মানবজীবনে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন অনুষঙ্গ। সময়ের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তিত হচ্ছে চিন্তাচেতনা, ভাবধারা। বইয়ের পাঠকের ক্ষেত্রেও এ পরিবর্তন লক্ষণীয়। লেখার বিষয়ের পাশাপাশি পড়ার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। কেউ কেউ মুদ্রিত বই ছেড়ে ঝুঁকছেন অনলাইন প্ল্যাটফরমে। এত কিছুর পরও এখনো ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি পাঠকের আকর্ষণ কমেনি। এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়ও বিক্রি হচ্ছে ধ্রুপদী সাহিত্য নিয়ে রচিত ও সম্পাদিত নানা বই।
প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের বেশ কিছু বই রয়েছে বইমেলায়। গবেষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও সাধারণ পাঠকের আকর্ষণ রয়েছে বইগুলো ঘিরে। এ বিষয়ে অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের প্রকাশক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ জাকির হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাচীন সাহিত্য, ভাষা ও ধর্ম নিয়ে বই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গবেষকদের। এ ছাড়া বিদেশিরা যখন বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন বইগুলো ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য সংগ্রহ করে।’
তিনি জানান, গবেষক ছাড়াও অনেক ছাত্র-শিক্ষক এসব বই কেনেন। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি পড়ার জন্যও কিনে থাকেন অনেকে। তার প্রকাশনীতে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদের রূপান্তরিত গীতবাণীর বই আছে। সাংগীতিক বিশ্লেষণের জন্য ‘চর্যাপদ গীতগোবিন্দ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বইটি পাঠক-সমাদৃত হয়েছে বলে জানান এই প্রকাশক।
প্রাচীন সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক সাইমন জাকারিয়া বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে গিয়ে আমরা বৃত্তের ভেতর আটকে যাই। বিশ্বের বুকে পরিচয় দেওয়ার মতো আমাদের অনেক কিছু আছে। সেই ঐতিহ্য সম্পর্কে যদি নিজেরাই না জানতে পারি, তাহলে বিশ্বকে কী জানাব? মানুষের চিন্তা আগে ছিল মৌলিক ও বহুমুখী যা আমরা প্রাচীন সাহিত্যের মাধ্যমে জানতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বহুমাত্রিক সাহিত্য, ধর্ম ও সভ্যতার পরিচয় তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাই। এই কাজের পেছনে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই, যারা করছেন নিজের ভালোবাসা থেকেই করছেন।’
নালন্দা প্রকাশনীতে পাওয়া যাচ্ছে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত মধ্যযুগের কবিতা নিয়ে বই ‘বৈষ্ণব পদরত্নাবলী’। অসীম সাহার বিনির্মিত রচনা ‘বড়ুয়া চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বইটি কিনেছেন মাসুদ। প্রাচীন সাহিত্য নিয়ে তার আগ্রহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘প্রতিটা মানুষের বই পড়ার আলাদা পছন্দ থাকে। আমার ইতিহাস, প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে জানার কৌতূহল প্রচুর। অনেকটা নেশার মতো। এই বইটি কিনেছি, সামনে আবার একদিন মেলায় আসব আরও বই সংগ্রহ করতে।’ গল্প-উপন্যাসের বই পড়েন কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘ফিকশন বই কম পড়ি। পড়লে রবীন্দ্রনাথ পড়া হয়।’
মেলায় নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্য অনুযায়ী গতকাল সোমবার বইমেলায় নতুন বই এসেছে ১৩৯টি। এর মধ্যে গল্পগ্রন্থ ২৫, উপন্যাস ১৯, প্রবন্ধ ৫, কবিতা ৪৭, গবেষণা ২, ছড়া ১, শিশুসাহিত্য ৫, জীবনী ৩, মুক্তিযুদ্ধ ১, নাটক ১, বিজ্ঞান ৪, ভ্রমণ ১, ইতিহাস ৩, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ১, রম্য/ধাঁধা ৩, ধর্মীয় ২, অনুবাদ ১, সায়েন্স ফিকশন ১ ও অন্যান্য ১৪টি। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে অক্ষর প্রকাশনী এনেছে আমিনুর রহমান সুলতানের ‘ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, আগামী প্রকাশনী এনেছে মাহফুজা হিলালীর ‘তিনটি নাটক অসমাপ্ত’, আগামী প্রকাশনী এনেছে আবদুল হাইয়ের ‘শিল্পকলার নান্দনিকতা’, রাবেয়া বুক হাউস এনেছে সেলিনা হোসেনের ‘মেয়রের গাড়ি’, ঐতিহ্য এনেছে জনি হকের ‘কান কথা (কান চলচ্চিত্র উৎসবের ডায়েরি)’।
লেখক বলছি : এদিন প্রকাশিত নতুন বই নিয়ে ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে কথা বলেন পাঁচ লেখক। আলোচনায় অংশ নেন মুস্তাফিজ শফি, শোয়াইব জিবরান, মুহাম্মদ শামসুল হক, মলয় বালা।
মূল মঞ্চ : বিকেল ৪টায় মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘কবি বেলাল চৌধুরী : শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি পিয়াস মজিদ। আলোচনায় অংশ নেন কবি জাহিদুল হক, দিলারা হাফিজ ও তারিক সুজাত। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি রবিউল হুসাইন। সন্ধ্যায় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন কবি দিলারা হাফিজ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, ফরিদ আহমেদ দুলাল, রহিমা আখতার কল্পনা ও মতিন রায়হান। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ইকবাল খোরশেদ ও সায়েরা হাবীব। পুথিপাঠ করেন জালাল খান ইউসুফী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল সাইমন জাকারিয়ার পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভাবনগর ফাউন্ডেশন’-এর পরিবেশনা। এ ছাড়া সায়িক সিদ্দিকীর পরিচালনায় পরিবেশিত হয় পালাগান ‘নোলকজানের পালা’।
শিশুকিশোর চিত্র প্রদর্শনী : বইমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রতি বছর শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এ বছর প্রথমবারের মতো ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি নিয়ে একাডেমির ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। বিকেলে প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
