চকবাজারের চুড়িহাট্টার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত পাঁচটি তদন্ত কমিটি। তারা এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য নেন ও আলামত সংগ্রহ করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্র্তৃপক্ষের (ডিপিডিসি) কমিটির সদস্যরা সেখানে বলেন, কেমিক্যাল থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়ায়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তদন্ত কমিটির সদস্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লেফটেন্যান্ট এস এম জুলফিকার রহমান ঘটনাস্থলে বলেন, ‘ভবনগুলোতে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। ওয়াহেদ ম্যানশনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের ড্রাম ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্যপদার্থ। পারফিউমের বোতলও রিফিল করা হতো সেখানে। এ ছাড়া আরও কেমিক্যাল ছিল। প্রত্যেকটা জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমার মতো কাজ করেছে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তদন্ত দলের সদস্য বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার পুরোটাতেই গোডাউন ছিল। প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর এই ভবন নির্মিত হলেও সিঁড়ির পরিমাণ যথেষ্ট ছিল না। আগুন নেভানোর কোনো ইকুইপমেন্ট নেই, ভবনগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়তো সিলিন্ডার বিস্ফোরণে, কিন্তু কেমিক্যালের কারণেই আগুনটা এত ছড়িয়েছে। ওয়াহেদ ম্যানশনের গ্রাউন্ড ফ্লোর ও দোতলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার বিম ও কলামগুলো ততটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এক সপ্তাহ পর জানা যাবে, ভবনটি আদৌ ব্যবহারের উপযোগী কি না।
এই তদন্ত কমিটির প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, আগুনে যে পাঁচটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মধ্যে তিনটি ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ব্যবহার না করার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউকের) অনুমোদিত কি না তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি রাজউকের অথরাইজড অফিসার মো. নুরুজ্জামান জহির। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সরকারি ছুটি থাকায় কাগজপত্র দেখা সম্ভব হয়নি। একটির সঙ্গে মিশিয়ে আরেকটি ভবন নির্মাণের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে জহির বলেন, ‘আপনাকে বুঝতে হবে এটা পুরান ঢাকা। এখানে অনেক আগে থেকেই ভবন তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজউক অনেক দিন ধরে কাজ করছে। তবে সবার আগে দরকার সচেতনতা।’
সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ রঞ্জনের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। কমিটির সদস্য পুলিশের লালবাগ জোনের উপকমিশনার ইব্রাহিম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত করব, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আদালতের কাছে সুপারিশ করব।’
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান সামসুল আলম বলেন, ‘ট্রান্সফরমার, গ্যাস সিলিন্ডার অথবা কেমিক্যালের যেকোনো একটি থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমরা কয়েকটি গাড়ি চেক করেছি। অনেকেই দুর্ঘটনাস্থলে থাকা যে পিকআপটির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলেছিল সেই পিকআপের সিলিন্ডারটি কিন্তু অক্ষত অবস্থায় আছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা গেছে, এই এলাকায় বেশ কিছু কেমিক্যালের দোকান রয়েছে। তাছাড়া ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচে কিছু প্লাস্টিকের দানার দোকান ছিল। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা যে সিলিন্ডারের লাইসেন্স দেই সেটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক দুই কারণেই দেই। কিন্তু কোন এলাকায় কী পরিমাণ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি থাকবে সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। সেটি দেখে রাজউক।’
ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ থেকে চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) এমডি বিকাশ দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘আগুনে তিনটি বিদ্যুতের খুঁটি ও বৈদ্যুতিক তার পুড়ে গেছে। চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনের ঘটনায় কোনো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ডিপিডিসির পক্ষ লালবাগ জোনের প্রকৌশলী সারোয়ার কায়নাত ও প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মুকুলের সমন্বয়ে দুই সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তাদের আজ শনিবারের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
দেবাশীষ বর্মণের নেতৃত্বে ফায়ার সর্ভিসের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিও ঘটনাস্থলে যায়।
