বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজ ‘ময়ূরপঙ্খী’ ছিনতাইচেষ্টার আসল ঘটনা আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে জানা যাবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। পৃথক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায়, ছিনতাই চেষ্টাকারীর পরিচয় পাওয়া গেছে। আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে তার সঙ্গে ক্রিমিনাল ডেটাবেইজে থাকা একজনের তথ্যের মিল পাওয়া গেছে। এদিকে গত রবিবারের আলোচিত ওই ঘটনায় চট্টগ্রামে আটকে পড়া যাত্রীরা গতকাল পৃথক ফ্লাইটে দুবাই গেছেন। ‘ময়ূরপঙ্খী’র ফ্লাইট স্থগিত রয়েছে। ‘ময়ূরপঙ্খী’ ছিনতাইচেষ্টার ঘটনায় গত রাতে পতেঙ্গা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেছেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের প্রযুক্তি সহকারী দেবব্রত সরকার। মামলায় নিহত মাহমুদ পলাশসহ অজ্ঞাত একজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানান চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) বন্দর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) জাহেদুল কবীর। দেশ রূপান্তরকে তিনি আরও জানান, পলাশের মরদেহ রাতেই তারা তার বাবা পিয়ার জাহানকে বুঝিয়ে দেবেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং-৭৩৭ মডেলের ময়ূরপঙ্খীর (বিজি-১৪৭ ফ্লাইট) ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৩৪ যাত্রী ও ১৪ ক্রু নিয়ে রবিবার বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে ছেড়ে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। ঢাকা থেকে উড্ডয়নের পরপরই উড়োজাহাজটি ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার উত্তেজনার পর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে আট মিনিটের কমান্ডো অভিযানে মারা যান ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী।
গতকাল ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওই সংবাদ সম্মেলনে উড়োজাহাজটি ছিনতাইচেষ্টার আসল ঘটনা আগামী পাঁচ দিনে জানা যাবে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, ‘বিমানবন্দরের নিñিদ্র নিরাপত্তা রয়েছে। সেই নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে ওই অস্ত্রধারী কীভাবে প্রবেশ করলÑ তা নিয়ে আমরা রীতিমতো হতবাক। এ জন্য রবিবারই একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।’ তিনি জানান, চট্টগ্রামের শাহ আমানতে বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টার ঘটনায় কম্বিং অপারেশন থেকে শুরু করে যা কিছু ঘটেছে সব প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হয়েছে। বিমান প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘটনাটি কানে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাই। তিনি তাৎক্ষণিক বিমান ও সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সফলভাবে অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেন। তার নির্দেশনামতে জাতি বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। এ সময় এই ঘটনা নিয়ে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই দেশ ও এই বিমানবন্দর আপনাদেরই। অতএব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নেতিবাচক সংবাদ পৌঁছে ক্ষতি হয়, এমন কোনো সংবাদ প্রকাশ করবেন না।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তার সব বেষ্টনী ও ধাপ ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছি। এখানে যেকোনো বস্তু স্ক্যানারে ধরা পড়ার কথা। তার সঙ্গে কিছু ছিল নাÑ আপাতত এটা বলতে পারি। এই ধরনের নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পিস্তল নিয়ে বিমানে ওঠা সম্ভব নয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি কোনো খেলনা পিস্তল ছিল কি না এই মুহূর্তে এটিও বলা ঠিক হবে না। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ত্রুটি বের করবে তদন্ত কমিটি : উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টার ঘটনা তদন্তে গত রবিবারই পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে কীভাবে অনাকাক্সিক্ষত দ্রব্য বহন করা সম্ভব হলো, নিরাপত্তায় নিয়োজিত কেউ জড়িত ছিল কি নাÑ তা চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে কমিটিকে। কার্যপরিধিতে কমিটিকে বিমানের বিজি-১৪৭ নম্বর ফ্লাইটে সংগঠিত ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় কী তা সুপারিশ করতে বলা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ছিনতাই চেষ্টাকারীর পরিচয় : র্যাব বলছে, তাদের ওই তথ্যভা-ার অনুযায়ী, নিহতের নাম পলাশ আহমেদ (২৫)। তিনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের দুধঘাটা গ্রামের পিয়ার জাহান সরদারের ছেলে। র্যাবের ক্রিমিনাল ডেটাবেইজ অনুযায়ী, পলাশ আহমেদ ওরফে মাহাদীর জন্ম ১৯৯৪ সালে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি। তিনি মাদ্রাসা বোর্ডের শিক্ষার্থী ছিলেন। সোনারগাঁ থানায় অপহরণ সংক্রান্ত এক মামলার আসামি ছিলেন তিনি। গতকাল র্যাবের সদর দপ্তরে ওই সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মিডিয়া শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান। বলেন, পলাশকে তার এক সহযোগীসহ ২০১২ সালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর। অপরাধ ছিল, ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কাঁচপুর আলী নুর স্টিল মিলসের সামনে থেকে এক নারীকে অপহরণ করে আট লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি। এই ঘটনায় দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তির মামলায় ওই বছরের ২৮ মার্চ সোনারগাঁ থেকে পলাশকে সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর নিজেকে বিবাহিত দাবি করেন তিনি। মুফতি মাহমুদ জানান, পলাশ বিমানের ফ্লাইটটিতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন। যাত্রী তালিকায় নাম ছিল আহমেদ/মো. পলাশ। সিট নম্বর ছিল ১৭এ। উড়োজাহাজ ছিনতাই চেষ্টার ঘটনার পর র্যাব-৭ ঘটনাস্থলে যায়। বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট কাজ করে। তার শরীরে বিস্ফোরক সদৃশ যা পাওয়া গেছে, তাতে বিস্ফোরক ছিল না। এটা ফেইক একটা জিনিস ছিল, যা ভুয়া তার-সার্কিট দিয়ে তৈরি।
দুবাই গেছেন যাত্রীরা : চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার সারওয়ার-ই-জামান জানান, ছিনতাইচেষ্টার পর জরুরি অবতরণ করে ময়ূরপঙ্খী। এরপর যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে আনা হয়। ঢাকা থেকে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিমানের আরেকটি বোয়িং বিমান (বিজি-১২৭ ফ্লাইট) চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। সেই বিমানে করেই যাত্রীদের দুবাই নেওয়া হয়। বিমানের স্টেশন ম্যানেজার মাহফুজুল আলম জানান, আটকে পড়া দুবাইগামী ১৪৮ যাত্রীকে রবিবার বিভিন্ন হোটেলে রাখা হয়। সোমবার দুপুরে তারা আরেকটি ফ্লাইটে রওনা হয়ে যান। তিনি জানান, দুবাইগামী যাত্রীদের রবিবার রাতেই গন্তব্যে পাঠানোর কথা ছিল। ঘন কুয়াশার কারণে সম্ভব হয়নি। বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, ‘ময়ূরপঙ্খী’র ফ্লাইট স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে উড়োজাহাজটি আবারও চলাচল করবে।
