বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পলানের বাঁশি বাজাবে কে?

আপডেট : ০২ মার্চ ২০১৯, ০৩:২০ এএম

বড় মানুষদের সান্নিধ্য পাওয়া কঠিন। তবে কখনো কখনো, জীবনপ্রবাহ এমনভাবে তাদের নিকট নিয়ে যায় যে টেরই পাওয়া যায় না। পলান সরকারের সঙ্গে আমার দেখা সেরকমভাবেই, কোনোরকম চেষ্টাচরিত্র ছাড়াই, কর্মজীবনের অনিবার্য আনুষঙ্গিকতার অংশ হিসেবে। তিনি তখন সবে কিছুটা পরিচিতি পেয়েছেন, আবুল কালাম আজাদ নামক প্রথম আলোর একজন সাংবাদিকের লেখা ও চেষ্টায়। আর আমি, ২০০৬ সালের নভেম্বরের শেষদিকে রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছি। স্বভাবমতো, যোগ দিয়েই দৌড়ে গিয়েছি উপজেলার পাঠাগারে। আর দশটা পাঠাগারের মতো, এখানেও পাঠকের অভাব আর বিশৃঙ্খলা দেখে বেদনাহত মন নিয়ে ফিরে এসেছি।

পরদিন, অফিসে কয়েকজন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে পাঠাগারের দুরবস্থা আর এর উন্নয়নের উপায় নিয়ে কথা বলছি, এমন সময় একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, পলান সরকারের কথা শুনেছেন কি?’ ‘ওই যে যিনি বই বিলিয়ে বেড়ান বলে টিভিতে প্রচার হয়েছে?’ ‘জি¦ স্যার।’ ‘অবস্থাটা ভাবুন একবার, এখানে বই আছে কেউ পড়ছে না আর কোথায় কোন গ-গ্রামে একজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রছাত্রীকে বই দিয়ে আসছে।’

আমার কণ্ঠ শুনেই প্রশ্নকারী বুঝতে পেরেছিলেন জ্ঞানচর্চায়, জ্ঞানবিতরণে নিয়োজিত মানুষদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা পোষণ করি। তিনি এবার মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘জানেন কি তিনি এই উপজেলারই বাসিন্দা? কয়েক কিলোমিটার দূরেই তার বাড়ি?’

সেদিনই বিকেলেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার বাড়ি গেলাম। বাড়ি বলতে আহামরি কিছু নয়, গ্রামের বর্ধিঞ্চু গৃহস্থদের যেরকম থাকে, সেরকমই। চেহারাও সেরকম, কপালে ভাঁজপড়া মাঝারি উচ্চতার সত্তরোর্ধ্ব এক দ্রাবিড় পুরুষ। কপালের চুল ছোট করে ছাঁটা, প্রায় সবই ততদিনে পেকে গিয়েছে। চামড়ায় বয়সের ছাপ পড়েছে, খুব সম্ভবত রোদে ঘোরাঘুরি থেকে। শরীরের গাঁথুনি আপাতনজরে খুব শক্তপোক্ত মনে হয় না, তবে একটু পর্যবেক্ষণ করলেই তাতে শক্তি আর আত্মবিশ^াসের ছোঁয়া টের পাওয়া যায়। সত্যি বলতে কি, প্রথম দেখায় আমি কিছুটা হতাশই হয়েছিলাম, কেননা তাকে আমাদের তথাকথিত আলোকপ্রাপ্তদের থেকে একদমই আলাদা দেখাচ্ছিল। কিন্তু কথা শুরু হতেই বুঝলাম, ওপরে বালুচরের নিচে কী দারুণ ফল্গুধারা বইছে। বাইরের রুক্ষতার আড়ালে ভেতরের মানুষটি মিষ্টি, সহজাত এবং নিজ কাজে সাবলীল। বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়, দীর্ঘক্ষণ তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন, তার ছেলেবেলা, তার কর্মজীবন, স্কুলের কাজে জড়িয়ে গিয়ে কেমন করে বই বিতরণের কাজে নেমে গেলেন, সেইসব শোনালেন, মৃদুস্বরে, যেন এই বুঝি কেউ শুনে ফেলল। পুরো কথনেই তিনি ছিলেন, কিন্তু কোথাও আত্মপ্রচার ছিল না। আমার শ্রদ্ধাবোধ বাড়ল। এরপর আমাদের দেখা হয়েছে অনেকবার, কিন্তু অনেকের বেলায় যেমন দূর থেকে ভালো লাগে, কিন্তু কাছে গেলে ক্রমে সম্পর্ক মিইয়ে আসে, তার ক্ষেত্রে আমার মুগ্ধতা কখনো কমেনি। তার বড় কারণ তিনি কখনো মুগ্ধ করার চেষ্টা করতেন না, তার যা কাজ, যথাসম্ভব আড়ালে থেকে সেটাই করে যাওয়ার চেষ্টা করতেন।

বৃহত্তর রাজশাহী এলাকায় ডাকনামের খুব প্রচলন রয়েছে। ওই এলাকার বড় বড় রাজনীতিবিদের নাম ঘাঁটলে, প্রত্যেকের নামের শেষেই ছোট্ট একটা আদুরে লেজুড় পাওয়া যায়। পলান সরকার নামটিও আসল বা কাগজপত্রে লিখিত নাম নয়। প্রকৃত নাম হারেজউদ্দিন। ঘনিষ্ঠতা বাড়লে ডাকনামের ইতিহাস বলতে অনুরোধ করলাম। যতদূর মনে পড়ে, তিনি বলেছিলেন, তার বড় দু-তিনজন সহোদরের অকাল মৃত্যু হয়েছিল। সে কারণে মা তাকে ‘পলানে’ বলতেন, যেন তিনি জীবন থেকে পালিয়ে না যান। অমঙ্গল, বিশেষ করে যেন আজরাইলের বদনজর না লাগে সেজন্য এ ধরনের ডাকনামের প্রচলন একসময় গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ছিল।

তিনি বাস করতেন রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার বাউসায়, তবে সেটা তার জন্মস্থান নয়। জন্মেছিলেন নাটোরের বাগাতিপাড়ায়, অল্পবয়সে পিতার মৃত্যু হওয়ায় নানার বাড়ি বাউসায় চলে আসেন। নামের শেষ যে সরকার পদবি, সেটাও নানা ময়েনউদ্দিন সরকারের পদবিসূত্রে পাওয়া। জানলাম, উল্লেখযোগ্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না তার। প্রথম জীবনে যাত্রার দলে মিশেছিলেন। ছোটখাটো অভিনয়, আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সংলাপ বলে দেওয়া, এই ছিল তার কাজ। পা-ুলিপি হাতে লিখে কপি করতেন, সেটা ক্রমে বই পড়ার অভ্যাসে রূপ নেয়। নিজের উচ্চশিক্ষা না থাকলেও, শিক্ষা বিস্তারে তার আগ্রহ ছিল অপরিসীম। পাকিস্তান আমলের শেষদিকে বাউসায় একটি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি তাতে প্রায় এক একর জমি দান করেন। ১৯৯০ সাল থেকে এ বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষায় বিভিন্ন শ্রেণির প্রথম থেকে দশম স্থান অধিকারীকে বই দেওয়ার প্রথা চালু করেন। এরই একপর্যায়ে পাঠাগার গড়ার স্বপ্ন মাথায় আসে।

ঘর থাকবে, বই রাখার আলমারি থাকবে, পাঠকদের বসার টেবিল-চেয়ার থাকবে, বই বিতরণ ও দেখভালের জন্য লোক থাকবে, মোটামুটি এই তো হচ্ছে পাঠাগার। বইভর্তি ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠকদের কাছে বই বিতরণ আবার নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে নিয়ে আসা, সে ব্যতিক্রমী চিন্তা কেমন করে এলো? জবাবে যা বললেন, সেখানেও তার বড়ত্বের পরিচয় পেলাম। বড় মানুষদের একটা বৈশিষ্ট্য এই যে, তারা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে পারেন। বড় মানুষদের আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য, তারা প্রতিকূল পরিস্থিতিকে অনুকূল হিসেবে কাজে লাগাতে পারেন। বললেন, বেশ ক’বছর আগে তার ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। এ রোগে আক্রান্ত লোককে আবশ্যিকভাবে প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময় হাঁটতে হয়। তিনি সেই হাঁটাহাঁটিকে বই বিতরণের কাজে ব্যবহার করেছেন। তা একদিকে তার শরীর ঠিক রেখেছে, অন্যদিকে সমাজের কাজে এসেছে। মুগ্ধ হওয়ার মতো চিন্তাই বটে।

অতএব, মুগ্ধ হলাম এবং তার কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা করলাম। বাঘার শিক্ষক, সাংবাদিক তথা সুধীসমাজ এগিয়ে এলো। আমরা পলান সরকারকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করলাম, সেটা ২০০৭ সালের এপ্রিল কী মে মাসে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক প্রধান অতিথি হতে সম্মত হলেন, ঢাকা থেকে আরেক খ্যাতিমান সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিলেন। গুণী ব্যক্তির সম্মাননার সে অনুষ্ঠানে বাঘা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হলো। চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যাপক কাভারেজ দিয়ে সে অনুষ্ঠানের সংবাদ পরিবেশন করল। আজ পেছনপানে তাকালে মনে হয়, এই ২০ বছরের চাকরি জীবনে, সেটিই ছিল বোধহয় আমার সভাপতিত্বে হওয়া সবচেয়ে তাৎপর্যময় অনুষ্ঠান।

উপজেলা পরিষদের তহবিলে অর্থ না থাকায় আমরা তার লাইব্রেরি নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারছিলাম না। আমরা তখন রাজশাহী জেলা পরিষদে যোগাযোগ করি। সে সময়কার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পরিমল কুমার বিদ্যোৎসাহী ছিলেন, তিনি জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে পলান সরকারের বাড়িতে একটি পাঠাগার স্থাপন করতে সানন্দে রাজি হন। দুই বছরের মাথায় পাঠাগার ভবনের নির্মাণ সমাপ্ত হয়। উল্লেখ্য, এ পলান সরকারই এ পাঠাগার ভবনের জন্য জমি দান করেন।

বাকিটা ইতিহাস। একটা মোবাইল কোম্পানি তাদের টিভি বিজ্ঞাপনে পলান সরকারকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করলেন, একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে তিনি ‘সাদা মনের মানুষ’ অভিধায় খ্যাত হন, ২০১১ সালে সমাজসেবায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘একুশে পদক’ লাভ করেন এবং ২০১৪ সালে ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’তে বিশ^জুড়ে বিভিন্ন দৈনিকে তাকে নিয়ে লেখা প্রকাশিত হয়। ২০১১ সালে আমি ঢাকায়, পুরস্কার প্রাপ্তির পরদিন তিনি আমার অফিসে এসেছিলেন আনন্দের অংশ দিতে, স্নেহ এবং হয়তো দোয়া ও ভালোবাসা জানাতে। এরপরও কয়েকবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছে। লক্ষ্য করেছি পুরস্কার তার মধ্যে অহংবোধের সৃষ্টি করেনি। বরং আফসোস করেছেন, জাতীয় স্বীকৃতি কর্তব্যের তাড়না বাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু বয়সের কারণে সেভাবে পেরে উঠছেন না।

ভৌগোলিক হিসেবে দেখলে, পলান সরকারের কাজের ক্ষেত্র খুব একটা বিস্তৃত ছিল না। মাত্রই কয়েকটা গ্রাম। ওই এলাকায় আমার অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করি, বই গ্রহীতা পাঠকও খুব বেশি হবেন না। বিত্তবিলাসিতার এই যুগে কেই-বা বিদ্যার কদর করে! তবু, এত সীমিত পরিধিতে কাজ করেও, পলান সরকার যে জাতীয় পরিচিতি লাভ করলেন, তার কারণ এ জাতীয় মানুষের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। পরিবেশবাদীরা যাদের সংকটাপন্ন বলেন, তিনিও সেই গোত্রেরই লোক। আর হবেই না বা কেন? যে সমাজে, যে সংস্কৃতিতে পরোপকারকে ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ অভিধা দেওয়া হয়, সেখানে পলান সরকারদের মতো লোক কম জন্মাবে, এটাই স্বাভাবিক। এবং জন্মালেও, তাদের উৎসাহিত করা হবে না, বরং বাঁকা চোখে দেখা হবে, সেটা অভিজ্ঞতা, সে অভ্যাসও আমাদের মজ্জাগত। পলান সরকার এখানেই অনন্য, পলান সরকার এখানেই অন্যদের অনুকরণীয়। তিনি শুধু আলোকিত মানুষ নন, এক আলোকবর্তিকাও।

বড় বাতির জন্য বড় ঘরের দরকার হয়। পাদপ্রদীপের বাইরে পলান সরকার ছিলেন ছোট্ট স্থানে এক বিশাল প্রদীপ। মনে পড়ে, ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মো. ইব্রাহীম স্মারক বক্তৃতায় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস মানুষের কল্যাণে ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহীমের অবদানের কথা স্মরণ করে আক্ষেপ করেছিলেন, ‘সেই বাঁশি কি আর বাজে না?’ পলান সরকারের মৃত্যুতে অধ্যাপক ইউনূসের অনুকরণে আমারও বলতে ইচ্ছে করে, তিনি যে বাঁশি বাজিয়ে গেছেন, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সেই বাঁশি কি আর বাজবে না? জ্ঞানবিমুখ এই দেশে, এই সমাজে পলান সরকারের মতো মানুষের যে বড্ড বেশি দরকার।

কবির চান্দ, গল্পকার ও অনুবাদক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত