বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আহমদিয়াদের জলসা নিয়ে পঞ্চগড় রণক্ষেত্র

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৪৫ এএম

পঞ্চগড়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বার্ষিক সালানা জলসা বন্ধের দাবিতে সদর ও আশপাশ এলাকায় সড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গত মঙ্গলবার রাতের ওই ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। এদিকে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের জলসা বা কথিত ইজতেমা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী। নয়তো পঞ্চগড় অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে পঞ্চগড় সদরে সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ পরিষদ, ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি ও পঞ্চগড় যুবসমাজ নামে কয়েকটি সংগঠনসহ স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের (অনেকের কাছে ‘কাদিয়ানি’ হিসেবেও পরিচিত) বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। মিছিল শেষে শহরের শেরেবাংলা পার্ক মোড় সংলগ্ন পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে তারা। এ সময় বিক্ষুব্ধরা আহমদনগর এলাকায় যেতে চাইলে পুলিশ করতোয়া ব্রিজের ওপর পথরোধ করে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধরা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে পুলিশ ও মুসল্লিদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। এরই মাঝে বিক্ষুব্ধদের অন্য একটি দল রাজনগর এলাকা দিয়ে আহমদনগরে গিয়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলা চালায়। এ ঘটনায় রাত ৯টা থেকে সোয়া ১১টা পর্যন্ত ওই এলাকায় যান চলাচল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। সংঘর্ষে পুলিশ, বিক্ষুব্ধ ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধশত লোক আহত হয়।

আহমদিয়া মুসলিম জামাতের আহমদনগর প্রেসিডেন্ট তাহের যুগল বলেন, ‘আমাদের ৪০ জনের মতো লোক আহত হয়েছে। বেশ কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে।’ পঞ্চগড় সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. প্রদীপ কুমার বণিক বলেন, ‘২১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’ গুরুতর আহতদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন রাত ৮টায়ই বিক্ষুব্ধ জনতা ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করে। সেখানে জলসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ‘মুসল্লিদের দাবি ছিল, কাদিয়ানিদের জলসা বন্ধ করলে তারা দাবি-দাওয়া তুলে নেবে। আমরা জলসা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার পরও এই ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।’ রাত সোয়া ১১টার দিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ গোলাম আজম পঞ্চগড় বাজার জামে মসজিদের মাইকে জলসা অনুষ্ঠানের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সবাইকে বাড়ি ফেরার অনুরোধ করেন। পঞ্চগড় থানার ওসি আবু আক্কাস আহমদ বলেন, ‘রাতে জেলা প্রশাসন জলসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তার আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে মুসল্লি ও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে।’ এদিকে গতকাল বুধবার বিকেল পর্যন্ত জলসা স্থগিত সিদ্ধান্তের কোনো চিঠি পাননি বলে জানিয়েছেন আহমদিয়া মুসলিম জামাত বাংলাদেশের নায়েবে আমির আহমদ তবশির চৌধুরী। সংঘর্ষ এড়াতে এদিনও জেলা শহর এবং আহমদনগর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন রয়েছে।

রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ সাজ্জাদ, অতিরিক্ত ডিআইজি মজিদ আলী, পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়কসহ জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এহতেশাম রেজাকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। তিন দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে আহমদিয়া সম্প্রদায়কে সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা ও পঞ্চগড়ে অনুষ্ঠিতব্য তিন দিনব্যাপী (২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি) কথিত ইজতেমা বন্ধের দাবিতে বুধবার সংবাদ সম্মেলন করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার সংগঠনের কার্যালয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা আনাস মাদানী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন দলের আমির শফী ও মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী। তারা জানান, সিরিয়া, মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতারসহ বহু রাষ্ট্র ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) আহমদিয়া সম্প্রদায়কে ‘কাফির’ ঘোষণা করেছে। বক্তারা বলেন, আহমদিয়া সম্প্রদায়কে সরকার ইজতেমা করার অনুমতি দিলে হেফাজত পঞ্চগড় অভিমুখে লংমার্চ করবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত