প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া মাত্রই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস কাজ শুরু করেছে। আহতদের তাড়াতাড়ি সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাতে খবর এলো চকবাজারে আগুন লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার কাজ শুরু করছে। যারা আহত হয়েছে, তাদের তাড়াতাড়ি সুচিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যারা নিহত হয়েছে, আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাই।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী আদালতের রায় বাংলায় লিখতে বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমি বলব আদালতের রায়টা যদি কেউ ইংরেজিতেও লিখতে চায়, লিখতে পারে। কিন্তু একটা শর্ত থাকবে এটা বাংলা ভাষাতেও প্রকাশ করতে হবে। যিনি রায় পাবেন, তিনি যেন পড়ে জানতে পারেন। ইংরেজিও রোমান স্টাইলে না লিখে একটু সহজ ইংরেজিতে লেখা, অন্তত যে ভাষা সবাই বুঝতে পারে, সে ভাষাটা লেখা উচিত। আর বাংলায় রায় লিখে ইংরেজিতে ভাষান্তর করে দিতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইংরেজি যে রায়টা দেওয়া হয়, সেই রায়ে কী বলল তা জানতে নির্ভর করতে হয় আইনজীবীর ওপর। আইনজীবী যা বুঝিয়ে দেবেন, সেটাই বুঝতে হবে, নিজে পড়ে জানার কোনো সুযোগ থাকে না। অনেক সময়েই তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। অথবা তাদের অন্যভাবে ব্যবহারও করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে এখন না হয় আমরা শিক্ষার হার বাড়িয়েছি। কিন্তু ’৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি, তখন অক্ষর জ্ঞানসম্পন্নই ছিল মাত্র ৪৫ ভাগ। অধিকাংশ মানুষ বাংলা ভাষাতেও লেখাপড়া জানত না।
মাতৃভাষা ভালোভাবে শেখা ও চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা, মাতৃভাষা জানাÑ এটা অপরিহার্য। আজকের বিশ্বÑ গ্লোবাল ভিলেজ। আমাদের ভাষাগতভাবে যোগাযোগটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সব দেশে কিন্তু নিজের ভাষা শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একটা দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা নেয়। কাজেই দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে অন্য ভাষা শেখার সুযোগ কিন্তু আমাদের দেশে আছে। এরমধ্যে ৯টি ভাষা দিয়ে একটি অ্যাপস তৈরি করে দিয়েছি আমরা। দেশ এখন ডিজিটাল। ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, ইংরেজি একটা মাধ্যম হয়ে গেছে সারা বিশ্বে। কাজেই আমাদের দেশে এটা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সবাই শিখতে পারে। বাংলা ভাষা, মাতৃভাষা, যে ভাষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি, সেই ভাষাটাও সবাই যাতে ভালোভাবে বুঝতে পারে; শেষে সেই ব্যবস্থাটাও করা একান্তভাবে প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’
শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বাংলাদেশে একেক অঞ্চলে একেক ধরনের কথা বলি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা অফিসিয়াল একটা ভাষা ব্যবহার করি। যে ভাষাটা প্রমিত বাংলা, এর মধ্যে আমাদের বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে। সেজন্য বাংলা একাডেমিকেও ধন্যবাদ জানাই। তবে আমরা যারা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করি, সেটাকে একেবারে বাদ দেওয়া ঠিক নয়। বাদ দিলে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বই থাকে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন করেছিলাম। আর এ সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ’৪৮ সালে, যখন আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। আমরা বাঙালি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। কিন্তু সেই বাংলায় আমাদের কথা বলতে না দিয়ে বাংলা ভাষাকে কেড়ে নেওয়ার একটা চক্রান্ত শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র হয়, যার দুটি অংশ। চারটি প্রদেশ। চার দেশে চার ধরনের ভাষা। আর উর্দুকে একটা কমন ভাষা হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। আসলে তারা উর্দুকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। আমরা যারা এই ভূখণ্ডে বাস করতাম। আমাদের ভাষা কেড়ে নিয়ে একটা বিজাতীয় ভাষা ছড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করা হয়। আর সেই চক্রান্তের বিরুদ্ধে ’৪৮ সালে আন্দোলন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, বুধবার রাত পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের সামনে একটি পিকআপের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আশপাশের ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট সাড়ে চার ঘণ্টার মতো কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়।
