মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এফবিসিসিআই-চেম্বার নেতাদের সভা

কর হার হ্রাস ও স্তরভিত্তিক ভ্যাট চান ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:৪৪ পিএম

আয়করের হার কমিয়ে আদায় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন জেলা চেম্বারের সভাপতিরা। অভিন্ন সুরে পণ্যমূল্যের ওপর একক মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হার আরোপ না করে স্তরভিত্তিক ভ্যাট আরোপের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছেন তারা। রাজস্ব কর্মকর্তাদের হয়রানি বন্ধ করার প্রস্তাব করে তারা বলেছেন, দেশের উন্নয়নে রাজস্ব আদায় বাড়াতে উপজেলা পর্যন্ত কর ও ভ্যাট আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে জেলা চেম্বারগুলো সরকারকে সহায়তা করবে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডে জেলা পর্যায়ে শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার জোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।

গতকাল মঙ্গলবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত কাউন্সিল অব চেম্বার প্রেসিডেন্টের সভায় দেশের বিভিন্ন জেলার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতিরা এমন মতামত জানান।

আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাব তৈরিতে জেলা চেম্বারগুলোর মতামত নিতে এ সভার আয়োজন করা হয়।

রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম।

জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো, জেলা পর্যায়ে সহজশর্তে ঋণ বিতরণ করা, প্রকল্প অর্থায়নে উদ্যোক্তার অংশ (ইক্যুইটি) কমানো, বন্ধ থাকা স্থলবন্দর চালু করার প্রস্তাব করেন।

এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম বলেন, ব্যবসায় অনেক সমস্যা আছে। অনেক কষ্টও আছে। প্রধানমন্ত্রী ঋণের সুদহার একক অংকে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু সে নির্দেশনা সব ব্যাংক বাস্তবায়ন করেনি। দুঃখজনক হচ্ছে, সম্প্রতি কোনো কোনো ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার ব্যবসা-বিনিয়োগের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ জন্য ব্যবসায়ীদের দাবি হতে হবে সুনির্দিষ্ট।

এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস করেন দেশের উন্নয়নে রাজস্ব আহরণের বিকল্প নেই। তবে তা হতে হবে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে।

বড় রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ দেওয়া হয়। আবার রাজস্ব কর্মকর্তারা অনেক সময় হয়রানিও করে থাকেন। ব্যবসায়ীরা হয়রানিমুক্ত পরিবেশ চান। বর্তমানে যারা করের আওতায় নেই, তাদের করের আওতায় আনলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার দরকার হবে না।

তিনি বলেন, নতুন অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, একক ভ্যাট হারের সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে এসেছে । স্তরভিত্তিক ভ্যাট হার হবে। কর্পোরেট কর ও আয়কর হার কমাবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন বাড়বে, তেমনি রাজস্ব আয়ও বেশি হবে।

রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি রেজাউল ইসলাম মিলন বলেন, ব্যবসায়ীরা রাজস্ব দিতে চায়। তবে তা হতে হবে সাধ্য অনুযায়ী, ব্যবসার আকার অনুযায়ী। কর ও ভ্যাটের হার বাড়ালে রাজস্ব বাড়বে না। করের আওতা বাড়ালে রাজস্ব বাড়বে। বর্তমানে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকার কর ও ভ্যাট সংগ্রহ করে। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যারা কর ও ভ্যাট দিতে পারে। কর ও ভ্যাট হার না বাড়িয়ে সেখানে যেতে হবে।

রাজশাহী চেম্বারের সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, অবকাঠামো ঘাটতি ও নীতি সহায়তার অভাবে জেলা পর্যায়ে শিল্প হচ্ছে না। সরকারকে রাজস্ব বাড়াতে হলে জেলা পর্যায়ে শিল্পায়নের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এতে রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতি চাঙ্গা হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। এ জন্য তিনি প্রকল্প ঋণে উদ্যোক্তার অংশ কমানোর প্রস্তাব করেন।

কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি আবু মোর্শেদ বলেন, কর নেওয়ার প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অনেক ব্যবসায়ী কর দেওয়া থেকে দূরে থাকে। সহজে ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে কর দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। পর্যটন শিল্প উন্নয়নে নীতি সহায়তা দেওয়া ও শিল্পে ব্যবহারের লবণ আমদানিতে কর বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।

রাঙ্গামাটি চেম্বারের সভাপতি বেলাল হোসেন চৌধুরী বলেন, মানুষ কর, ভ্যাটকে ভয় পায়। সরকারকে এই ভয় দূর করতে হবে।

রাঙ্গামাটি জেলা থেকে বর্তমানে ৭৫ কোটি টাকা আয়কর আদায় হয়, কর ব্যবস্থা সহজ হলে করের পরিমাণ চারগুণ বাড়বে।

তিনি বলেন, এসডিজি অর্জন করতে হলে জেলা পর্যায়ে শিল্পায়ন করতে হবে। পার্বত্য জেলাগুলোতে শিল্পায়নের সম্ভাবনা থাকলেও যোগাযোগ অবকাঠামোর অভাবে তা করা যাচ্ছে না। সিলেট ওমেন চেম্বারের সভাপতি স্বর্ণলতা রায় বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে ভ্যাট ছাড় দিতে হবে। জেলা বা উপজেলা শহরে নারীরা যে ব্যবসা করে সেখানে অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভ্যাট নিলে নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসায় দাঁড়াতে পারবেন না।

তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের এসএমই খাতে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহারে ঋণ দেওয়ার কথা বলা হলেও ব্যাংকগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা করে না। এসব কথায় থাকলে এগোনো যাবে না, বাস্তবায়ন হতে হবে।

কিশোরগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি মুজিবুর রহমান বেলাল বলেন, ভ্যাটে স্তর থাকতেই হবে। সরকারকে বেশি রাজস্ব আদায়ের জন্য আয়কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়াতে হবে। তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষামূলক উৎপাদনের সময় ভ্যাট আরোপ না করার প্রস্তাব করেন।

চুয়াডাঙ্গা চেম্বারের সভাপতি ইয়াকুব হোসেন মানিক বলেন, অনেক ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও সরকার সেদিকে যাচ্ছে না। শুধু ভ্যাট, আয়কর নিয়ে ভাবছে। আর যারা কর দেয় শুধু তাদের নিয়েই টানাটানি হচ্ছে, কিন্তু নতুনদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও জোর কম। দর্শনা স্থলবন্দর, জীবননগর স্থলবন্দর অনেকদিন ধরে বন্ধ। এসব বন্দর চালু করলে রাজস্ব আয় বাড়বে।

দিনাজপুর চেম্বারের সভাপতি সুজানুর রেজা চৌধুরী বলেন, রাজস্ব বিভাগ

চেনা জায়গাতেই বারবার হানা দিচ্ছে। কিন্তু নতুন ক্ষেত্র খুঁজছে না। তিনি বলেন, হিলি বন্দরে ট্রাক টার্মিনাল নেই। বিরল বন্দর চালু হতে দেরি হচ্ছে। এসব দিকে নজর দিলে সরকারের আয় বাড়বে।

অনুষ্ঠানে সংগঠনের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী, সহ-সভাপতি দেওয়ান সুলতান আহমেদ বক্তব্য রাখেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত