রাজধানীর চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ ১৯ লাশ এখনো বিভিন্ন হাসপাতালের হিমাগারে রয়েছে। নিহতদের স্বজন দাবি করেছে ২১টি পরিবার। ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই পরিবারগুলোর মোট ৩২ জনের ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড) নমুনা ল্যাবে মেলানো হবে। লাশ ও স্বজনদের কাছ থেকে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনার প্রোফাইল তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডি বলছে, মোট ২১ লাশের জন্য ৩৮ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এখান থেকে দুটি লাশ চিহ্নিত করে স্বজনকে বুঝিয়ে দেওয়ায় ওই দুই পরিবারের ছয়জনের ডিএনএ নমুনা মেলানোর দরকার হবে না। এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গের সামনে বাংলাদেশে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অস্থায়ী ক্যাম্পের তথ্যমতে, ওই ১৯ লাশের দাবিদার ১৮টি পরিবার।
গতকাল সোমবার বিকালেও নিখোঁজ নুরুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহ ভোলার চরফ্যাশন থেকে ঢামেকে আসেন। ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডের এক দিন আগে থেকে নুরুল নিখোঁজ থাকায় তার ডিএনএ নমুনা গ্রহণ না করে থানায় জিডি করতে বলা হয়েছে বলে জানান মোহাম্মদ উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ইজতেমায় এসেছিল। চকবাজার থেকে আমাদের কসমেটিকসের দোকানের জন্য মালামাল কিনে বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। বাবার সঙ্গে কোনো ফোন ছিল না। সর্বশেষ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বাবার সঙ্গে এক দোকানদারের ফোন থেকে কথা হয়।’
এদিকে ১৯টি লাশের জন্য ২১ পরিবারের দাবি ও তাদের ডিএনএ নমুনা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমাদের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে অনেকে টাকা পাওয়ার জন্য মিথ্যা কথা বলে। রানা প্লাজা ধসের সময় এমনও ঘটেছে যে, লাশ নিজেদের দাবি করে ৫০ হাজার টাকা নেয়। পরে লাশ রাস্তার ধারে ফেলে রেখে টাকা নিয়ে চলে গেছে।’
ঢাকা জেলার সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইমরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেউ এসে দাবি করলেই তার ডিএনএ নমুনা নেওয়া হচ্ছে এমন না। সিআইডি তাদের সঙ্গে কথা বলছে। ক্রস ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেই কেবল ডিএনএ নমুনা নেওয়া হচ্ছে।’
২১ পরিবারের দাবি অনুযায়ী নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেনÑ কিশোরগঞ্জের মো. নুরুল হক (৩২), ঢাকার মিরপুরের ইসমাইল (৬০), নোয়াখালীর মো. আহসান (৩২), চাঁদপুরের তানজিল হাসান (২০), নোয়াখালীর বিবি হালিমা শিল্পী (২৮), পূর্ব চকবাজারের নাসরিন নাহান (৩৭), ইসলামবাগ চকবাজারের সালেহ আহম্মেদ লিপু (৪২) ও আত্তাহী (৭), চকবাজারের মো. ফয়সাল (৫৩), ফাতেমা জোহরা (২০) ও শাহিন আহমেদ (৪২), লালবাগের দুলাল ফকির (৪০) ও রেহেনুমা তাবাচ্ছুম দোলা (১৯), কামরাঙ্গীরচরের মো. ইব্রাহিম (৩২), কেরানীগঞ্জের এনামুল হক (৩৩), নরসিংদীর রাজু (৩৫), মানিকগঞ্জের মো. হেলাল (৪৭), রংপুরের মোস্তফা মিয়া (৩৯), নারায়ণগঞ্জের নুরুজ্জামান হাওলাদার (৪৪), ময়মনসিংহের মো. রফিক (২৫) এবং ভোলার মো. সাহাবউদ্দিন (২৮)।
অশনাক্ত ১৯টি লাশের মধ্যে তিনটি রাখা হয়েছে ঢামেকের মর্গে, হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে পাঁচটি, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তিনটি, মিটফোর্ড হাসপাতালে চারটি ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চারটি লাশ রাখা হয়েছে। সিআইডির ডিএনএ অ্যানালিস্ট আশরাফুল আলম বলেন, ‘বর্তমানে লাশ ও স্বজনের ডিএনএ নমুনার প্রোফাইল তৈরি করা হচ্ছে। প্রোফাইল তৈরির কাজ শেষ হলেই নমুনা মেলানো হবে। সব মিলে দুই থেকে ছয় সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।’
এদিন সিআইডি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ মো. রেজাউল হায়দার জানান, চুড়িহাট্টায় নিহত ৬৭ জনের শরীর থেকে ২৫৭টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির দায়িত্বে থাকা বিশেষ পুলিশ সুপার রোমানা আক্তার বলেন, অজ্ঞাতপরিচয়ে ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য সিআইডির একটি বিশেষজ্ঞ দল ডিএনএ নমুনা (রক্ত, টিস্যু, হাড় ও বাক্কাল সোয়াব) সংগ্রহ করে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়া ১৯টি লাশের মধ্যে ১৪টির রক্তের নমুনা ও ৫টির হাড় সংগ্রহ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পারিবারিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন বিভাগের কর্মকর্তা শাকিলা আক্তার বলেন, ‘আমাদের কাছে ১৮টি পরিবার লাশের দাবি করেছে। আমরা ওইসব পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছি। লাশের সঙ্গে তাদের ডিএনএ নমুনা মিলে গেলে পরিবারকে লাশ নিতে সহায়তা করব।’
প্রসঙ্গত, গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ৬৭ জন নিহত হয়েছে। ৪৮ লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো ঢামেকের বার্ন ইউনিটে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন নয়জন। দুজন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রয়েছেন।
