জৈন্তেশ্বরীর বাঁকে বাঁকে ইতিহাস খুঁজি

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০১:৫২ এএম

একটু পরপর মুষলধারায় বৃষ্টি। এরই মধ্যে আমাকে বের হতে হলো। মনোয়ার ভাই অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন। মনোয়ার ভাই আমার অফিসের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। অফিসের কাজে খুব ব্যস্ত থাকেন, তারপরও সময় পেলেই ঘুরতে বের হন। বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে তার হোটেলের সামনে হাজির হলাম। ফোন দিলাম মনোয়ার ভাইকে। শুনলাম আমার জন্য অপেক্ষা করতে করতে সামনে গেছেন হাঁটতে। এই ফাঁকে আমি যাত্রাপথে খাওয়ার জন্য হালকা খাবার কিনলাম। ১০টায় আমাদের যাত্রা শুরু। আমার সঙ্গী মনোয়ার ভাই আর ভাবি। আজকের গন্তব্য জৈন্তেশ্বরী বাড়ি। সিলেট-তামাবিল সড়কের পাশে জৈন্তাপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছেই ‘জৈন্তেশ্বরী বাড়ি’। এগিয়ে চলছি আমরা আর মুষলধারায় বৃষ্টি চলছে। মহাসড়কে মানুষের আনাগোনা কম। রাস্তার পাশে দেশি চাঁপাকলা দেখলেন মনোয়ার ভাই। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামিয়ে কিনে নিলেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা গন্তব্যে এসে পৌঁছালাম কিন্তু বাদ সাধল বৃষ্টি। মুষলধারা বৃষ্টির মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছেও বসে থাকতে হলো গাড়িতে। আমাদের মতো অনেকেই গাড়িতে বসে আছে বৃষ্টি কমার অপেক্ষায়। বৃষ্টি একটু কমার সঙ্গে সঙ্গে আমরা গাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বৃষ্টির মধ্যেই চোখে পড়ল প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। ভেতরে প্রবেশের পর দেখা পেলাম ভগ্নপ্রায় দেয়ালের অংশবিশেষ। ভেতরের দিকে এগোতেই পুরনো ঘর দেখতে পেলাম। ঘরটির সামনে সাইনবোর্ডে লেখা ‘ইরাদেবী মিলনায়তন’। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন এই প্রাচীন পুরাকীর্তি দেখতে। পরিচয় হলো বয়োজ্যেষ্ঠ সামাদ আহমেদের সঙ্গে। তিনি বললেনÑ ‘জৈন্তেশ্বরী বাড়ি’ মূলত সিন্টেং বা জৈন্তা রাজাদের পূজিত দেবতার বাড়ি। জৈন্তার রাজা যশোমানিক ১৬১৮ সালে অত্যন্ত আড়ম্বরে উপহার হিসেবে প্রাপ্ত কালী দেবীর মূর্তিকে এ বাড়িতে স্থাপন এবং বাড়িটি নির্মাণ করেন। বাড়িটির মধ্যখানে মূল মন্দির ঘরটির অবস্থান। বর্তমানেও মূল ঘরটির ভিটা এবং সংলগ্ন দক্ষিণের ঘরটি কোনো রকম দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা সংস্কার করে একদল হিতৈষী ব্যক্তি ঘরটি ‘ইরাদেবী মিলনায়তন’ নামে নামকরণ করেছে।  ঘরটির স্তম্ভগুলো লোহার এবং স্থাপত্যশৈলী বেশ দৃষ্টিনন্দন। জৈন্তেশ্বরীর ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজা ধন মানিক ১৬০৬ সাল পর্যন্ত জৈন্তিয়ার অধিপতি ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ১৬০৬ সালে কাছাড়রাজ শত্রুদমন যশোমানিককে মুক্তি দেন। যশোমানিক দেশে ফিরে আসেন এবং সিংহাসন লাভ করেন। ১৬১৮ সালে অসমরাজ প্রতাপ সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ বিজয়ের পর যশোমানিক কোচবিহার চলে যান। কোচরাজ লক্ষ্মীনারায়ণের মেয়েকে বিয়ে করেন। বিয়েতে যৌতুকস্বরূপ ধাতুনির্মিত মূল্যবান দেবমূর্তিপ্রাপ্ত হন। দেবী কালীর সে মূর্তিকে জৈন্তাপুরে নিয়ে মহাসমারোহে ‘জৈন্তেশ্বরী কালী’ নামে প্রতিষ্ঠিত করেন। যশোমানিকের আগে রাজদরবারে জৈন্তা বা সিন্টেং রীতিনীতি পালিত হতো কিন্তু এ মূর্তি স্থাপনের পরই রাজকীয় পরিবারে হিন্দুদের মূর্তিপূজা শুরু হয়। ঘরটির পশ্চিম দিকে দেয়ালসংলগ্ন প্রায় দুই ফুট উঁচু পাকা মঞ্চ ধাঁচের একটি জায়গা, যা ‘চন্ডির থালা’ নামে পরিচিত। কয়েক দশক আগেও এখানে একজন ব্রাহ্মণ বসবাস করতেন। এ ঘরটির পেছনের দিকে আরেকটি ঘর ছিল, যেটির কয়েক ফুট উঁচু পাকার ভিটা এখনো দেখা যায়। এ ঘরটিই মূল মন্দির ঘর। ভিত থাকলেও ওপরের কাঠামোটি নেই। সম্ভবত এখানে জৈন্তেশ্বরী দেবী অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে দেবীর মূর্তিটি চুরি হয়ে যায়। এ ঘরটির দক্ষিণ দিকে রয়েছে একটি পানির কূপ, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ইন্দিরা’ নামে পরিচিত। কূপটি ইট দিয়ে বাঁধানো এবং বর্তমানে এটির পানি আর ব্যবহার উপযোগী নয়। শোনা যায়, ওই কূপটি উঁচু গোলাকৃতি একটি পাটাতন বা বেদি, যেখানে মানুষ বলি দেওয়া হতো। এ জন্য পাটাতনটি ‘বলির পাটাতন’ নামে পরিচিত। বেদিটি বেলে পাথরের তৈরি এবং আয়তন প্রায় তিন বর্গমিটার। বেদির গোলাকৃতি অংশ থেকে উত্তর পাশ দিয়ে ক্রমেই নিচে দিকে একটি সিঁড়ি চলে গেছে। এটির দুটি ধাপ রয়েছেÑ প্রথমাংশ সামান্য উঁচু এবং পরের অংশ প্রথমাংশ থেকে খানিকটা নিচু হয়ে ক্রমেই ভূমির দিকে চলে গেছে। সম্ভবত নরবলি দেওয়ার নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এখানে হতো।  বর্তমানে বাড়িটিতে তিনটি ফটক দেখা যায়। প্রধান ফটকটি দক্ষিণ দিকে এবং সেটি পুরনো অপর গেট দুটির একটি পূর্বদিকে এবং একটি পশ্চিমদিকে অবস্থিত। নিরাপত্তার জন্য সে দুটি এখন বন্ধ। বাড়িটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে বিরাট উঁচু দেয়াল। বিশাল এ বাড়িটির পুরোটাই আট হাত উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা এবং দেয়ালের মধ্যে হাতি, ঘোড়াসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর চিত্র আঁকা। জৈন্তেশ্বরী বাড়ির দেয়ালের মধ্যে উত্তর-পশ্চিমদিকে আরেকটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ এখন দেখতে পাওয়া যায়। সম্ভবত রাজ্যের সচিবালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মন্দিরের দক্ষিণ দিকটি রাজার দরবার হল হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে শোনা যায়। প্রধান ও অভিজাতদের বসার জন্য সেখানে পাথরের আসন রয়েছে। সে পাথরগুলো মেগালিথিক নামে পরিচিত, যা জৈন্তিয়ার প্রাচীনত্বের এক জীবন্ত নিদর্শন।

image

যাবেন কীভাবে

ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে সিলেট। সিলেট থেকে এক ঘণ্টার পথ জৈন্তাপুর। বাস, মিনিবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মাইক্রোবাসে চড়ে জৈন্তাপুর চলে যেতে পারেন। উঠতে পারেন জৈন্তা হিল রিসোর্টে অথবা কাছের নলজুড়িতে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয়। জৈন্তা হিল রিসোটের ভাড়া ৩০০০ টাকা থেকে শুরু আর ডাকবাংলার ভাড়া ১৫০০ টাকা।

আগে থেকেই বুকিং দিয়ে যেতে হবে ডাকবাংলোয়। শহর থেকে মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে ভাড়া নেবে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। গাড়ির জন্য যোগাযোগ করতে পারেন।

ফোন : ০১৬১৭-৬৭৪৩১০
০১৯২৯-৪১৭৪৪১

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত