সরকারের কাছে ২৩ চাওয়া ঢাকা চেম্বারের

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:২১ এএম

ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করাসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নে সরকারের কাছে ২৩টি চাওয়া ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির। ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করার কথা বলেছে সংগঠনটি।

গতকাল সংগঠনটির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরে ডিসিসিআই বলেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ দক্ষতা বাড়ানো ও সরকারের নীতি সহায়তার মাধ্যমে মূলধন ব্যয় কমাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে এক অঙ্কের সুদহারে ঋণ পাওয়ার সহজ ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে বড় অঙ্কের ঋণগুলো সরকার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলে প্রত্যাশা সংগঠনটির। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করার কথা বলেছে ঢাকা চেম্বার। 

ডিসিসিআইয়ের সভাপতি ওসামা তাসীর বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামানোর কোনো বিকল্প নেই। এ নিয়ে ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারের একটি নৈতিক চাপও আছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো বলছে- খেলাপি ঋণের কারণে সুদহার কমাতে পারছে না তারা। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোসহ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ব্যাংক খাতের সংস্কার জরুরি। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই খেলাপি ঋণের কারণে ঋণগ্রহীতাদের এক শতাংশ বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। তাই সুদহার কমাতে হলে খেলাপি ঋণ কমানোর কোনো বিকল্প নেই।

আগামী তিন অর্থবছরে করপোরেট করহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ওসামা তাসীর বলেন, আগামী ২০১৯-২০২০ অর্থবছর ৫ শতাংশ, পরের অর্থবছর ৭ শতাংশ ও ২০২১-২০২২ অর্থবছরে ১০ শতাংশ হারে কমাতে হবে। করপোরেট কর হার কমানো হলে কোম্পানিগুলোর যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কথা বলেছে ডিসিসিআই। মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) ক্ষেত্রে একাধিক হারের প্রস্তাব করে ডিসিসিআই বলেছে, ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অটোমেশন করা, করের আওতার সঙ্গে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া ও ভ্যাট হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে ঢাকা চেম্বার। তৈরি পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন সেল (আরসিসি) গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আরসিসি একটি শিল্প সুরক্ষা ইউনিট হিসেবে পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে অবদান রেখে রপ্তানি বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত ব্যয় ও পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়াতে উৎসাহিত করতে আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব করেছে ঢাকা চেম্বার। ওসামা তাসীর বলেন, এ ধরনের প্রণোদনা মালিকদের কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ও রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে উৎসাহিত করবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণে তৈরি পোশাক খাতের মডেল অন্যান্য খাতে অনুসরণ করার প্রস্তাব করে ঢাকা চেম্বারের নেতারা বলেন, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। জাহাজ নির্মাণ, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হাল্কা প্রকৌশল শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে আর্থিক প্রণোদনা বাড়াতে হবে। রপ্তানিমুখী পণ্যের আনুষঙ্গিক উপকরণ ক্রয়ে কর অবকাশ সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া, পণ্যের মূল্য সংযোজনে উৎসাহিত করতে গবেষণা, ডিজাইন, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।

সকল পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পুনর্গঠন করার প্রস্তাব করে ওসামা তাসীর বলেন, শিক্ষায় শিল্পকেন্দ্রিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি গ্রহণে আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব করে সংগঠনটি বলেছে, চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয়কে কর অব্যাহতি দিতে হবে।

ঢাকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক) মাস্টারপ্ল্যানে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারে। বৃহত্তর ঢাকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ব্যাপক উল্লেখ করে ওসামা তাসীর বলেন, এ জন্য বৃহত্তর ঢাকার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি নিয়ে একটি গবেষণা করা যেতে পারে। ব্যবসা-বান্ধব নীতি প্রণয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের অধীনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ন্যাশনাল কমপেটিটিভ স্ট্র্যাটেজিক অ্যাকশন কমিটি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে সংগঠনটি। এছাড়া, বেজা, বিডা ও বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্র্তৃপক্ষের সমন্বয়ে শক্তিশালী ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার গড়ে তোলার কথা বলেছে সংগঠনটি। অবকাঠামো প্রকল্প তত্ত্বাবধানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মনিটরিং অ্যাডভাইজরি অথরিটি (নিদমা) নামে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কর্র্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করে ঢাকা চেম্বার বলেছে, ওই কমিটিতে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ন্যাশনাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়ন ও পিপিপি প্রকল্পে বেসরকারি খাতের অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সামুদ্রিক যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন ও দক্ষতা বাড়ানো এবং কার্যকর সামুদ্রিক পরিবহন অবকাঠামো তৈরির জন্য ন্যাশনাল মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি নামে একটি একক তত্ত্বাবধানকারী কর্র্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করেছে ঢাকা চেম্বার। সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি ওয়াকার আহমেদ চৌধুরী, সহ-সভাপতি ইমরান আহমেদ ও পর্ষদের পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত