বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে পিছিয়ে আছে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলো। ১০ মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে মোট এডিপির ৭৩ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য এডিপির সামগ্রিক বাস্তবায়ন অনেকটাই নির্ভর করে এই ১০ মন্ত্রণালয়ের ওপর। মেগা প্রকল্পের সবগুলোই এসব মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কিন্তু বাস্তবায়নে বেহাল দশায় রয়েছে ছয়টি মন্ত্রণালয়। সব মিলিয়ে অর্থবছরের সাত মাসে মোট বরাদ্দে এক-তৃতীয়াংশ অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে। গতকাল রবিবার শেরেবাংলা নগর এনইসি সম্মেলন কক্ষে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এডিপি বরাদ্দের শতভাগ বাস্তবায়নে সচিবদের নির্দেশ দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
সভার কার্যপত্র থেকে জানা যায়, চলতি অর্থবছর সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১০ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৭৩ শতাংশ। এর মধ্যে জিওবি থেকে ৮২ হাজার ৩৩৫ কোটি, বৈদেশিক অংশ থেকে ৪৭ হাজার ৪০২ কোটি, সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন হিসেবে দুই হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়। কিন্তু জানুয়ারি শেষে এই বরাদ্দ থেকে ব্যয় হয়েছে ৪৭ হাজার ৪০২ কোটি টাকা, হিসাবে যা ৩৬ শতাংশ। এর মধ্যে জিওবি থেকে ব্যয় হয়েছে ২৭ হাজার ৭৩১ কোটি, বৈদেশিক অংশ থেকে ১৮ হাজার ৭৪৭ কোটি ও সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৯২৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যয় করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়, যার অর্জন ১১ শতাংশ। মন্ত্রণালয়টির অনুকূলে দেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। সাত মাসে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ২৮৩ কোটি টাকা।
সেতু বিভাগের অধীনে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ১৪৭ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে মাত্র ২৩ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, বাস্তবায়নের গড় হারের চেয়ে পিছিয়ে আছে আরও চারটি। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ২৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য বিভাগ ২৮ শতাংশ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩১ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ ২৯ শতাংশ এপিপি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এগিয়ে আছে বিদ্যুৎ বিভাগ ৫১ শথাংশ, স্থানীয় সরকার বিভাগ ৩৭ শতাংশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ৫৯ শতাংশ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৪১ শতাংশ।
তথ্য অনুসারে, সাত মাসে গড় হারে ৩৪ শতাংশ ৪৩ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। এই হার গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি। এ হার ছিল ৩৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সার্বিকভাবে বাস্তবায়নের হার কিছুটা বাড়লেও এখনো ছয়টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এডিপি বাস্তবায়নের হার ১৫ শতাংশের নিচে।
কার্যপত্র অনুসারে, গত সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো খরচ করতে পেরেছে ৬২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৬ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, বৈদেশিক সহায়তা থেকে ২২ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে তিন হাজার ১১৩ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।
এডিপি বাস্তবায়নে এগিয়ে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (এডিপি বাস্তবায়ন ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ), আইএমইডি (৬৭ দশমিক ১৮ শতাংশ), সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় (৬৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ), জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় (৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (৫৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) (৫৩ দশমিক ১৯ শতাংশ) এবং বিদ্যুৎ বিভাগ (৫২ দশমিক ৭৫ শতাংশ)।
অনুষ্ঠান শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘সচিবদের বলেছি প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়াতে হবে। সচিবরা আমাকে এই বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন গতি বাড়াতেই হবে। এক প্রকল্পে একাধিক পিডি (প্রকল্প পরিচালক) থাকা যাবে না। থাকতে হলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুমতি নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল পিডিরা প্রকল্প এলাকায় থাকবেন। কিন্তু অনেক পিডি এই নির্দেশনা মানেন না। পিডিরা ঢাকা থেকে প্রকল্প তদারকি করেন।
ভূমি অধিগ্রহণ প্রসঙ্গে এম এ মান্নান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কম হওয়ার অন্যতম কারণ জমি অধিগ্রহণ না হওয়া। এই বিষয়ে ভূমি সচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ‘বৈদেশিক ঋণ প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতা আছে। তাদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা আছে, ফলে কাজের গতি বাড়ছে না। এই সমন্বয়হীনতা কমিয়ে আনতে ইআরডিকে নির্দেশ দিয়েছি। ইআরডি এই সমস্যার সমাধান করবে।’
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে চীনের টাকা ছাড় করা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আসিফ উজ জামান বলেন, ‘চীনাদের চাওয়া ও আমাদের চাওয়া এক হচ্ছে না। চীনের যেটা প্রথম পছন্দ সেটা আমাদের দ্বিতীয় পছন্দ। এই সমস্যা কমিয়ে আনতে হবে। এই বিষয়ে দুই পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব নূরুল আমিন, কার্যক্রম বিভাগের প্রধান খলিলুর রহমানসহ সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব উপস্থিত ছিলেন।
