কাশ্মীরি জনগণের দাবি তলিয়ে গেলো

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৯, ১০:৪৮ পিএম

ভারত বা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রায় যে কোনো সন্ত্রাসী হামলার জন্য এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের দিকে প্রাথমিক কোনো তদন্ত ছাড়াই আঙুল তুলে থাকে। এটা চলে আসছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় থেকেই। অমীমাংসিত কাশ্মীর ইস্যু এখানে বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। কাশ্মীরি জনগণ এখানে বলির পাঁঠা। তারা চায় নিজেদের স্বাধীনতা আর পাক-ভারত চায় নিজেদের স্বার্থ। চির-বৈরী দুটি দেশের মধ্যে সব শেষ গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামাতে জঙ্গি হামলাকে কেন্দ্র করে আবার উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন যে, যে কোনো সময় দুই পরমাণু অস্ত্রধারী দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। এমন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা গত ৭০ বছর ধরে চলছে। এখানে ভারত-পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতির হিসাব থাকলেও নীরব বলির শিকার সাধারণ কাশ্মীরিরা। পুলওয়ামাতে হামলাকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে কাশ্মীরিদের ওপর নির্যাতনের বর্বরতা নেমে আসে। ভারতে যেখানেই কাশ্মীরি পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই নির্যাতন করা হচ্ছে।

পুলওয়ামায় হামলার পর ভারতীয় গণমাধ্যমে সেখানের একটি ইলেকট্রিক পণ্যের দোকানে লাগানো নোটিস খুব প্রচার হয়। যেখানে লেখা আছে, ‘উড়মং ধৎব ধষষড়বিফ নঁঃ কধংযসরৎর হড়ঃ ধষষড়বিফ’, যার বাংলা করলে অর্থ হয়, ‘কুকুরের প্রবেশ অনুমোদিত কিন্তু কোনো কাশ্মীরি নয়।’ আধুনিক বিশ্বে রেইসিজম ঘৃণ্য হলেও পুলওয়ামাতে হামলার পর এমন ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক মানসিকতা এক শ্রেণির ভারতীয়র কাছে জাতীয় মর্যাদার প্রতীক বনে গেছে। যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ দোকানে লাগানো নোটিস। এটা শুধু একটা দোকানির মনোভাব নয়, ভারতের জনগণের একাংশের মনে কাশ্মীরিদের প্রতি মনোভাবের একটা নমুনা মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কাশ্মীরিদের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবি করা কি অন্যায়? আর পুলওয়ামাতে যে হামলা হয়েছে সেটা ভারতের দাবি মতেই পাকিস্তানের একটি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদ কর্তৃক হয়েছে। তাহলে সেখানে সাধারণ কাশ্মীরিদের ভারতজুড়ে নির্যাতনের লক্ষ্য বানানো হয় কোন যুক্তিতে? আত্মমর্যাদার মানে এই নয় যে, অন্যের ন্যূনতম মানবিক অধিকার হরণ করতে হবে। এই প্রশ্নগুলো ওঠানোর কথা ছিল ভারতীয় প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের পক্ষ থেকে কিন্তু সেটা তেমনভাবে হয়নি। অন্যদিকে উল্টো কাজ যেটা হয়েছে, ভারতীয় মিডিয়াগুলো যুদ্ধ লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় চটকদার সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে স্বীয় অবস্থান থেকে সাধ্যে যা কুলোয় তা পুরোদমে করেছে। যার ফল হচ্ছে দুদেশের মধ্যে রণসাজ, হামলা-পাল্টা হামলা যার নির্মম শিকার কাশ্মীর ও পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকার নিরীহ মানুষ। গত ০৩ মার্চ বিবিসির এক ভিডিও প্রতিবেদনে ভারত-পাকিস্তানের হামলা-পাল্টা হামলার শিকার নিরীহ কাশ্মীরিদের অবস্থা কতটা নাজুক তা উঠে এসেছে। যা দেখে যে কারও গা শিউরে উঠবে।

কাশ্মীরে এখন স্থানীয় স্বাধীনতাকামীদের মধ্যে যে সংগ্রাম এবং জনগণের মনে যে রোষ দেখছি এটা তাদের দীর্ঘদিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ দাবির শেষ অবস্থা। আর এটা চলমান থাকবে যতদিন না কাশ্মীর একটা স্বাধীন জনপদের মর্যাদা পায়। অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে রণহুংকার সেটা সম্পূর্ণই তাদের স্বার্থের জন্য। এই কথাটা সচেতন ভারতীয়দের মধ্যে অনেকেই জ্ঞান করেন। ভারত এখানে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ট্যাগ ব্যবহার করছে আর পাকিস্তান স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার বৈধ দাবির ট্যাগ। কিন্তু দুদেশের কেউই সত্যিকার অর্থে কাশ্মীরের স্বাধীনতা চায় না। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কাশ্মীর তিন ভাগে তিন দেশের অধীনে চলে গেছে।

এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে পাকিস্তান যার নামকরণ হয়েছে আজাদ কাশ্মীর; দুই-তৃতীয়াংশ ভারতে অধীনে যে অংশের মানুষ স্বাধীনতার দাবিতে ৭০ বছর ধরে সংগ্রাম করছে; আর কিছু অংশ ভারতের কাছ থেকে চীনের দখলে চলে গেছে। প্রত্যেক দেশই স্বীয় স্বার্থে কাশ্মীর দখল করে আছে। কয়েক ভাগে বিভক্ত এই কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার দাবি জোরালে হলেও সেটাকে ছাপিয়ে গেছে ভারত-পাকিস্তানের রণহুংকার ও তথাকথিত জঙ্গি-সন্ত্রাসের আলোচনা।

পুলওয়ামাতে হামলার পর বরাবরের মতোই কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার যে বৈধ দাবি তা বিশ্বের নজর থেকে আড়াল হয়ে গেছে। এখন প্রধান ইস্যু হচ্ছে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই প্রশ্ন উঠছে না যে, পাক-ভারত দ্বন্দ্বের মূলে কী আছে? সেটার সমাধানকল্পে কী করা উচিত এ বিষয়ে কথা হচ্ছে না। রাষ্ট্রসংঘে এবং মার্কিন দেশে জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছে। এর কারণ তার সংগঠনের হামলার কারণে ভারতে ৪০ জন জওয়ান নিহত হয়েছে। কিন্তু এই প্রশ্ন উঠছে না যে, স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনরত কাশ্মীরিদের হাজার হাজার মানুষকে হত্যার জন্য কেন ‘দায়ীদের’ কোনো শাস্তি হবে না? ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর রাজা হরি সিং-এর একটা স্বাক্ষরের ওপর নির্ভর করে কাশ্মীরিদের ওপর ভারতীয় আধিপত্য নেমে আসে। যদিও তাতে সাধারণ কাশ্মীরিদের সম্মতি ছিল না। সে পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তান দুই দেশ কাশ্মীর দখল করার জন্য সৈন্য পাঠায়। সে দফায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় মীমাংসা হয় এবং কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে রাষ্ট্রসংঘে কাশ্মীরিদের মধ্যে গণভোটের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু আজও সে প্রস্তাব আলোর মুখ দেখেনি। কাশ্মীরিদের কাঁধে পরাধীনতার জোয়াল আজও বহাল তবিয়তে রয়েছে।

পুলওয়ামায় হামলা যেন ভারত রাষ্ট্রের অখ-তার জন্য কাশ্মীরিদের ওপর চালানো নির্যাতনের বৈধতাদানের আরেকটি সনদ। এর আগে ২০১৬ সালে উরির সেনা ছাউনিতে হামলাকে কেন্দ্র করে দু দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। ভারত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ পরিচালনা করে। মিডিয়াতে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্র তখন ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ এবং পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এর প্রতিক্রিয়া কী সেটা। মূল যে কারণে এসব হামলা-হত্যা সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো কথা ওঠে না। বরং এসব বিচ্ছিন্ন হামলার পর কাশ্মীরিদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বেড়ে যায়। সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কেবল প্রচার পায় জঙ্গি হামলায় কতজন ভারতীয় সেনা আহত-নিহত হলো। আর ভারতের পক্ষ থেকে জবাবে কতজন জঙ্গি বা পাকসেনা নিহত হলো। অদৃশ্যে থেকে যায় নিরীহ কাশ্মীরিদের লাশের হিসাব। এবারের হামলার পর বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। এক. ভারতে বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যপট, দুই. পাকিস্তানের নীরব প্রভাব বিস্তারের মনোবৃত্তি ও রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ়করণ।

সামনে ভারতের জাতীয় নির্বাচন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে এবং দেশীয় রাজনীতি থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে জাতীয় স্বার্থরক্ষার হুজুগ তুলে বিজেপি নির্বাচনের ফলকে নিজেদের অনুকূলে টানতে পারেÑ এই সাধারণ সূত্রটা অন্তত সবারই জানা। কারণ গত ৫ বছরে বিজেপির রাজনৈতিক কর্মের এমন দেউলিয়া দশাÑ যার শেষ ভরসা উগ্র জাতীয়তাবাদ। আর এটা খুব সফল হবে যদি তা হয় চির-বৈরী পাকিস্তানের প্রশ্নে। কারণ পুলওয়ামাতে হামলার পর ভারতীয় মিডিয়াতে যেভাবে প্রচার চলেছে এতে এই ধারণা অমূলক নয়। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সরকারবিরোধী ২১ দলের নেতারা অভিযোগ করেছেন, সশস্ত্র বাহিনীর আত্মত্যাগকে বিজেপি দলীয়করণ করছে। অন্যদিকে হামলার দায় স্বীকারকারী জইশ-ই-মোহাম্মদ ২০০০ সালে সৃষ্টির পর থেকেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তা ছাড়া গত শতকের ৯০-এর দশক থেকে পাকিস্তান এসব জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট হিসেবে ব্যবহার করে ভারত ও আফগানিস্তানে কাজ করিয়ে তাদের থেকে সুবিধা লাভ করে আসছে। পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে যার কিছু ফল যুক্তরাষ্ট্রও ভোগ করেছে।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক বড় একটা পরিবর্তন হয়েছে। অনেকের মতে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দেশ পরিচালনার রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ একজন। পুলওয়ামায় হামলাকে কেন্দ্র করে ইমরানের পক্ষে এটা প্রমাণের সুযোগ এসেছে যে, তিনি অনেকের ধারণার চেয়েও বেশি এগিয়ে। কারণ এই মুহূর্তে পাকিস্তানের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বেশ শক্ত করে দানা বেঁধেছে। পশতুন তাহফুজ মুভমেন্ট নিয়ে পাক-রাজনীতির অভ্যন্তরীণ মাঠ আউলানো। এই সময়ে পুলওয়ামা ইস্যুতে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ভুলে একটা জাতীয় ঐক্য খুব প্রয়োজন এটা তুলে ধরা খুব সহজ হবে। পাকিস্তানের বর্তমান প্রশাসন কেনই-বা এই সুযোগ হাতছাড়া করবে! আর নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান যে উপযুক্ত ও তার দল যে দেশের জন্য শতভাগ কল্যাণকামী তা প্রমাণের জন্য বড় সুযোগও এটা।

এখানে ভারত-পাকিস্তানের স্বার্থের মহড়া পুরোদমে হলেও স্বাধীন কাশ্মীরের দাবি তলিয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে নজর কাড়ছে কেবলই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ। ভারত কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার দাবিকে উপেক্ষা করার আরেক দফা সুবর্ণ সুযোগ পেল। আর পাকিস্তানের নতুন প্রশাসন এই সুযোগে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ জাতির সামনে তুলে ধরতে পারল। আবারও হারল কাশ্মীরিরা এবং তাদের স্বাধীনতার দাবি আবারও তলিয়ে গেল।লেখক

শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত