অযোগ্য গ্রাহককে ঋণ দিতে ওপর মহলের চাপ সহ্য করতে হয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের। চাপে পড়ে ঋণে অনুমোদন দিতে হয় তাদের। এসব ঋণের বড় অংশের কাগজপত্রই ঠিক থাকে না, পর্যাপ্ত জামানতও থাকে না। ঋণের টাকা হাতে পাওয়ার পর তা পরিশোধও করেন না ঋণগ্রহীতারা। তাই নতুনভাবে ঋণখেলাপি হওয়া বন্ধে ওপরমহলের চাপ উপেক্ষা করে ঋণ না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জন্য কোন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে, তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)।
‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ হ্রাসের লক্ষ্যে করণীয়’ শিরোনামে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠান রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী আলমগীর।
তাতে প্রভাবশালী ব্যক্তির প্ররোচনা ও স্বজনপ্রীতি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘উপযুক্ত গ্রাহককে ঋণ প্রদান না করে অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি, আত্মীয়, বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তিদের ঋণ প্রদান করা হলে এবং ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলকভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা যুক্তিসংগত। কিন্তু ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি (যেমন : রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা/আমলা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন নির্বাহী) কর্র্তৃক প্ররোচনা, অবৈধ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ঋণ প্রদানে বাধ্য করা হলে, সে ক্ষেত্রে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার জন্য করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।’
তিনি লিখেছেন, ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আগের বছরের চেয়ে বেশি পরিমাণ ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। বিষয়টি ঋণঝুঁকি বিশ্লেষণে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। তাই ঋণ বিতরণের জন্য পৃথক একটি ইউনিটের প্রস্তাব করেছেন কাজী আলমগীর।
ব্যাংকগুলোর বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় বিভিন্ন সময় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। বেসিক ব্যাংকের অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকটির তখনকার চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও হলমার্কের ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তখনকার স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি আমলারাও তাদের স্বজনদের ঋণ দিতে বিভিন্ন ব্যাংকে চাপ প্রয়োগ করেন বলে ব্যাংকাররা জানান।
বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ২০১৬ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন ওই ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার শুরু করলে তখনো বিষয়টি আলোচনায় আসে। শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেন, ওপরের নির্দেশে তাদের ঋণ অনুমোদন দিতে হয়। না দিলে তাদের চাকরি থাকবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতেই ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও বাধ্য হয়ে অনুমোদন করেন তারা। ফলে ঋণগুলোর বেশিরভাগই খেলাপি হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও এমডি প্রদীপ কুমার দত্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতিবিদ, মন্ত্রীসহ সবাই ঋণ দেওয়ার জন্য চাপ দেন, এটা সত্যি। তবে গ্রাহক ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত না হলে ঋণ দিতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। সে ক্ষেত্রে চাপ দেওয়া প্রভাবশালীদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলা যায়। ঋণ না দেওয়ার কারণে এখন পর্যন্ত কারও চাকরি গেছে, এমন কোনো নজির নেই। তবে ঋণ দেওয়ার কারণে চাকরি যাওয়ার নজির আছে। তাই চাপে ঋণ না দিয়ে চাপ প্রয়োগকারীদের বুঝিয়ে বলতে হবে। ব্যাংকারদেরও ক্ষমতা দেখাতে হবে।’
সোনালী ব্যাংকের এমডি থাকার সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অনেক সিটিং মন্ত্রী ঋণের জন্য তদবির করেছেন। সবার নাম বলা যাবে না। তবে একটি ঘটনা বলি, তখনকার গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আমার কাছে একজনের ঋণের ব্যাপারে তদবির করলেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখলাম, ওই গ্রাহক ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত নন। তখন আমি মন্ত্রীকে বুঝিয়ে বললাম যে, ওই খাতে আমাদের ঋণ দিতে সমস্যা আছে। তাই ঋণটি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তখন মন্ত্রী আমাকে বললেন, ছেলেটির বাড়ি আমার বাড়ির কাছে। দিতে পারলে ভালো হতো। তবুও আমি ঋণ দিইনি। তাতে কিন্তু মন্ত্রী আমার বা সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। উল্টো পূর্বাচলে তিনি আমার নামে প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাইরে থেকে কেউ ঋণ দেওয়ার জন্য প্রভাবিত করলে ব্যাংকাররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। একটা পর্যায়ে দেখা যায়, ভুল জায়গায় বড় ঋণ দিয়ে ফেলে। পরে এ ভুলের দায় পড়ে ঋণপ্রস্তাব অনুমোদনে স্বাক্ষর করা কর্মকর্তার ওপর। আসল দায়ী ব্যক্তিরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। যখন কোনো ঋণের বিষয়ে ওপর থেকে চাপ আসে, তখন ওই কর্মকর্তা চাপ প্রয়োগকারীর কাছ থেকে লিখিত আদেশ চাইতে পারেন। সেটি পরে নথি হিসেবে রাখতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে কোনো চাপ এলে তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে পারেন। অথবা ওপরের চাপ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। এর বাইরে আসলে আর কিছুই করার নেই। তবে ব্যাংক খাতের তদন্তে কর্মকর্তারা গভীরে যেতে চান না, অথচ এটাই বেশি জরুরি।’
