ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:২২ পিএম

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, বাংলাদেশের পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা গড়ে চারজন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলসসহ শ্রমিকদের জীবনমান ও অধিকার-সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণার তথ্য মতে চার সদস্যের একটি পরিবারের ন্যূনতম মাসিক খরচ ১৬ হাজার টাকা। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনগুলোসহ পোশাক খাতে সক্রিয় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১৬ হাজার টাকা ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়। শ্রমিকদের এই দাবি যৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও পোশাকশিল্পের মালিকদের চাপে রাষ্ট্র কর্র্তৃক সপ্তম গ্রেডে আট হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। আবার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামোতে মোট মজুরির তুলনায় মূল মজুরি অনেক কম ধার্য করা হয় এবং একই সঙ্গে অন্যান্য গ্রেডে (অর্থাৎ প্রথম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড) মজুরির মধ্যে নানা অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। ফলে ২০১৯ সালের শুরুতে পোশাক খাতে শ্রমিক বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে, যা নবগঠিত সরকারের ওপর অপ্রত্যাশিত চাপ তৈরি করে। ফলে সরকারের শ্রম ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তড়িঘড়ি উদ্যোগ নিয়ে ন্যূনতম মজুরির গেজেট সংশোধন করতে বাধ্য হয়।

ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো মেনে নেওয়ার সুর পরিলক্ষিত হয়। শ্রমিকরাও কাজে যোগ দেন। ডিসেম্বরের মজুরিতে কেউ কম পেয়ে থাকলে জানুয়ারি মাসের মজুরির সঙ্গে সমন্বয় করার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর পক্ষ থেকেও ন্যূনতম মজুরি পালন করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।

জানুয়ারি মাসের মজুরি প্রদানের পর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী অলংকার মোড়ে অবস্থিত একটি কারখানার ১৪২ জনের পে-সিøপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ওই কারখানায় ৮০ দশমিক ২৮ শতাংশ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পাননি। অন্যদিকে ৩, ৪, ৫ এবং ৭ নম্বর গ্রেডের কোনো শ্রমিকই ন্যূনতম মজুরি পাননি। কেবল ৬ নম্বর গ্রেডের ৩৫ শতাংশ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পেয়েছেন। তাও কথা আছে, ৬ নম্বর গ্রেডের শ্রমিকদের সার্ভিস লেন্থ অনুযায়ী ইনক্রিমেন্ট বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে বাস্তবে কোনো শ্রমিকই ন্যূনতম মজুরি পাননি।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা বিষয়টি তদারকি করছে। কিন্তু তদারকির পর একটি তালিকা তৈরি করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো ছাড়া তাদের আর তেমন কোনো করণীয় নেই বলে তারা জানিয়েছে। পরিদর্শন অধিদপ্তরের এমন বক্তব্য দায়িত্ব এড়িয়ে চলার কৌশল বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।

ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি পরিদর্শন অধিদপ্তরের নমনীয় মনোভাব রাষ্ট্রীয় মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ কি নাÑ তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। কিছু কিছু পোশাক কারখানার মালিকপক্ষ সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, তাদের পক্ষে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অনেকে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে আবার অনেকে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করে শ্রম আইনের ১৩ নম্বর ধারা অপপ্রয়োগের মাধ্যমে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। মালিকপক্ষের কথায় কথায় কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এরা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কোনো কিছুই বিবেচনায় নেয় না। মূলত এ ধরনের শিল্প-মালিকদের কারণে শ্রম অসন্তোষ তৈরি হয়, যা শিল্পের বিকাশে প্রধান অন্তরায়। সুতরাং সবার আগে শিল্পের জন্য ক্ষতিকর এ ধরনের মালিকদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

কোনো পোশাক কারখানার মালিক যদি সম্প্রতি ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি কার্যকর না করেন কিংবা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করেন, তাহলে তা হবে শ্রম আইনের ১৪৮ ও ১৪৯ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ধরনের লঙ্ঘনের দায়ে শ্রম আইনের ২৮৯ ধারা অনুযায়ী ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। শ্রম আইন মেনে চলা প্রত্যেক নিয়োগকর্তার জন্য বাধ্যতামূলক। আর শ্রম না মানলে শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

যেসব পোশাক কারখানার মালিক সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিকরা বিধিমালার ৩৫১ (১)(ক) মোতাবেক নিজ নিজ জেলায় কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক বরাবর অভিযোগপত্র দায়ের করতে পারবেন। অভিযোগপ্রাপ্তির ১০ কর্মদিবসের মধ্যে পরিদর্শন অধিদপ্তর অনুসন্ধান ও তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মালিকপক্ষকে নির্দেশ দেবে এবং মালিকপক্ষ নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলে পরিদর্শন অধিদপ্তর শ্রম আদালতে ফরম ১৪ অনুযায়ী মামলা দায়ের করবে।

গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। ওই বিজ্ঞপ্তিটি ছিল কোল্ডস্টোরেজ মালিকদের বিরুদ্ধে কুলি শ্রমিকদের করা রিট পিটিশন নম্বর ১৭৬১/২০১৭-এ প্রদত্ত মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ছয় দফা নির্দেশনা-সংক্রান্ত বিষয়ে। ওই ছয় দফা নির্দেশনার ২ নম্বর নির্দেশনাটি বাংলাদেশের সব সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের ছয় দফা নির্দেশনার ২ নম্বর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা-২০১৫-এর বিধি ৩৫১(১)(ক) অনুযায়ী শ্রম আইন ও বিধিমালা দ্বারা নিশ্চিত করা কোনো অধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে কোনো পক্ষ থেকে অভিযোগপ্রাপ্ত হলে তা প্রাপ্তির ১০ কর্মদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে পরিদর্শন অধিদপ্তর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করবে। ওই নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে পরিদর্শন অধিদপ্তর আইনের ৩১৯ ধারা অনুসরণ করে শ্রম আদালতে অভিযোগ করবে।

শ্রম আদালতে মামলা করার ব্যাপারে শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। শ্রম আদালতকে সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত আদালত বলা হলেও এখানে প্রচুর মামলাজট পরিলক্ষিত হয়। মামলা করার পর পাঁচ-সাত বছর অপেক্ষা করতে হয় এমন নজির প্রচুর রয়েছে। তাই কোনো কারখানায় ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগে মামলা হলে ওই মামলা যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে।

সম্প্রতি পোশাক খাতে ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি শ্রমিকদের জন্য যৌক্তিক হয়েছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। তথাপি রাষ্ট্র কর্র্তৃক ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ও শ্রম আদালত তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হবে এমনটিই সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত