশন সহজীকরণ বিধি মোতাবেক একজন সরকারি কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার একমাসের মধ্যে তাকে পেনশন ও আনুতোষিকের ৮০ শতাংশ ভাতা দিতে হয়। কোনো জটিলতা থাকলে আনুতোষিকের বাকি ২০ শতাংশ ভাতা জটিলতা শেষে দিতে হয়। কিন্তু ২০১০ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ২৪ জুলাই পর্যন্ত অবসরে যাওয়া ১৩ জনের পেনশন এখনো ছাড় করার ব্যবস্থা করেননি হানজালা।

এ বিষয়ে হানজালার ভাষ্য, ‘আমার এখানে হস্তক্ষেপের কোনো কারণ নেই। তাদের কিছু অনিয়মের জন্য এগুলো আটকে আছে।’

ইইডির প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এমন অভিযোগ আমাদের কাছেও এসেছে। তবে তেমন কোনো তথ্যপ্রমাণ এখন আমাদের হাতে নেই। এর মধ্যে সচিবকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি করেছি। আমরা অবশ্যই বিষয়টি খতিয়ে দেখব। এইসব অভিযোগের সত্যতা পেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত