নিমতলীর লেলিহান চকবাজারে

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:০৩ এএম

প্রায় ৯ বছরের মাথায় পুরান ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটল। কাছাকাছি এলাকায় প্রায় একই ধরনের ঘটনায় অন্তত ৭০ জন পুড়ে মরেছে। গত বুধবার রাতে রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টার এই অগ্নিকাণ্ডে আহত হয়েছে কমপক্ষে ৪১ জন। নিহতদের অধিকাংশই পথচারী, দোকানি ও ক্রেতা এবং যানবাহনের যাত্রী। রাত সাড়ে ১০টার দিকে লাগা আগুন ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিটের প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টায় আগুন পুরোপুরি নেভানো ও উদ্ধার অভিযান সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং আহতদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শ্রম মন্ত্রণালয়।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, শিল্প মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের নামে পুলিশ মামলা করেছে বলে জানিয়েছেন চকবাজার থানার ওসি শামীমুর রহমান তালুকদার। ১৪ নন্দ কুমার দত্ত রোডের এই আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহযোগী অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ওয়াহিদ ম্যানসনের কাঠামো দুর্বল। যেকোনো সময় সেটি ধসে পড়তে পারে।’

অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিকল্পধারার চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন, হেফাজতে ইসলামের আমির আহমদ শফী, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অনেকে। শোক জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকে। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, ‘বুধবার মধ্যরাত থেকে একের পর এক লাশ বের করে আনতে থাকে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল। আমরা ৭০টি লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছি। আহত অবস্থায় উদ্ধার করেছি ৪১ জনকে। তাদের মধ্যে ১৪ জন দগ্ধ, যাদের কয়েকজনের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে।’

ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ রাত ৯টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ৬৭ লাশ বুঝে পেয়েছি। এর মধ্যে ৪০টির পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ২৭টি মরদেহ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হওয়ায় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। পরে পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে তাদের লাশ শনাক্ত করা হবে।’ তবে গতকাল দুপুরে প্রথমে গণমাধ্যমের কাছে ৭৮টি লাশ পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। পরে তা সংশোধন করেন। এ কারণে লাশের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আলী আহাম্মেদ খান বলেন, ‘রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে আগুনের খবর পাই আমরা। ১৩টি ফায়ার স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। রাত ৩টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সরু গলি, কাছে পানির উৎস না থাকায় আগুন নেভাতে সমস্যা হয়। তাছাড়া কেমিক্যাল ও পারফিউমের গোডাউন থেকে একের পর এক কৌটা বিস্ফোরিত হয়ে চতুর্দিকে ছড়াতে থাকায় আগুন নেভাতে ব্যাপক বেগ পেতে হয়।’ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ১৪ নন্দ কুমার দত্ত সড়কের বাসিন্দা ফয়েজ উদ্দিন জানান, রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি রাজ হোটেলের সামনে থেকে বাসায় ঢোকার সময় বিকট শব্দে এলাকা কেঁপে ওঠে। একটি পিকআপ ভ্যান বিস্ফোরিত হয়ে উপরে উঠে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় একের পর এক বিস্ফোরণ; এ সময় আশপাশের বাড়িঘর কেঁপে উঠছিল।

আগুনের উৎসের বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন, রাস্তায় থাকা একটি পিকআপ ভ্যানের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুন লাগে। কেউ বলছেন, বিদ্যুতের ট্রান্সমিটার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত। কেউ আবার বলছেন, একটি রেস্তোরাঁর সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাত। এ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল বলেন, ‘আগুনের কারণ নিয়ে এখনো আমরা নিশ্চিত নই। এটা তদন্তসাপেক্ষে বলা যাবে।’ বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, একটি প্রাইভেটকারের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন লাগে আরেকটি পিকআপ ভ্যানে। ওই ভ্যানে ৮-১০টা গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। ওই সিলিন্ডারগুলো একযোগে বিস্ফোরিত হয়। এর কোনো একটির আঘাতে পাশের বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিটারও বিস্ফোরিত হয়। এতে ইলেকট্রিক তারে আগুন লাগে। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের রেস্তোরাঁয়। যেখানে রান্নার জন্য রাখা চারটি বড় গ্যাস সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়।

নিহত ৭০ জনের মধ্যে ৪০ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে দুজন নারী, দুজন শিশু ও ৩৭ জন পুরুষ। এরা হলো রাজু (৩০), তার ভাই মাসুদ রানা (৩৫), সিদ্দিকুল্লাহ (৪৫), আবু বকর সিদ্দিক (২৭), আলী মিয়া (৭৫), মোশাররফ হোসেন (৩৮), কামাল হোসেন (৫২), ইয়াসিন খান রনি (৩২), জুম্মন (৬৫), এনামুল হক (২৮), মজিবর হাওলাদার (৪৫), মুফতি ওমর ফারুক (৩৫), মোহাম্মদ আলী (৩২) ও তার ভাই আবু রায়হান (৩১), তার ছেলে আরাফাত (০৩), ইমতিয়াজ ইমরোজ (২৪), হেলাল (৩০), ওয়াফিউল্লাহ (২৫), সোনিয়া (২৮), স্বামী মিঠু (৩৫), তাদের ছেলে শাহিদ (০৩), রহিম দুলাল (৪৫), হিরা, নাসির, মঞ্জু, আনোয়ার, কাওছার, শায়লা খাতুন, আরমান হোসেন রিমন, মামুনুর রশীদ, আবু তাহের, রুবেল হোসেন, সৈয়দ সালাউদ্দিন, মুসা, ইলিয়াস মিয়া, মিজানুর, আসিফ, মো. হোসেন বাবু, খলিলুর রহমান সিরাজ, নূর ইসলাম হানিফ ও নবীউল্লাহ খান।

সরেজমিনে দেখা যায়, চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পূর্বপাশে ও দক্ষিণ পাশে কমপক্ষে সাতটি ভবন, অর্ধশত দোকান, গোডাউন, দুটি প্রাইভেটকার, দুটি পিকআপ ভ্যান, অন্তত ১০টি মোটরসাইকেল ও তিনটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অনেক রিকশা ও ঠেলাগাড়ি পুড়ে ছাই হয়েছে। আশপাশের বিভিন্ন দোকান ও কারখানায় শত শত বস্তা প্লাস্টিক দানা, প্রসাধন সামগ্রীর লাখ লাখ কৌটা, ভবনের ভাঙা অংশ, কাচ, ইটা ইত্যাদি রাস্তায় পড়ে আছে। মাত্র ৮ ফুট চওড়া সড়কগুলোতে গাড়ি চলাচল দূরের কথা, হাঁটারও উপায় নেই।

আগুনে সড়কের ওয়াহেদ ম্যানসন পুরো পুড়ে গেছে। বিশাল ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ, টেলিফোনের দোকান, ডেকোরেটর, প্লাস্টিক দানার দোকানসহ বিভিন্ন দোকান ও গুদাম ছিল। দোতলার পুরোটাই ছিল প্রসাধনীর গুদাম। তৃতীয় তলার পূর্ব পাশে একটি আবাসিক ফ্ল্যাট ও অন্যপাশে গুদাম ছিল। চতুর্থ তলার পশ্চিম পাশে আবাসিক ফ্ল্যাট ও অন্য অংশে গুদাম ছিল। এসব গুদামের পুরোটাই প্রসাধনসামগ্রীতে ঠাসা ছিল। বিপরীত পাশের ভবনগুলোতে রাসায়নিক দ্রব্য ও প্লাস্টিক দানার দোকান ছিল। পাশের হাজী জামাল সর্দার কমিউনিটি সেন্টারের তিনতলায় ডিএসসিসির অঞ্চল-৩ এর কার্যালয় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভবনের চার ও পাঁচতলায় পুলিশ ব্যারাকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম, পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ঢাকা উত্তরের মেয়র পদপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হকসহ অনেকে। পৃথক তদন্ত কমিটি : অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১২ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন জানান, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মফিজুল হককে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ঢাকা জেলা প্রশাসন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও কেমিক্যাল ব্যবসায়ী সমিতির একজন করে প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে আছেন। বিসিক পরিচালক আব্দুল মান্নান কমিটিতে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক সালেহ উদ্দিন ও উপসহকারী পরিচালক আবদুল হালিম। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন তাদের সদস্য আখতার হোসেনকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করেছে। কমিটিকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ কমিশনের সচিব হিরন্ময় বাড়ৈ, সদস্য মেঘনা গুহঠাকুরতা, কমিশনের সদস্য ও পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল মাহমুদ ফায়জুল কবির এবং উপপরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) গাজী সালাউদ্দিন। এর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর নবাব কাটরায় রাত ৯টার দিকে একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের বিস্ফোরণ ঘটে। তাতে একটি প্লাস্টিক কারখানায় আগুন ধরে যায়। সেখানে বিপজ্জনক কেমিক্যাল ছিল। ফলে আগুনের লেলিহান শিখা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। মুহূর্তে আগুন আশপাশের ভবনে ছড়িয়ে পড়ে ১২৪ জন নিহত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত