চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশকে অবাক তাকিয়ে দেখবে বিশ্ব

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৩:১০ এএম

চট্টগ্রামে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ও বাংলাদেশের প্রথম টানেল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি কোনো নাম চাই না, কিছুই চাই না। কেবল দেশের গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করে যাই। দেশকে এমনভাবে গড়ে তুলব, যাতে গোটা বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। বাংলাদেশের মানুষকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি, পারবে না। বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে দেখবে আগামীর উন্নত বাংলাদেশ। গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল ও লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের উদ্বোধন শেষে সৈকত ঘেঁষে নির্মাণাধীন মেরিন ড্রাইভ (রিং-রোড) এলাকায় আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি।

এর আগে বেলা সোয়া ১১টায় তিনি বঙ্গবন্ধু টানেল খনন (বোরিং) কার্যক্রম পরিদর্শন করেন ও কম্পিউটারাইজড সুইচ টিপে এই দুটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। সেতু বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম কর্ণফুলীর তলদেশে চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় টানেল নির্মাণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।

পরে সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হলে জিডিপিতে বহু পয়েন্ট যোগ হবে। জিডিপিকে আমরা ডাবল ডিজিটে নিয়ে যাব। ২০২১ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাবে। ২০২১-২২ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে পালন করা হবে এবং ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে শামিল হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে আজ বঙ্গবন্ধু টানেলের খননকাজের উদ্বোধন করলাম।

পদ্মা সেতু নির্মাণে বিপুল আগ্রহ দেখিয়ে পরে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংকের পিছটান দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের কাছে দুর্নীতির প্রমাণ চেয়েছিলাম। তারা কোনো দুর্নীতির প্রমাণ দিতে পারেনি। অনেকেই তখন ভেবেছিল, বিশ্বব্যাংক ছাড়া পদ্মা সেতু হবে না। আমরা নিজস্ব অর্থায়নে তা করে দেখিয়েছি।

তিনি বলেন, আমার নামে পদ্মা সেতু নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু আমি সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেছি, পদ্মা সেতুর নাম পদ্মা সেতুই হবে। কারণ, আমি কোনো নাম চাই না। আমি চাই এদেশের কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না, শিক্ষার বাইরে থাকবে না। প্রতিটি গ্রাম শহরের সুবিধা পাবে। প্রত্যেক নাগরিক শহরের সমান সুবিধাভোগ করবে। আমি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণ ও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আর তা করতে পারলেই নিজেকে সার্থক মনে করব।

শেখ হাসিনা বলেন, দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমাদের দেশের লোক আমাদের বদনাম করে। আমাদের দুটি স্বনামধন্য পত্রিকার যারা এডিটর প্লাস মালিক, সাথে আপনাদের চট্টগ্রামের এক সন্তান আছে, নোবেল..., সুদের ব্যবসা করে জনগণের টাকা খেয়ে...সেই সুদখোর আর এডিটররা মিলে গিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টে আমাদের বিরুদ্ধে সমানে অপপ্রচার। আর হিলারি ক্লিনটনের (সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) কাছে ইমেইল পাঠিয়ে পাঠিয়ে নানাভাবে যোগাযোগ করে। কাজেই পদ্মা সেতুকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গোটা চট্টগ্রাম অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। তাই চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নিজস্ব অর্থায়নে সরাসরি মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ করব। এতে চট্টগ্রামের সৌন্দর্য আরও বহুগুণে বেড়ে যাবে। টানেল নির্মাণের পাশাপাশি আনোয়ারা থেকে পটিয়া বাইপাস পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার ৪ লেনের সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও টানেল নির্মিত হলে চট্টগ্রামের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তা বিরাট ভূমিকা রাখবে।

কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংকে ধন্যবাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের সহায়তার কারণেই এই মহাযজ্ঞ শুরু করতে পেরেছি। বর্তমান টানেল প্রকল্পের বাস্তবায়নকাজ সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলছে। বাস্তব ভৌত অগ্রগতি ৩২ শতাংশ। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন সড়ক টানেল নির্মাণ প্রকল্প হচ্ছে বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নদীর নিচে প্রথম টানেল নির্মাণ প্রকল্প। ২০১০ সালে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলাম।

২০১৪ সালের জুন মাসে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে একটি সড়ক টানেল নির্মাণের জন্য চীনের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। চীন সরকার চায়না কমিউনিকেশন কোম্পানিকে টানেল নির্মাণের কাজ দেয়। পরে ২০১৫ সালের ৩০ জুন টানেল নির্মাণের জন্য চীনের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হয়। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর টানেলটির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয়।

কর্ণফুলীর তলদেশে মূল টানেলটি দুটি টিউব সম্বলিত ও ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড। ৭২৭ মিটার ওভার ব্রিজসহ এই টানেলটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলাকে শহরাঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৯ হাজার ৮৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থসহায়তা ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং চীন সরকারের অর্থসহায়তা ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে এই টানেল নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা।

লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্ণফুলী টানেল নির্মিত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব প্রান্তের প্রস্তাবিত শিল্প এলাকার উন্নয়ন তরান্বিত হবে। পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত চট্টগ্রাম শহর, চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ ও উন্নত হবে। ফলে পূর্ব প্রান্তের শিল্প-কারখানার কাঁচামাল ও প্রস্তুতকৃত মালামাল চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর ও দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবহন সহজ হবে। এ যোগাযোগ মূল চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে হবে। ফলে ভ্রমণে সময় ও খরচ কমবে এবং চট্টগ্রাম শহরের যানজট উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। কর্ণফুলী টানেল নির্মিত হলে এলাকার আশপাশে শিল্পোন্নয়ন, পর্যটনশিল্পের বিকাশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটবে। এতে করে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়ে এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করবে।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সেতু বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ও বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত জেং হুয়া বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন। অন্যদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, স্থানীয় সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানরা, রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি-বেসরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সেতুমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু টানেল হচ্ছে আব্রাহাম লিঙ্কন টানেলের আদলে। এই টানেল নির্মিত হলে চীনের সাংহাইয়ের চট্টগ্রাম হবে কর্ণফুলীর দুই তীর নিয়ে ‘ওয়ান সিটি-টু টাউন’। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার চার লেনের সড়ক নির্মাণকাজ শিগগিরই শুরু হবে জানিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রশস্তকরণ ও সেখানে পর্যটকদের বিনোদনকেন্দ্র করা হবে।

সমাবেশে চীনা রাষ্ট্রদূত জেং হুয়া বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটিই হচ্ছে প্রথম টানেল। এ কাজে সম্পৃক্ত থাকতে পেরে তার দেশ গর্বিত। বাংলাদেশের উন্নয়নে চীন সর্বদা পাশে থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত