বহুকাল বিরতির পর উচ্চ আদালতের নির্দেশ মানতে গিয়ে আয়োজন হচ্ছে ডাকসু নির্বাচনের। দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙা খুব সহজ হয় না। তাই সুবাতাস বইছে কি না তা বুঝতে হলে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে এই নির্বাচনের তোড়জোড় দেখে প্রাসঙ্গিক কিছু ভাবনা সামনে চলে এলো। আজকের লেখাটা এই ভাবনার আলোকেই। বেশ ক’বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করেছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। বিধান সভায় পাস হওয়া এই বিলে দুর্নীতি, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং কাজে ব্যর্থতার দায়ে উপাচার্যকে অপসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে। আমাদের সিনেট সিন্ডিকেটের মতো পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে কোর্ট কাউন্সিল। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এই কাউন্সিলে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে একটি অধ্যাদেশ জারি করে বলা হয়েছিল ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির কারণে শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে।
রাজনীতির থাবা আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষাকে যখন কঠিন সংকটে ফেলে দিয়েছে তখনই প্রতিবেশী দেশের এমন সবল একটি পদক্ষেপ আমাদের আশাবাদী করে তোলে। এ ধারার পদক্ষেপ আমাদের নীতিনির্ধারকদের অনুপ্রাণিত করলে বন্দিত্ব দশা থেকে আমরা নিশ্চয় মুক্তি পাব। আমি যতদূর খবর রাখি তাতে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমাদের মতো অতটা নষ্ট করে দেয়নি। তারপরও এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে পারছিলেন না কেউ। শেষ পর্যন্ত মমতা সরকার এই অসাধ্যটি সাধন করল।
আমি ১৯৯০-৯৩ সালের কথা বলছি। এর অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আর এই দুষ্টগ্রহ উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে একটি স্খলন স্পষ্ট করেছিল। এসময় আমি কাছে থেকে দেখেছি ক্যাম্পাস রাজনীতি অনেকটা শোভন পর্যায়ে ছিল পশ্চিমবঙ্গে। তখন আমি গবেষণার কাজে কলকাতায় অবস্থান করেছিলাম। একদিনের কথা আমি ভুলতে পারব না। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছি। মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই কেমন যেন ভিন্ন আবহ চোখে পড়ল। ক্যাম্পাস যেন একটু বেশি শুনশান। না, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ নয়। ক্লাস চলছে। মানুষজনেরও চলাফেরা আছে। তারপরও যেন ভিন্নরকম নীরবতা। আরেকটু এগিয়ে লাইব্রেরির কাছাকাছি একটি খোলা চত্বরের কাছে গিয়ে রহস্য উন্মোচিত হলো। কয়েকজন তরুণ-তরুণী কয়েকটি চেয়ার পেতে বসেছে। সামনে একটি টেবিল। ওপরে কিছু কাগজপত্র। ওদের পাশেই একটি বড় প্ল্যাকার্ড টাঙানো আছে। ওখানে চোখ বুলিয়ে বুঝলাম আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন। প্ল্যাকার্ডে প্যানেল পরিচিতি রয়েছে। ভোটার ছাত্রছাত্রীরা ওদের কাছ থেকে ভোটার নম্বর ইত্যাদি জানার সহযোগিতা নিচ্ছে। আমি এবার কল্পনা করলাম আমার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ধরে নিচ্ছি ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে। স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ থাকছে না সেদিন। বিভিন্ন দলের মহড়া চলছে। প্রতিপক্ষের ওপর হামলার আশঙ্কা হচ্ছে। কেউ আশঙ্কা করছেন ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের। কয়েক প্লাটুন পুলিশের সতর্ক অবস্থান।
এখন তো রাজনৈতিক সুবিধা-অসুবিধা বিচার করতে গিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভুলতেই বসেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন করার কথা। অবস্থার বাস্তবতায় বোঝা যায় সরকারি দলের ছাত্ররা নির্বাচিত হবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন দেওয়া হবে না। উচ্চ আদালতের আদেশ না থাকলে আজকের শোরগলও হয়তো দেখতাম না।
আমি পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি সেখানে শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শগত মতভেদ আছে কিন্তু এর কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার মতো সংকট তারা সাধারণত সৃষ্টি করেন না। সেখানে মেধা বিচারের বদলে ভোটার শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতা তেমন চোখে পড়ে না। অন্তত গত শতকের নব্বইয়ের দশকে কলকাতা শহরকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতি থাকলেও ছাত্র সংঘাতের কথা তেমন শুনিনি।
পরবর্তী দেড়যুগে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে জাতীয় রাজনীতির কুপ্রভাব পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পড়েছে তবে আমরা যতটা বখে গেছি এর সঙ্গে তুলনীয় নয়। তারপরও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের অভিভাবক ও সুশীল সমাজ। উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অবশ্য এক শ্রেণির রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ মমতা সরকারের এই বিল পাসকে বাঁকা চোখে দেখেছিলেন। তারা মনে করেন পশ্চিমবঙ্গে তিন দশকের বাম শাসনে বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিস্ট দলগুলোর যে প্রভাব তৈরি হয়েছিল এর মূলোৎপাটনই মমতার এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন রাজনীতির প্রভাব মুক্তি উচ্চশিক্ষার পরিবেশকে যে পরিশুদ্ধ করবে এ ব্যাপারে মুক্তচিন্তার মানুষ নিঃসন্দেহ।
স্বাধীনতা-পূর্ব ছাত্ররাজনীতির গৌরবজনক ঐতিহ্যের কথা আমরা বলি। তখন না হয় প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। একটি পরাধীন দেশে অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই চলছে। ব্যক্তিগত লাভালাভের প্রশ্ন তখন ছাত্রদের কাছে অজানা ছিল। তারুণ্যের উদ্দীপনায় দেশাত্মবোধ তাদের তাড়িত করত। দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করাকে মহত্তম কাজ মনে করত। দলীয় নেতৃত্বের হুকুমবরদার হওয়ার মতো শিক্ষক রাজনীতির ধারণাও তখন তৈরি হয়নি। উপাচার্য পদলোভীদের রাজনৈতিক ঘোট পাকাতে হয় তেমন বাস্তবতার জন্ম হয়নি। তাই উপাচার্য পদটি তখন ছিল অতি সম্মানিত। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োজিত উপাচার্য মহোদয়দের আলাদা পরিচয়ের প্রয়োজন ছিল না। পান্ডিত্যের বিভায় তারা প্রত্যেকেই ছিলেন উজ্জ্বল। এখনকার মতো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তারা প্রতিদিন নতুন বিতর্কের জন্ম দিতেন না। পাশাপাশি শিক্ষা গবেষণায় উজ্জ্বল শিক্ষকরা ডিনসহ নানা অ্যাকাডেমিক-প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে তেমন অস্বস্তি চোখে পড়ত না। এসব কিছুর যোগফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান তেমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পাস হলে উচ্চশিক্ষা অঙ্গনের সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবার পুরো গণতান্ত্রিক হলো। কিন্তু যে দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের অপব্যবহার রয়েছে সেদেশে গণতন্ত্র নিজস্ব রূপ নিয়ে কখনো দাঁড়াতে পারে না। জাতীয় রাজনীতি কঠিন দলতন্ত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকে এদেশে ক্ষমতার রাজনীতির দৌড়ে এগিয়ে থাকা দলগুলো জনগণের রাজনীতি প্রায় ভুলতে বসল। এসব দলের পরিচালকরা গণতন্ত্রের সেøাগানে মাঠ কাঁপালেন কিন্তু আচরণে লাঞ্ছিত করতে লাগলেন গণতন্ত্রকে। নিজ নিজ দলীয় শক্তি কুক্ষিগত করতে দলের নীতিনির্ধারকদের শ্যেনদৃষ্টি পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে। সব সুবিধাবাদী রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে পেশিশক্তির খোঁজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে। আইয়ুব খানও অভিন্ন উদ্দেশ্যে এনএসএফ গঠন করেছিলেন। কিন্তু অধিকার আন্দোলনে উদ্বেলিত ছাত্রদের সামনে কিছুটা নৈরাজ্য সৃষ্টি ছাড়া এনএসএফ শাসকদের উদ্দেশ্য তেমন সফল করতে পারেনি।
স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগ এর ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখাতে পারেনি। বলা যায় সে সময়ের নেতৃত্ব গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শপথ ভুলে দলীয় সংকীর্ণতায় স্বার্থপর হতে থাকে। এরই কুপ্রভাব পড়ে রাজনীতিতে এবং অতঃপর ছাত্ররাজনীতিতে। আওয়ামী ছাত্রলীগ ও জাসদ ছাত্রলীগে বিভাজিত হয়ে খুনোখুনির রাজনীতির বিকাশ ঘটাল ক্যাম্পাসে। পরে ছাত্রদল ছাত্র সমাজ অভিন্ন অঘটনের নায়ক হতে লাগল। ক্ষমতার বলয় তৈরি করতে রাজনৈতিক দলগুলো যার যার ঘরানায় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে লাগল। এভাবে আদর্শ থেকে কক্ষচ্যুত হতে লাগল ছাত্ররাজনীতি।
ছাত্রকল্যাণ ও শিক্ষাসংক্রান্ত দাবি ক্রমে ছাত্ররাজনীতির স্লোগান থেকে অপসৃত হতে লাগল। দলীয় রাজনীতি ও দলীয় নেতানেত্রীর বন্দনা হলো এ পর্বের ছাত্র রাজনীতির আদর্শ। এভাবে রাজনৈতিক দলের হাতিয়ারে পরিণত হতে লাগল ছাত্ররাজনীতি। এই বাস্তবতায় মেধাবী ও আদর্শবাদী ছাত্ররা স্বাভাবিকভাবেই ছাত্ররাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেধাবিদের অন্ধকার পথ চেনানো সম্পন্ন করা হলো। এমনি করে দলীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধি এবং প্রতিপক্ষকে পেশিশক্তি দিয়ে ঘায়েল করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যার যার সমর্থিত ছাত্র নেতাকর্মীদের মাথায় চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসের মুকুট পরিয়ে দিল। স্বাভাবিকভাবেই এমন বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবেই।
একই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষকদের মধ্যে দলীয় রাজনীতি কদর্যভাবে জায়গা করে নিল। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্ত হওয়া কল্যাণকর হতে পারত যদি রাজনীতি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা শিক্ষকের মর্যাদা ও অহংকারকে সবার ওপরে স্থান দিতেন। তারা যদি নিজেদের রাজনৈতিক নেতাদের আজ্ঞাবহ না ভেবে, স্বার্থপ্রেম নয় দেশপ্রেমকে সবার ওপরে স্থান দিতে পারতেন, দলের গাইড ফিলোসোফার হতে পারতেন, তাহলে শিক্ষক রাজনীতি কল্যাণ বয়ে আনত। বরঞ্চ শিক্ষক রাজনীতি দিন দিন হয়ে পড়তে লাগল নষ্ট ছাত্ররাজনীতির ইন্টেলেকচুয়াল ভার্সন।
অপূর্ণ গণতন্ত্রের দেশে গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ বিকৃত হতে বাধ্য। রাজনীতিবিদরা তা বিকৃত করার পথ তৈরি করে দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতির স্খলন ঘটতে লাগল উপাচার্য নিয়োগ পদ্ধতি থেকে। উপাচার্য প্যানেল নির্বাচিত হবে সিনেটরদের ভোট থেকে। ফলে সকল দল নানা উপায়ে নিজ নিজ সমর্থক সিনেটর তৈরি করতে থাকে। এদিক থেকে সরকারি দল একটু এগিয়ে থাকে। আমলা আর সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে কয়েকজন সদস্য হন। তারা আসেন সরকারের ইঙ্গিতে। ভোট দেওয়ার সময় সাধারণত ব্যক্তি গুরুত্ব পায় না, গুরুত্ব পায় সরকারি ইচ্ছে। একটি বড় সংখ্যক ভোটার হন রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটদের ভেতর থেকে। তাই উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষীয় দল ফান্ড তৈরি করে। সেই টাকা হাতে ছুটোছুটি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের কাছে। ছাত্র থাকাকালীন কে কোন দল করতেন এক্ষেত্রে তা গুরুত্ব পায়। অনেক ক্ষেত্রে দলীয় টাকায় সদস্য বানিয়ে ভোটারদের পক্ষপুটে নিয়ে নেন শিক্ষক দলগুলো। এক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট শিক্ষক ভোটার যারা তাদের অধিকাংশও জড়িত থাকেন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে। এই বাস্তবতায় মুক্তচিন্তায় উপাচার্য নিয়োগ হয়ে ওঠে না।
উপাচার্য নিয়োগের পরের ধাপটি আরও স্খলন বাড়ায়। বিধি অনুযায়ী তিনজনের প্যানেল নির্বাচিত হবে এবং অদ্ভুত জোড়াতালির গণতন্ত্রে তাদের মধ্য থেকে একজনকে চ্যান্সেলর নিয়োগ দেবেন। অধ্যাদেশভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের চ্যান্সেলর মহামান্য রাষ্ট্রপতি। আর তিনি তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সিদ্ধান্ত দেন। এই ব্যবস্থায় উপাচার্য নিয়োগে দলীয়করণ সম্পন্ন হয়। নিয়োগের আগ পর্যন্ত তিন নির্বাচিত উপাচার্য পদপ্রার্থীর নানা চ্যানেল ধরে প্রধানমন্ত্রীর কৃপা লাভের জন্য ছুটোছুটি শুরু হয়ে যায়। এই ব্যবস্থায় সঙ্গত কারণেই দলনিরপেক্ষ সর্বজনশ্রদ্ধেয় পান্ডিত্যে উজ্জ্বল উপাচার্য পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এখন তো আবার সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্য বদল হয়। অধ্যাদেশ একদিকে ফেলে অ্যাডহক ভিত্তিতে দলীয় পছন্দের শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়। নির্বাচনের আয়োজন করি করছি করতে করতে তিনি তার মেয়াদ শেষ করেন। এরপর সাধারণত দ্বিতীয়বারের মতো পদ ধরে রাখতে নির্বাচনের আয়োজন করতে থাকেন। তার জন্য প্রস্তুতি হিসেবে পদে থাকার ক্ষমতা পুরোটা ব্যবহার করে স্তাবকদের বলয় তৈরি করেন। একই লক্ষ্যে এবং প্রশাসন পরিচালনায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে শিক্ষক সমিতি, ডিন, সিন্ডিকেট সকল নির্বাচনে নিজ দলের একাধিপত্য নিশ্চিত করতে চান। ফলে সকল নির্বাচনের আগে বিজয় নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষক নিয়োগের হিড়িক পড়ে যায়। আনুগত্য নিশ্চিত রাখতে হবে বলে এসব নিয়োগে মেধা বিচার সবসময় গুরুত্ব পায় না। এজন্য অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত শব্দে শিক্ষক নয় ভোটার নিয়োগ হয়। শিক্ষক হিসেবে নিজেকে তৈরি করার চেয়ে দলীয় নির্দেশে এসব নবীন শিক্ষকদের অনেককে দলীয় কর্মীর ভূমিকায় সময় দিতে হয় বেশি। যেসব মেধাবী নবীন শিক্ষক নিজেকে শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে চান স্বাধীনতাহীনতা তাকে বাধাগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যখন এমন ভয়ংকর বাস্তবতা কার্যকর তখন উচ্চশিক্ষাকে এর সম্ভ্রমের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে দেশবাসীর আকাক্সক্ষা থাকবেই। এ কারণেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিল পাস আমাদের লোভী করে তুলেছে। বাস্তবতা এড়িয়ে মতলববাজরা সবসময় বলে থাকেন ছাত্ররাজনীতি না থাকলে ভবিষ্যৎ রাজনীতি-মেধাশূন্য হবে দেশ। আমরা বলি দলীয় রাজনীতির বলয়-বন্দি নষ্ট রাজনীতি চর্চাকারীদের মেধার প্রয়োজন নেই প্রয়োজন দলীয় প্রভাবমুক্ত রাজনীতি চর্চা করা। শিক্ষক রাজনীতি চর্চা করবেন তার মুক্ত চেতনা থেকে। দলীয় আজ্ঞাবহ হয়ে নয়। দেশের বৃহত্তর কল্যাণ চিন্তায় এ অবস্থায় ফিরে আসতে হলে প্রয়োজন সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ দাবি। লেখক
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
