মেহেদির রং না মুছতেই স্বামী পুড়ে কয়লা

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৫২ এএম

গত ২৮ জানুয়ারি ধুমধাম করে বন্ধুর ছেলের সঙ্গে মেয়ে আফরুজা সুলতান স্মৃতির (২৪) বিয়ে দেন বাবা আবুল খায়ের। ভালোই চলছিল মেয়ের নতুন সংসার। কিন্তু হঠাৎই হলো ছন্দপতন। গত বুধবার রাতে চকবাজার ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারান জামাতা মাহবুবুর রহমান রাজু (২৭) ও তার বড় ভাই মাসুদ রানা (৩৮)। আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া এই দুই ভাইকে দাফন করা হয়েছে গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার স্বামী পুড়ে কয়লা দক্ষিণ ঘোষকামতা গ্রামে। জামাতাকে হারিয়ে এখন বিলাপ করছেন আবুল খায়ের। গতকাল শনিবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘এটাই কি ছিল কপালে! কত ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। এক মাস না যেতেই মেয়ে আমার বিধবা হলো।’ চকবাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আবুল খায়ের আরও বলেন, ‘আগুনের খবর পেয়ে আমি ছুটে যাই। কিন্তু দোকানের কাছেই যেতে পারিনি। পরে শুনেছি আগুনের ভয়ে তারা দোকানের শাটার  বন্ধ করে দিয়েছিল। আর বের হতে পারেনি।’ রাজুর মামাশ্বশুর বরকতউল্লাহ বলেন, ‘অল্প কয়েক দিন হলো ওদের বিয়ে হয়েছে। আর এরই মধ্যে আল্লাহ তাকে নিয়ে গেল। মাইয়াডা কেমনে থাকব একমাত্র আল্লাহই জানে।’ আগুনের ঘটনার দুই দিন আগেও রাজুর সঙ্গে কথা হয়েছিল জানিয়ে বরকতউল্লাহ আরও বলেন, ‘রাজু খুব ভালো ছেলে ছিল। বিয়ের আগে থেকেই আমি ওকে চিনতাম। মূলত বিয়ের সব আয়োজন আমিই করেছিলাম।’ এদিকে স্বামী রাজুর মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে পাগলপ্রায় স্ত্রী স্মৃতি। এখনো মোছেনি তার হাতে বিয়ের সময় লাগানো মেহেদির রং। বিয়ের ২৫ দিনের মাথায় বিধবা হওয়া স্মৃতি প্রায়ই মূর্ছা যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে শুরু করেন কান্নাকাটি। শ্বশুরবাড়ির লোকজনসহ প্রতিবেশীরা ব্যর্থ সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে তাকে।    রাজধানীর আজিমপুর গার্লস কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা স্মৃতির। ছোটবেলা থেকে পরিবারের সঙ্গে পুরান ঢাকায় থাকেন তিনি। তারও গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে।

রাজুরা তিন ভাই। রানা টেলিকম নামে তাদের একটি দোকান ছিল। বড় ভাইকে নিয়ে বাবা-মাসহ ঢাকাতেই চুরিহাট্টার পাশের একটা ভবনে থাকত। গতকাল শনিবার সোনাইমুড়ী ঘোষকামতা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় আরেক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দুই ছেলে রাজু-রানার জোড়া কবরের পাশে বসে আর্তনাদ করছিলেন তাদের বৃদ্ধ বাবা সাহেব উল্ল্যা (৭৫)। তিনি বিলাপ করে বলছিলেন, ‘আমার জোড়া মানিক কই, আমার দুইটা মানিক কই? আমার সোনা মানিক কই? আমাকে কে কবর দেবে? তোরা তো আমার আগে যাওয়ার কথা নয়!’

সাহেব উল্ল্যার বড় ছেলে রানা বিয়ে করেছিলেন পাঁচ বছর আগে। তার সংসারে আছে তিন বছর বয়সি ছেলে রাতুল। নাতি রাতুলকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠে সাহেব উল্ল্যা বলতে থাকেন, ‘সবাই আমার ছেলেদের আইনা দাও। আমার এখন কী হবে? আমি কারে নিয়ে বাঁচব। আমার পরিবার এখন কে দেখবে? আমার নাতিরে দেখবে কে?’ সাহেব উল্ল্যা জানান, মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে পুরান ঢাকার চকবাজারে থাকেন তিনি। নিজে একসময় ব্যবসা করতেন। এখন কিছু করেন না। নিহত দুই ছেলের উপার্জনেই সংসার চলত। ছোট ছেলে খলিলুর রহমান মিরাজ পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মিরাজ বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম। খবর পেয়ে আগুনের কাছে যাই। গিয়ে দেখি আমাদের দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমি চেষ্টা করেও ওই এলাকায় ঢুকতে পারিনি। সারা রাত চকবাজার এলাকায় বসে ছিলাম। পরে সকালে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে লাশ শনাক্ত করি।’ গত বুধবার রাতে রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ আগুনে চারতলা ওয়াহেদ মঞ্জিলসহ পাঁচটি ভবন পুড়ে যায়। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ গেছে কমপক্ষে ৬৭ জনের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত