আমির হোসেন আমু শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনোকিছুই করতে পারেনি শিল্প মন্ত্রণালয়। ২০১০ সালে রাজধানীর নিমতলীতে রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকা-ের ঘটনায় ১২৪ জন নিহত হওয়ার পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরাতে একটি প্রকল্প নিতেই নিজের মেয়াদের প্রায় পুরোটা শেষ করেছেন তিনি। এমনকি সাভারে ট্যানারি শিল্পপার্ক করা সত্ত্বেও হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরাতে ব্যবসায়ীদের বারবার মেয়াদ বাড়িয়ে সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। অগত্যা ২০১৭ সালের মার্চে উচ্চ আদালত হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোতে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দেওয়ার পর ট্যানারি মালিকরা বাধ্য হয়ে সাভার যাওয়া শুরু করেন। পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক শিল্প সরাতে কেরানীগঞ্জে নেওয়া প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হয়েছে গত ৩০ নভেম্বর, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে। পুরান ঢাকা থেকে প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা সরাতে নেওয়া প্রকল্প গ্রহণেও দীর্ঘ সময় অপচয় করার অভিযোগ রয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন, ব্যবসায়ী ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আপত্তির কারণে পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক শিল্প সরানো সম্ভব হয়নি। সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়াও গতকাল চকবাজারে অগ্নিকা-স্থল পরিদর্শনে গিয়ে আমুর দিকে আঙুল তুলে বলেছেন, রাসায়নিক সরাতে তিনি কোনো কাজই করেননি। তিনি গুরুত্ব দিয়ে চেষ্টা করলে এই দুর্ঘটনা হয়তো ঘটত না।
২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘সাফল্যের ১০ বছর’ শিরোনামে শিল্প মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা শিল্প মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক পণ্যের গুদাম ও কারখানা সরাতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি শিল্প মন্ত্রণালয়। শেষ পাঁচ বছরে শিল্প মন্ত্রণালয় রুটিন কাজের অংশ হিসেবে সিআইপি দেওয়া, শিল্প নীতি প্রণয়ন, সভা-সমিতির আয়োজন ছাড়া বড় যেসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে, তার বেশির ভাগ কাজই শুরু হয়েছিল ২০০৯ থেকে ২০১৪ মেয়াদকালে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১০ বছরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই সময়ে মন্ত্রণালয়টি ৫৭টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে, যার ১২টি সমাপ্ত হয়েছে ২০১৪ সালের মধ্যে। বাকি পাঁচ বছরে মাত্র তিনটি প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে। বাকি ৩২ প্রকল্প এখন চলমান রয়েছে। এই ৩২টি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ২০১৪ সালে আমির হোসেন আমু শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে। এর মধ্যে ১৫টি প্রকল্পের বাস্তবায়ন ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো শেষ করতে পারেনি শিল্প মন্ত্রণালয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে বিসিক শিল্পনগর গড়ে তোলার প্রকল্প শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০১৬ সালে তা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হয়নি। পরে ২০২০ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ২০১১ সালে বরগুনায় বিসিক শিল্পনগর স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৩ সালে নেওয়া চামড়াশিল্প নগরীর কাজ ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার কথা তুলে ধরেছে খোদ শিল্প মন্ত্রণালয়ই তাদের সাফল্যের পুস্তকে।
ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় অভিযোগ করে বলেছেন, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর হলেও সেখানে এখনো কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) গড়ে ওঠেনি। ফলে বুড়িগঙ্গার দূষণরোধের কারণে ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর করা হলেও তার সুফল মিলছে না। এখন সাভারের ট্যানারির বর্জ্যে ধলেশ্বরীতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া, সাভার ট্যানারিপল্লীতে ভারী যানবাহন চলার মতো রাস্তাঘাটও নির্মাণ করা হয়নি।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১০ বছরের সাফল্যের বর্ণনায় যেসব কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- যার মধ্যে রয়েছে শাহজালাল ফার্টিলাইজার প্রকল্প। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী এ সার কারখানা উদ্বোধন করেন। মূলত এ প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজ সরকারের আগের মেয়াদেই সম্পন্ন হয়। গত মেয়াদে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা প্রকল্পের ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন পেলেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি এখনো। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ওষুধশিল্পের জন্য স্থাপিত এপিআই শিল্প পার্কও আওয়ামী লীগ সরকারের ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে বাস্তবায়ন হয়েছে। চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্স পুনরায় চালুর কাজও ওই মেয়াদেই সম্পন্ন হয়েছে। ২০১১ সালে জাহাজ ভাঙা, নির্মাণকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে এ শিল্পের জন্য আলাদা একটি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু এ শিল্পের জন্য একটি আইন প্রণয়ন করতেই ২০১৮ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় শিল্প মন্ত্রণালয়কে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক বিনিয়োগের অবদান, মূল্য সংযোজন, রপ্তানি ও কাঠামোগত উন্নয়ন সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করার মাধ্যমে একটি বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে’ সর্বশেষ ২০১২ সালের মার্চে ঢাকায় একটি কর্মশালা আয়োজন করে শিল্প মন্ত্রণালয়। ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১০ বছরে মোট ১৯টি বহুজাতিক সেমিনার আয়োজন করে শিল্প মন্ত্রণালয়, তাতে ১৫২ জন বিদেশি ও ১০৫ জন দেশীয় প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি জানান, ২০১৪ সালের ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্প মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে যান। ওই সময় তিনি শিল্পোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া, নতুন কারখানায় ইটিপি স্থাপন, নগরায়নের মাস্টারপ্ল্যানে শিল্পের জন্য জায়গা নির্ধারণ এবং জেলা-উপজেলার মাস্টারপ্ল্যানে কোন স্থানে শিল্প এলাকা স্থাপিত হবে তা চিহ্নিতকরণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিলেও গত পাঁচ বছরে তার বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি
