বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জীবন সংশয়ে ওবায়দুল কাদের

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৯, ০২:৩৬ এএম

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গুরুতর অসুস্থ। গতকাল রবিবার সকালে তাকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হৃদরোগে আক্রান্ত ৬৭ বছর বয়সী কাদেরের অবস্থা সংকটাপন্ন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নিতে গতকালই সন্ধ্যায় একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা আসে। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের ওই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও আসেন। তাদের সঙ্গে আলোচনার পর রাত পৌনে ১০টার দিকে বিএসএমএমইউ ভিসি কনক কান্তি বড়–য়া জানান, ওবায়দুল কাদেরকে সিঙ্গাপুর নেওয়ার ব্যাপারে আজ সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এদিকে ওবায়দুল কাদেরের অসুস্থতার খবর পেয়ে তাকে দেখতে হাসপাতালে যান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। তার খোঁজ নিতে হাসপাতালে ভিড় করেন আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী। তাকে দেখতে হাসপাতালে যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল।

জানা গেছে, গতকাল ফজরের নামাজের পর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হয় কাদেরের। অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় তার স্ত্রী ইসরাতুন্নেসা কাদের তাকে বিএসএমএমইউতে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা জানান, তাকে দ্রুত সিসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার হার্ট অ্যাটাক হয়। পরে এনজিওগ্রাম করে দেখা যায়, তার হৃদযন্ত্রে তিনটি ব্লক। এর একটি সারানো গেলেও বাকি দুটি বর্তমান অবস্থায় সারানো সম্ভব নয়। তাহলে অবস্থার অবনতি হতে পারে।

আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য ওবায়দুল কাদেরকে সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএমইউর ভিসি কনক কান্তি বড়–য়া বলেন, ওবায়দুল কাদের সকালে যে অবস্থায় ছিলেন তার থেকে কিছুটা উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এখনো শঙ্কামুক্ত বলা যাবে না। যেকোনো মুহূর্তে ছন্দপতন ঘটতে পারে। বর্তমান অবস্থা অনেকটা ভালো জানিয়ে তিনি বলেন, হার্টবিট ৩৫-এ চলে এসেছিল। এখন ১০০-এর মধ্যে আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওবায়দুল কাদেরকে হাসপাতালে দেখতে এসে নাম ধরে ডাকলে তিনি মিটমিট করে তাকানোর চেষ্টা করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ দেখতে এলে ওবায়দুল কাদের পুরোপুরি চোখ খোলেন। তিনি কথা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বলতে পারছেন না। ওবায়দুল কাদেরের উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে একটি চিকিৎসক দল আসছে জানিয়ে ভিসি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের কার্ডিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান বলেন, বর্তমানে যে অবস্থা তাতে তাকে বিদেশে নেওয়ার পরিস্থিতি নেই। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলে আমরা অ্যালাউ করতে পারি। বিদেশে নেওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর দেখছে। তিনি জানান, মন্ত্রীর তিনটি রক্তনালিতে ব্লক ধরা পড়েছে, যার একটি স্টেন্টিংয়ের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে। তার অবস্থা ওঠানামার মধ্যে আছে। দোয়া করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যেহেতু তিনি ভেন্টিলেশনে আছেন, সেহেতু জীবনশঙ্কায় আছেন বলতে পারেন। আলী আহসান বলেন, ‘তার যে রক্তনালিটা সবচেয়ে বেশি ক্রিটিক্যাল ছিল, আমরা শুধু সেটাই ঠিক করেছি। কিন্তু সেটা বোধ হয় পর্যাপ্ত নয়। কারণ তিনটি নালি প্রয়োজন হয় রক্ত সরবরাহের জন্য। কিন্তু এই মুহূর্তে সেগুলো সারানো যাবে না। সেগুলো ঠিক করতে গেলে আরও বিপদ ঘটবে। যে নালিটা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, ওই নালিটা ঠিক করার পর তার পরিস্থিতি অনেকটা উন্নতির পর্যায়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন অবস্থার উন্নতি হয়-অবনতি হয়, এমন অবস্থা চলছে। দেশবাসী, আপনারা (উপস্থিত নেতাকর্মী) তার জন্য দোয়া করেন, আমরা চেষ্টা করছি। ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা না যাওয়া পর্যন্ত তার অবস্থা স্থিতিশীল বলা যাচ্ছে না।’

রাত ৯টার দিকে বিএসএমএমইউ পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল হারুন জানান, রাত পৌনে ৮টার সময় সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে বিশেষজ্ঞরা এসে পৌঁছেছেন। এখন তাদের সঙ্গে বোর্ড মিটিং চলছে, পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে। রাত পৌনে ১০টার দিকে ভিসি কনক কান্তি বড়–য়া জানান, সিঙ্গাপুরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎকদের সঙ্গে মেডিকেল বোর্ডের কথা হয়েছে। ওবায়দুল কাদেরকে আজই (রবিবার) সিঙ্গাপুর নেওয়া হবে না। সোমবার সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে প্রয়োজন হলে তাকে সিঙ্গাপুর পাঠানো হবে।

ওবায়দুল কাদেরকে দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজশাহীতে সেনাবাহিনীর একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ঢাকায় ফিরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হাসপাতালে যান। বিকেল সোয়া ৪টার দিকে হাসপাতালে যান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। ওবায়দুল কাদেরের খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, দীপু মনি, আবদুর রহমান, প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহম্মেদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, এনামুল হক শামীম, কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়–য়া, যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অপু উকিলসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। হাসপাতালে ভিড় করেন দলের অসংখ্য নেতাকর্মী। তারা ডি ব্লকের সামনে অবস্থান করেন। এতে ভোগান্তিতে পড়েন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ বলেন, তার (ওবায়দুল কাদের) শুভাকাক্ষী যারা দেখতে হাসপাতালে আসছেন; দয়া করে ভিড় জমাবেন না। তার চিকিৎসা বা অন্য রোগীদের চিকিৎসায় যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য উপরে উঠবেন না; যারা আসবেন অনুভূতি প্রকাশ করতে তাদের জন্য নিচে খাতা রাখা আছে, তাতে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কনক কান্তি বড়–য়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে হাসপাতালে নেতাকর্মী, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষকে ভিড় না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই আমাদের অনুরোধ, প্রয়োজন ছাড়া কেউ হাসপাতালে ভিড় করে চিকিৎসার ব্যাঘাত ঘটাবেন না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত