জ্বালানি তেল পরিশোধনের বাংলাদেশের একমাত্র কোম্পানি রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বিনিয়োগ করতে চায় সৌদি আরবের মালিকানাধীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি আরামকো। এটি ছাড়াও সৌদি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ নিয়ে আসতে আগ্রহী। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সৌদি আরবের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরের পর তাদের বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।গত ১০-১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সফর করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগমন্ত্রী ড. মজিদ বিন আবদুল্লাহ আল কাসাবির নেতৃত্বে সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলটি, সেখানে আরামকোর কর্মকর্তারাও ছিলেন। সফরকালে তারা জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, চিনি শিল্প, পাট শিল্প, অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে আরামকোর বিনিয়োগ প্রস্তাব বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম বাড়াবে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ওই বৈঠকের
কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগে আরামকোর মতো বিখ্যাত কোম্পানির আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ একটি ‘স্ট্র্যাটেজিক এনগেজমেন্ট প্ল্যান’সহ ধারণাপত্র তৈরি করে তা নিয়ে সৌদি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে। পরে সৌদি আরব এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।
আরামকোর বিনিয়োগ প্রস্তাবকে বাংলাদেশের জন্য ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আরামকো ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বড় ধরনের বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এত বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্প তৈরিতে পাঁচ-ছয় বছর সময় লাগবে। তাই আরামকোর সঙ্গে প্রকল্প নেওয়ার আগেই বাংলাদেশের জ্বালানির ভবিষ্যৎ চাহিদা, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের আমদানি করা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় অর্ধেক দেয় আরামকো। বাকিটা কাতার, বাহরাইন, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। আরামকো বিনিয়োগ করলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ। আরামকো বিনিয়োগ করলে বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানিতে সৌদি আরবের প্রভাব আরও বাড়বে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ বৈঠকে বলেন, ‘সম্পদ ও বিক্রি বিবেচনায় আরামকো বিশ্বের অন্যতম একটি বৃহৎ কোম্পানি। ইতোমধ্যে আরামকো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বিনিয়োগ বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আরামকোর একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরও করেছে।’
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বৈঠকে জানান, বাংলাদেশে অপরিশোধিত জ্বালানির ৫০ শতাংশ সৌদি আরবের এই প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানি করা হয়। তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিনিয়োগ করার জন্য বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানি বাজারও প্রয়োজন। আরামকো এ বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের সার্বিক ব্যবহারের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্যও চেয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট জ্বালানি তেলের সরবরাহ ছিল ৮৬ দশমিক ৩২ লাখ টন। এর মধ্যে ১১ লাখ ৭২ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ার পর জন্ম নেওয়া ক্যালিফোর্নিয়া-অ্যারাবিয়ান স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি ১৯৪৪ সালে আরামকো (অ্যারাবিয়ান-আমেরিকান অয়েল কোম্পানি) নামে যাত্রা শুরু করে। কোম্পানিটি সম্পদের পরিমাণ ২ ট্রিলিয়ন ডলার দাবি করলেও তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সংশয় আছে। ২০১৮ সালের এপ্রিলে কোম্পানিটির ফাঁস হওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে ব্লুমবার্গ জানায়, আরামকোর সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে আরামকো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের প্রথম ৬ মাসে আরামকোর মুনাফা ৩৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
