পারফিউম তৈরির কাজে ব্যবহৃত সুগন্ধি আইসো-প্রোফাইল অ্যালকোহল থেকে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত বলে জানিয়েছে বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তদন্ত কমিটি। ওই দুই কমিটি আজ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে পুরান ঢাকায় ২৯ ধরনের রাসায়নিকদ্রব্য ও আতশবাজিসহ যেকোনো ধরনের বিস্ফোরক মজুদ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করারও সুপারিশ থাকছে। আজ শিল্প মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটিও প্রতিবেদন জমা দেবে। এ ছাড়া দু-একদিনের মধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিও প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানা গেছে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টায় স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জন নিহত ও অন্তত ৪১ জন আহত হয়। এ ঘটনায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে ১০টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তার মধ্যে তিনটি কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে আজ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত বিস্ফোরক পরিদপ্তর গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছি। আগামীকাল (আজ) মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেব। প্রতিবেদনে আগুনের সূত্রপাত, আগুনের ভয়াবহতার নেপথ্য কারণ ও প্রতিকারে সুপারিশ থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের কোনো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি।’ প্রতিবেদনে কী থাকছে জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে চুড়িহাট্টায় আগুন লাগেনি। ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় ক্লারিজ ও কালারমিসহ বিভিন্ন কোম্পানির বডিস্প্রে ও পারফিউমের কৌটা ভরা হতো। সেখানে পারফিউম তৈরির উপাদান উচ্চদাহ্য ক্ষমতার আইসো-প্রোফাইল অ্যালকোহলের মজুদ ছিল। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, মশার কয়েল, সিগারেটের আগুন বা অন্য কোনো কারণে আগুন লেগে সেখানে ভয়ানক বিস্ফোরণ হয়। এই বিস্ফোরণে ভবনের দোতলার দেয়াল উড়ে গিয়ে রাস্তায় পড়ে। উচ্চদাহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন আইসো-প্রোফাইল অ্যালকোহল ও ইথানল জাতীয় রাসায়নিকদ্রব্য মজুদ থাকায় মুহূর্তের মধ্যে তা শক্তিশালী বোমার মতো বিস্ফোরিত হয়। এতে ভবনের সামনের দুই দিকের সড়ক পরিণত হয় আগুনের নদীতে। এ কারণেই এত বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি হয়।
প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা আগেই আইসো-প্রোফাইল অ্যালকোহলসহ ২৯ ধরনের রাসায়নিকের মজুদ পুরান ঢাকা থেকে সরিয়ে নিতে বলেছিলাম। নিমতলীর ঘটনার পর এ ধরনের দাহ্য পদার্থের দোকান বা গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে এসব রাসায়নিকের গোডাউনে অভিযান অব্যাহত আছে। উচ্চমাত্রার কেমিক্যাল রাখার প্রমাণ পাওয়ার পর অনেকের লাইসেন্স স্থগিত করেছে সিটি করপোরেশন। ওয়াহেদ ম্যানশনে রাসায়নিক দ্রব্য ও দাহ্য পদার্থ রাখার কোনো অনুমতি ছিল না।’
প্রতিবেদনে যে ২৯ ধরনের রাসায়নিক উচ্চমাত্রার দাহ্য হিসেবে চিহ্নিত করে পুরান ঢাকা থেকে সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে অ্যাসিটোন, বিউটাইল অ্যাসিটেট/এন-বিউটাইল অ্যাসিটেট, আইসো-বিউটানল, ডিএল-২৫৭৫, ইথানল অ্যাসিটেট, ইথানল, হেভি অ্যারোমেটিক, আইসো-প্রোফাইল অ্যালকোহল, মিথানল, বিউটানোন (মিথাইল, ইথাইল কিটোন), ৪-মিথাইলপেনটেন-২ওয়ান, এন-প্রোপাইল অ্যাসিটেট, প্রোপেন-১-অল (প্রোপাইল অ্যালকোহল), প্রোপাইলিন প্লাইকল (প্রোপেন ১, ২ ডাইঅল), ফ্লোক্সো গ্রাভিওয়া ১৫-২০ কেজি বা ঊর্ধ্বে প্যাককৃত, টলুইন, থিনার-বি, রিডিউসার বা রিটার্ডার (অর্গানিক কম্পোজিট সলডেন্ট অ্যান্ড থিনার, থিনার (এডিএএম-৩০০০ডিই), ডিএল-১০০, থিনার এএএ, থিনার-সি, পিভিসি থিনার), জাইলিন বা মিক্সড জাইলিন ও ডাই অ্যাসিটোন অ্যালকোহল।
তদন্ত দলের এক সদস্য জানান, ওয়াহেদ ম্যানশনসহ ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে আইসো-প্রোফাইল অ্যালকোহলের পাশাপাশি গ্লিসারিন, অ্যাসিটোন, ইথানল, হেভি অ্যারোমেটিক, মিথাইল, ইথাইল ও বিভিন্ন ধরনের থিনার, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, মিথাইল, ইথাইল, কিটোন ও থিনারের মতো বিভিন্ন ধরনের দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছ। দেশে সরকারের অনুমতি ছাড়া বিক্রয় নিষিদ্ধ ২৯ ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যের মধ্যে থিনার ও আইসো-প্রোফাইল অ্যালকোহলও রয়েছে।
তিনি আরও জানান, এ ছাড়াও পুরান ঢাকাসহ আবাসিক এলাকা থেকে যেকোনো ধরনের গানপাউডার, নাইট্রোগ্লিসারিন, ডিনামাইট, গানকটন, ব্লাস্টিং পাউডার, মারকারি (পারদ) বা অন্য ধাতুর ফালমিনেট, রঙিন আতশবাজি, আতশবাজি তৈরিতে ব্যবহৃত যেকোনো বিস্ফোরক, ফগ সিগন্যাল, আতশবাজি, ফিউজ, কাতুর্জ বিক্রয় ও মজুদ না করার বিষয়ে সুপারিশ থাকছে।
চুড়িহাট্টায় আগুন লাগার কারণ জানতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিস্ফোরক পরিদপ্তর। প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক ছাড়া কমিটির দুই সদস্য হলেন পরিদর্শক মুনীরা ইয়াসমিন ও তোফাজ্জল হোসেন। তাদের সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী আজ তারা প্রতিবেদন জমা দেবেন।
এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্মনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক সালেহ উদ্দিন ও উপসহকারী পরিচালক আবদুল হালিম। এ কমিটিকেও সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। আজ সাত কার্যদিবসের শেষ দিন।
তদন্ত কমিটির প্রধান উপপরিচালক দেবাশীষ বর্মন বলেন, ‘আমরা আগামীকাল (আজ) মঙ্গলবার প্রতিবেদন জমা দেব। তদন্তে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে এবং সেখানকার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দাহ্য কেমিক্যাল থেকেই আগুন ছড়িয়েছে। আমরা তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ভিডিও ফুটেজ, সংগৃহীত নমুনাসহ আনুষঙ্গিক সব দিক বিশ্লেষণ করেছি। সেখানে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আগুনের প্রমাণ মেলেনি।’ আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সবকিছু হিসাবনিকাশ করছি। এটা কাল সকাল নাগাদ চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।’
শিল্প মন্ত্রণালয়ের কমিটির প্রতিবেদনও আজ : এ ঘটনার তদন্তে গঠিত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিও আজ মন্ত্রীর কাছে প্রতিবেদন জমা দেবে। এ কমিটির সদস্য সচিব এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের পরিচালক আবদুল মান্নান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দু-একদিনের মধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন : অগ্নিকাণ্ডের পর সুরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কমিটির প্রধান বলেন, ‘আমাদের তদন্তকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আজ কমিটির সদস্যরা চূড়ান্ত পর্যালোচনায় (ফাইনাল টিউনিং) বসব। এরপর প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে জমা দেব।’ এই কমিটির এক সদস্য জানান, তারাও ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় রাসায়নিকদ্রব্যের গুদামে বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে মনে করেন।
প্রতিবেদন দিয়েছে ডিএসসিসির কমিটি : ঘটনার তদন্তে প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিমের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের কমিটি করে ডিএসসিসি। কমিটির প্রধান জানান, তারা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। কমিটির অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘আমাদের দেখার বিষয় ছিল ভবনটি টিকবে কি টিকবে না। আমরা প্রতিবেদন দিয়েছি। প্রতিবেদনে সবাই স্বাক্ষর করেছি। আগুনের ক্ষয়ক্ষতি ও কারণ নিয়ে অন্য কমিটি কাজ করছে।’
এ ঘটনায় প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্র্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন ও বুয়েটের তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিটি। এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চকবাজার থানায় হওয়া মামলার তদন্ত করছে পুলিশ।
