বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পাকিস্তান-ভারতের সাংঘর্ষিক সম্পর্ক ও শান্তি-প্রতিষ্ঠা

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০১৯, ১০:০৯ পিএম

ঔপনিবেশিক পরাধীনতা-উত্তর উপমহাদেশে বহুবারই ভারত ও পাকিস্তানের সংঘর্ষ হয়েছে। কখনো সার্বিক, কখনো স্থানীয়। স্থানীয় সংঘাত মূলত কাশ্মীরকেন্দ্রিক। বস্তুতপক্ষে ১৯৪৭ উত্তর স্বাধীনতা পরবর্র্তী সময়ে উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বৈরিতার উপস্থিতি কাশ্মীর সমস্যা থেকেই মূলত উদ্ভূত। যে মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ভারতবর্ষ দ্বিধাবিভক্ত হলো সে নীতি অনুসারে কাশ্মীর ছিল পাকিস্তানের প্রাপ্য। কাশ্মীর মহারাজার ভারতে যোগদানের সম্মতির ভিত্তিতে ভারতের দাবি ছিল কাশ্মীরের ভারতে অন্তর্ভুক্তি। জাতিসংঘ বিরোধ নিরসনে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল গণভোটের। ভারতের বিরোধিতায় তা আর হয়নি। মূল ভূখ- আজ ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিছুটা অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে যার নাম আজাদ কাশ্মীর। যুদ্ধবিরতিতে বিভক্তি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণরেখা লাইন-অব-কন্ট্রোল। কাশ্মীরের ভাগ্য নিয়ে চরম সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আজ যা দুই বিবদমান রাষ্ট্রের কার্যত সীমারেখা। কিন্তু এই দুই রাষ্ট্রের বিরোধ ছাড়িয়ে আর একটি কণ্ঠ এখন সরব ও প্রবল হয়ে উঠছে। তা হচ্ছে কাশ্মীরের জনগণের স্বাধীনতার দাবি আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। অবাক লাগে ভাবতে যে, বাংলার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই কবে যেন ভবিষ্যদ্বাণীর মতোই তার তুলনাহীন প্রকাশ-শৈলী নিয়ে বলে উঠেছিলেন “কাশ্মীরের সুন্দর মুখ কঠোর হল প্রচণ্ড সূর্যের উত্তাপে।

গলে গলে পড়ছে বরফ ঝরে ঝরে পড়ছে জীবনের স্পন্দন: শ্যামল আর সমতল মাটির, স্পর্শ লেগেছে ওর মুখে, দক্ষিণ সমুদ্রের হাওয়ায় দুলছে ওর চুল: আন্দোলিত শাল, পাইন আর দেবদারুর বনে

ঝড়ের পক্ষে আজ সুস্পষ্ট সম্মতি।

তাই আজ কালবৈশাখীর পতাকা উড়ছে

ক্ষুব্ধ কাশ্মীরের উদ্দাম হাওয়ায় হাওয়ায়,

দুলে দুলে উঠছে, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঘুমন্ত, নিস্তব্ধ

বিরাট ব্যাপ্ত হিমালয়ের বুক।”

এর চেয়ে ভালো করে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থার বর্ণনা সম্ভব নয় বলে সুকান্তের কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করলাম।

ভারত-পাকিস্তান এবং স্বাধীনতাকামী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী কাশ্মীরি এই তিন শক্তির ত্রিমাত্রিক সংঘর্ষের সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাতের সূচনা হয়েছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতশাসিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর একটি বিরাট রক্তক্ষয়ী আত্মঘাতী হামলা নিয়ে। চল্লিশজন ভারতীয় সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সি.আর.পি.এফ) জওয়ানের মৃত্যুর দায় স্বীকার করে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই মোহাম্মদ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেন “আমি বলেছিলাম দেশকে রসাতলে যেতে দেব না, থমকে যেতে দেব না, মচকাব না” এবং ভারতীয় যুদ্ধবিমান ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে বালাকোটে বোমাবর্ষণ করে। ভারতীয় গণমাধ্যমের বরাতে দাবি করা হয় জঙ্গিদের আস্তানাসহ তিন শতাধিক জঙ্গি এই আক্রমণন বিনাশ হন। অবশ্য পাকিস্তানের পক্ষ এবং বিবিসি সাংবাদিক হামিদ মীরসহ অন্যান্য কোনো কোনো সূত্র অকুস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন সেখানে তেমন কোনো ধ্বংসাবশেষ তারা দেখেননি। একটি বাড়ির অংশসহ যথেষ্ট গাছপালা বিনষ্ট হয়েছে এবং একজন বেসামরিক লোক আহত হয়েছে। পাকিস্তান আবার জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে নালিশ করেছে যে, সামরিক বোমাবর্ষণ করে পাকিস্তানের অরণ্য বিনষ্ট করে পরিবেশের ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। ভারত এ যাবৎ বালাকোট বিধ্বংসের কোনো প্রমাণ দেয়নি। তবে পাকিস্তান আবার পাল্টা বিমান আক্রমণ করে, আকাশযুদ্ধ হয়, উভয় পক্ষ একে অপরের ক্ষতিসাধনের দাবি করে এবং একটি ভূপাতিত মিগ-২১ থেকে ভারতীয় উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান আটক হন। সারা বিশ্বময় তখন তুমুল উত্তেজনা, সংশয়, দুই পারমাণবিক শক্তিধরের সংঘর্ষের আশঙ্কা এক ভীতিপ্রদ অবস্থার সৃষ্টি করে। রাশিয়া এবং ইরান মধ্যস্থতা করে শান্তি-প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয় এবং সব বিশ্বনেতাই উভয় পক্ষকে সংযমের পরামর্শ দেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন যুদ্ধবন্দি অভিনন্দনকে এর পরের দিনই মুক্তি দেওয়া হবে। ‘শান্তির বার্তাবাহক’ হিসেবে। এতদনুসারে গত শুক্রবার ১ মার্চ স্থানীয় সময় ৯টায় পাক-ভারত সীমান্ত ওয়াগা অতিক্রম করে উইং কমান্ডার অভিনন্দন সীমান্তে আগত অভিনন্দন জ্ঞাপনকারী দুদেশের জনতার স্বাগত অভ্যর্থনায় মুক্ত সৈনিক হিসেবে ভারতে প্রবেশ করেন। প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই দুদেশের ভেতরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরুর আশু আশঙ্কা দূরীভূত হয়  যদিও খন্ড খন্ড সংঘর্ষ চলতেই থাকে।

বস্তুতপক্ষে যুদ্ধবন্দি অভিনন্দনের সঙ্গে সদাচরণ, তাকে প্রাপ্য মর্যাদা বা সম্মান প্রদান এবং প্রায় অবিলম্ব মুক্তিপ্রদান পাকিস্তান সরকারের এবং বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও সেনাবাহিনীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বার্তা বহন করে। আমেরিকান নিরাপত্তা বিশ্লেষক Michael Kugelman একে একটি “Big decision to past with a bargaining chip” অর্থাৎ দরকষাকষির জন্য মূল্যবান একটি উপকরণ ছেড়ে দেওয়ার জন্য একটি বড় সিদ্ধান্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। যদি আন্তর্জাতিক মহলে তাকে মুক্তি দেওয়ার একটি বড় চাপ থাকত, তবুও অনেকটা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই ‘শান্তি’র ঘোষণা দিয়ে তাকে মুক্তি প্রদানকে উত্তেজনা প্রশমনের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। পাক-ভারত সাংঘর্ষিক উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে পারলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী বিজেপির আশু সাধারণ নির্বাচনে ভোটপ্রাপ্তিতে সুবিধে হতে পারত বলে অনেকেরই ধারণা। ইমরান খান যুদ্ধবন্দিকে অবিলম্ব মুক্তি দিয়ে যেন সেদিক থেকে তাকে কিছুটা নিরাশ করলেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান ভারতীয় সাংবাদিক সাঈদ নকভি। (ডেইলি স্টার- মার্চ ৩, ২০১৯) তিনি বিখ্যাত উর্দু কবি জোশ মলিহাবাদির লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ইমরান খান যেন তার কথাই অনুসরণ করলেন। মলিহাবাদি বলেছিলেন “বিবেকবান লোকের জন্য প্রতিহিংসা একটি ঘৃণাই প্রতিক্রিয়া। উত্তম প্রতিশোধ হবে  শত্রু বা বিরোধীপক্ষ যখন নিকৃষ্টতম আচরণ আশা করবে, তাকে অনুগ্রহ প্রদান করো।”

দুর্ভাগ্যবশত পুলওয়ামার নিন্দনীয় ঘটনার পরবর্তীকালে ভারতে ধর্মভিত্তিক উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রসার এবং কাশ্মীরি-বিদ্বেষ সৃষ্টির অপচেষ্টার মারাত্মক সূচনা। খবরে প্রকাশ, সারা ভারতে সাধারণ কাশ্মীরি নাগরিক বা ব্যবসায়ীদের ওপর অত্যাচার এবং পাকিস্তান-বিরোধিতার নামে মুসলিম বিদ্বেষ বৃদ্ধির ঘটনা বেশ বেড়েছে। এবং এ ব্যাপারে বিজেপি বা আরএসএস জাতীয় সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ইদানীং ভারতে গো-সুরক্ষার নামে তথাকথিত ‘জেহাদি প্রেমে’র প্রতিবাদে সহিংস’ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেশ কয়েকটি হয়েছে। ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাহাবাদ শহরের নাম পালটে রাখা হয়েছে মহা-প্রয়াগ। এসব কুকা- নিঃসন্দেহে উপমহাদেশে শান্তি-স্থাপনে বিঘণতার সৃষ্টি করে। একটি বিস্ময়কর ব্যাপার যে, ভারতের সর্ববৃহৎ এবং সর্বোচ্চ ভাস্কর যা সরকারি উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে তা মহাত্মা গান্ধী, জওয়াহেরলাল নেহরু বা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নয় তা হচ্ছে হিন্দুত্ববাদী হিসেবে খ্যাত ভারতের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভ ভাই প্যাটেলের।

এ জাতীয় হতাশাসূচক বা নিরাশাব্যঞ্জক অবস্থার মধ্যেও আমার কাছে মনে হয়, পরিশেষে একটি বিষয় সর্বাধিক গুরুত্ব পেতে পারে। সেটা হচ্ছে উভয় দেশেই সাধারণ জনগণের শান্তি-প্রতিষ্ঠার আগ্রহ। দুদেশেই সাধারণ মানুষ (বাংলাদেশে তো বটেই) শান্তি চায় এবং সহিংস ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে পরিত্যাজ্য মনে করে। সমৃদ্ধি আসবে শান্তি ও সহযোগিতা থেকে জনগণের যে এ বিশ্বাস আছে তা প্রতীয়মান হয়েছে দুটো দেশেই পুলওয়ামা-উত্তর সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া থেকে। যুদ্ধের আহ্বান থেকে শান্তির দাবিই বড় হয়ে উঠেছে। এটাকেই জিইয়ে রেখে তাকে প্রাণদান করে তার প্রতিষ্ঠাই করতে হবে।

আমার কাছে মনে হয় সে মহান প্রচেষ্টায় দুদেশেরই অবশ্য করণীয় কর্তব্য রয়েছে। পাকিস্তানকে সব রকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আশ্রয় প্রদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে তা উৎখাত করতে হবে। জইশ-ই-মোহাম্মদ বা লস্কর-ই-তৈয়বা বা তালিবান এরা যেন কোনো স্থান না পায়। আর ভারতকে মুসলিমবিরোধী ও ইসলাম-বিদ্বেষী কর্মকা- পরিহার করে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মীরের সত্তর বছরের সমস্যার সমাধান করতে উদ্যোগ নিতে হবে। নিগৃহীত এবং বঞ্চিত কাশ্মীরিদের মতামতই এই সমস্যা নিরসনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেতে হবে। আলোচনাভিত্তিক কাশ্মীর সমস্যার সমাধানই উপমহাদেশে শান্তি স্থাপনের পূর্বশর্ত এবং গ্যারান্টি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত