নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে পেরেছিলাম

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:১২ এএম

এখনো তিনি গল্প। দীর্ঘদিন ছিলেন ‘বেগম’র আলোকচিত্র সাংবাদিক। ব্রিটেনের রানী, সত্যজিৎ রায়, ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখ মানুষের যেসব ছবি তুলেছিলেন, ছবি তোলার সেই কাহিনীগুলো আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে।  সাইদা খানম বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী। তার ফটোগ্রাফি জীবনের গল্প শুনেছেন ইয়াসিন হাসান। ছবি তুলেছেন নূর

ছবি তোলার জন্য ইচ্ছে, ভালোবাসা কীভাবে জন্মাল?

আমার খালা প্রয়াত কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ছবি ওঠাতে ভালোবাসতেন। তাই আমাদের বাড়িতে প্রায়ই ক্যামেরাম্যান আসতেন, ছবি তুলতেন। তখন আমার বয়স ৭ কি ৮ বছর। প্রথম দিকে ক্যামেরা দেখে আমি ভয় পেতাম। কিন্তু এই ছবি তোলা দেখে আস্তে আস্তে নিজের মধ্যে আগ্রহ জন্মালো। এভাবেই ছবি তোলার প্রতি আমার ইচ্ছে ও ভালোবাসা জন্মায়।

প্রথম কবে ক্যামেরা হাতে নিয়েছিলেন? কে দিয়েছিলেন?

তখন হয়তো আমার বয়স ১৩ বা ১৪। ‘সংবাদ’ সম্পাদক প্রখ্যাত সাংবাদিক জহুর হোসেন চোধুরীর স্ত্রী ও ঢাকার টিকাটুলির বিখ্যাত কামরুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা লুৎফুন্নেসা চৌধুরী ছিলেন আমার বড় বোন অধ্যাপক হামিদা খাতুনের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনিই আমাকে ছবি তোলার জন্য তার ক্যামেরাটি দিয়ে দিলেন। নামটি এখন মনে পড়ছে না।

প্রথম তোলা ছবির গল্প?

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গল্প ‘কাবুলিওয়ালা’ পড়ে তাদের প্রতি খুব আগ্রহ জন্ম নিলো। ফলে কলকাতার বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের সামনে সেই সময়েই একজন কাবুলিওয়ালার ছবি তুলেছি। নাম রেখেছিলাম, ‘কাবুলিওয়ালা’। সেই আমলে মেয়েদের কাজের সুযোগ একেবারেই কম ছিল। তারপরও আলোকচিত্রের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও অন্যরকম পেশায় কীভাবে গেলেন? আমার মা ও কবি খালা প্রগতিশীল নারী ছিলেন বলে তাদের প্রগতিশীল ভাবনা আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে। ফলে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে আমি নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে পেরেছিলাম। আর পরিবার থেকে সবসময়ই আমি সহযোগিতা পেয়েছি।

জায়েদী স্টুডিও’র মালিক জায়েদী সাহেবের কোনো অবদান ছিল আপনার এই জীবনে? তখন আমাদের ঢাকায় মাত্র দুটি স্টুডিও ছিল, একটি জায়েদী স্টুডিও। প্রথম যখন আমি নিজের তোলা ছবি এই স্টুডিওতে প্রিন্ট করাতে নিয়ে গেলাম, সেটির মালিক ছিলেন জায়েদী ভাই। তিনি আমার ছবি দেখে বিমুগ্ধ হয়ে গেলেন। সেদিন থেকে আমাদের পরিচয়। তিনি আমাকে পছন্দ করতেন, আমার কাজ তার ভালো লাগত। তিনি চাইতেন আমি যেন ছবি তুলি। আমাকে তিনি নানা দেশের ফটোগ্রাফিক ম্যাগাজিনগুলো সংগ্রহ করে দেখতে বলতেন। আরও নির্দিষ্ট করে সেগুলোতে ছাপা ছবিগুলোর এক্সপোজার দেখতে বলতেন। নিজেও অবসরে আমাকে ছবিগুলো

কীভাবে তোলা হয়েছে, সেগুলোর মানে কী তা বুঝিয়ে দিতেন। তিনিই

প্রথম আমার ছবি জার্মানির ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড কোলন প্রাইজ’-এ পাঠিয়েছেন।

কর্মসূত্রে প্রথম কোন পত্রিকায় যোগ দিয়েছিলেন?

‘বেগম’ সম্পাদক নূরজাহান বেগম কলকাতা থেকে ১৯৫০ সালে ঢাকায়

চলে এলেন। তখন থেকে আমাদের পরিচয়। সে সূত্রে নারী জাগরণের অগ্রদূত ‘বেগম’-এ ১৯৫৬ সালে যোগদান করার সুযোগ হয়েছিল। তিনি আমাকে নিজের ছোটবোনের দেখতেন, খুব স্নেহ করতেন। সবসময় আমাকে কাজে সহযোগিতা করতেন। আমার কাজের প্রতি তার অগাধ আস্থা ছিল। এই পত্রিকায় আমাকে কাজের পুরো স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। অন্য সহকর্মীদের কাছ থেকে সবসময় উৎসাহ ও সমর্থন পেয়েছি। অনেক বছর বেগমের হয়ে কাজ করেছি। ফটো সাংবাদিক হিসেবে যোগ দিয়েই ১৯৫৬ সালে জার্মানির কোলন প্রাইজ পেয়েছিলাম। ফলে খুব খুশি হয়েছিলাম। কাজে উৎসাহ শতগুণ বেড়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছে, আমাকে আরও অনেক ভালো কাজ করতে হবে।

‘সওগাত’ সম্পাদক ও নূরজাহান বেগমের বাবা নাসির উদ্দিন সাহেবকে কী চোখে দেখতেন?

(সামান্য হেসে) এটি একটি জটিল প্রশ্ন। তবে মানুষ, সাংবাদিক হিসেবে তিনি খুব ভালো ছিলেন। তিনি খাওয়াতে পছন্দ করতেন।

বেগম-এর অন্যতম স্মরণীয় ইন্দিরা গান্ধীর ছবিটি কীভাবে তোলা?

এটি হয়তো ১৯৮৪ সালের দিকে তোলা ছবি। বেগমের ফটোগ্রাফার হিসেবে আমি নয়াদিল্লির একটি সম্মেলনে যোগ দিলাম। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে হাত মেলানোর বিরল সুযোগ হয়েছিল। তখন তাকে অনুরোধ করে ছবিটি তুলেছিলাম। বাংলাদেশ থেকে আমি এসেছি জেনে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন।

আর মার্শাল টিটো?

এই যুগোসøাভ কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও রাষ্ট্রনায়ক স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশে এলে প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবে এই ছবিটি তোলা হয়েছে।

মহানায়ক উত্তম কুমারের ছবি তোলার গল্প?

পশ্চিম বাংলার টালিগঞ্জে তার শুটিং স্পটে ছবি তোলার জন্য গিয়েছিলাম। অনবদ্য এই নায়ক তখন চেয়ারে বসে বিশ্রাম করছেন। ছবি তুলতে চাই বলতেই তিনি রাজি! তাকে ছবির প্রয়োজনে শুটিং স্পটের বাইরে অল্প রোদে আসতে অনুরোধ করলাম। তিনি এলেন। উত্তম কুমার খুব অমায়িক, ভদ্রলোক ছিলেন।

আপনার ও সত্যজিৎ রায়ের সম্পর্ক তো একটি গল্প?

মানিকদা (সত্যজিৎ রায়ের ডাকনাম)’র সঙ্গে আমার সম্পর্কটি বহুদিনের পুরনো ছিল। আমি তার খুব প্রিয় পাত্রী ছিলাম। মানিকদা আমাকে ছোটবোনের মতো স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। আমি তার যখন যেভাবে ছবি তুলতে চেয়েছি, তিনি রাজি হয়েছেন, কোনোদিন এতটুকু আপত্তি করেননি। বৌদি (বিজয়া রায়) ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গেও আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। মানিকদা ও তার পরিবারের সঙ্গে আমি অনেক বিরল আনন্দের ক্ষণ কাটিয়েছি। মানিকদা আমাকে ‘বাদল’ নামে ডাকতেন। এ আমার ডাকনাম হলেও মানিকদাই এ নামে বেশি ডাকতেন।

কোন ছবিটি তুলতে সবচেয়ে কষ্ট হয়েছে?

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর শুনলাম পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে চাইছে। ফলে ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে ছবি তুলতে গেলাম। কিন্তু তখন পাকিস্তানি সেনারা সেখানে গোলাবর্ষণ শুরু করলো। আমরা কয়েকজন একটি গাছের পেছনে আশ্রয় নিলাম। অপরিচিত এক ভদ্রলোক আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্য শুয়ে পড়তে পরামর্শ দিলেন। বললেনও, মেশিনগানের গোলাবর্ষণের মাঝে বিরতি দেখলে পালিয়ে জীবন বাঁচাবেন। আমরা তাই করলাম এবং বিরতিতে তিনটি প্রাচীর টপকে পালিয়ে এলাম। ফলে ছবিটি তোলা হলো না। তবে ভালো লেগেছে এই ভেবে, পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করলেই আমার দেশ স্বাধীন হবে। এখনো সেই ক্ষণটির কথা মনে পড়লে ভালো লাগে। দেশের প্রতি ভালোবাসা জন্মে, দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।

দীর্ঘকাল একমাত্র নারী আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে অসুবিধা হয়েছে?

পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। তারা আমাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন, আমার কাজের প্রশংসা করেছেন। তবে ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় আমি তাদের কাউকে ছাড় দিইনি।

এখন অনেক নারী আলোকচিত্র সাংবাদিকতা করছেন। তাদের জন্য পরামর্শ?

ভালো করে, ভালোভাবে ‘ফটোগ্রাফি’ শিখতে হবে। পেশাগত কারণে নয়, বরং শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ছবি তুলতে চাইতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। এই পেশায় ভালো করতে হলে অনেক সাহস, ধৈর্য থাকতে হবে। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে।

এবার ‘একুশে পদক’ পেলেন। আরও পেয়েছেন জীবনে। কোনটি সেরা?

প্রত্যেকটি পুরস্কারই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিজের চোখে সেরা হলো, আমার ছবি দেখে সত্যজিৎ রায়ের প্রশংসা বাক্য।

লেখালেখির ভুবন আছে, সমাজসেবাও করেন।

লিখতে আমার ভালো লাগে। গল্প, ভ্রমণ কাহিনী লিখি। একজন নাগরিক হিসেবে সবার কাছেই সমাজসেবা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। কারণ যে সমাজে আমরা বাস করছি, সেখানে অবদান রাখতে পারা নাগরিক, সমাজের একজন মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য বিরাট কিছু। মানুষ হয়ে মানুষের জন্য কাজ করা প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সে দায়িত্ব ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই সমাজসেবা করেছি। বন্যাসহ নানা দুর্যোগে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি ।

কোনো ইচ্ছের কথা জানাবেন?

সবাই যেন সবার দায়িত্ব অনুসারে, নিজের কাজকে ভালোবেসে সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করতে পারি। তাহলেই সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে পারব। নারী, গ্রামের মানুষদের আরো শিক্ষিত করার দিকে সবার নজর দেওয়া প্রয়োজন। তারা অনেক পিছিয়ে আছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবশ্যই প্রতিটি মানুষের ভেতরে জাগিয়ে তুলতে হবে। তাহলে আমরা জাতি হিসেবে আরও এগিয়ে যাব। আমি একটি সুন্দর বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি। এখন আমার ঘুরে বেড়াতে খুব ইচ্ছে করে, খুব ভালোও লাগে।

আপনার শরীর কেমন?

আমি শারীরিকভাবে সুস্থ আছি।

(১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, বনানী, ঢাকা)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত